রবিবার, মে ৩১, ২০২৬

ইরান-ইসরায়েল ছায়াযুদ্ধ উত্তপ্ত: দুই পক্ষেই গুপ্তচর গ্রেপ্তার, ড্রোন হামলার অভিযোগ

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
  • ২০২৫-০৬-১৫ ১৫:৫২:২৯
ছবি সংগৃহিত

ঢাকা- ১৫ জুন 
মধ্যপ্রাচ্যের দুই চিরবৈরী প্রতিপক্ষ ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার ছায়াযুদ্ধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। দুই দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তৎপরতার অভিযোগ এনেছে এবং “বিদেশি চর” হিসেবে সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারের খবর দিয়েছে।
রোববার (১৫ জুন) ইরানের আলবুর্জ প্রদেশ থেকে মোসাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে দুই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান।
ইরানি গোয়েন্দা বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, আটক দুই ব্যক্তি ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে কাজ করছিল এবং স্থানীয়ভাবে বিস্ফোরক ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস প্রস্তুতের মাধ্যমে 'বিধ্বংসী হামলার পরিকল্পনা' করছিল।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, অভিযুক্তদের কাছ থেকে বিস্ফোরক তৈরির উপাদান ও অত্যাধুনিক ট্র্যাকিং যন্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের এখন জিজ্ঞাসাবাদ চলছে এবং তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে, ইসরায়েলও একই দিনে দাবি করেছে যে তারা ইরানের হয়ে কাজ করা দুই গুপ্তচরকে গ্রেপ্তার করেছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা “ইসরায়েলি নিরাপত্তার জন্য হুমকি ও সাইবার-তথ্য পাচারের সঙ্গে জড়িত”। তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা সরাসরি নাম প্রকাশ না করে জানান, এই দুই ব্যক্তি ইরানি গোয়েন্দা বাহিনীর দিকনির্দেশনায় দেশটির অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে নজরদারি চালাচ্ছিলেন।
এরই মধ্যে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ একটি গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইসরায়েল ইরানের অভ্যন্তরে একটি গোপন ড্রোন তৈরির কারখানা গড়ে তুলেছিল এবং সেখান থেকেই চালানো বিস্ফোরক ড্রোনের মাধ্যমে ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে।
তবে ইরান সরকারি পর্যায়ে এই দাবিকে “মনগড়া ও প্ররোচনামূলক” আখ্যা দিয়েছে।
তবে এর আগেও তেহরানের কাছে সামরিক ঘাঁটি ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর আশপাশে রহস্যজনক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, যার দায় অপ্রকাশ্য থাকলেও সন্দেহের তীর বারবার ইসরায়েলের দিকেই উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহে তেহরানের কাছে গভীর রাতে একাধিক বিস্ফোরণ হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, “রাতের নিস্তব্ধতা হঠাৎ ভয়াবহ আগুন ও বিস্ফোরণে ভেঙে পড়ে, আকাশ লাল হয়ে যায়।”
ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এসব ঘটনার কথা স্বীকার করলেও ‘সন্ত্রাসী হামলা নয়, প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে’ বলে উল্লেখ করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত ড্রোন হামলা, যা সম্ভবত ইরানের পরমাণু সক্ষমতার ওপর কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করতে চালানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. লায়লা আফশার সকালের আলো ডট কমকে বলেন,
“ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে এ মুহূর্তে যা হচ্ছে, তা শুধু গোয়েন্দা খেলা নয়—এটি ভূরাজনৈতিক অবস্থান প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। বিশেষ করে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার জবাবে ইসরায়েল ‘প্রিভেন্টিভ অ্যাকশন’ নিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “গুপ্তচর ধরে ফেলা এই উত্তেজনারই একটি অংশ। উভয়পক্ষ এখন এমন এক পরিস্থিতে পৌঁছেছে, যেখানে সরাসরি সংঘর্ষের আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে।”
জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ পরিস্থিতির প্রতি গভীর নজর রাখছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে ইরান-ইসরায়েল ছায়াযুদ্ধ একটি সরাসরি আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে সারা বিশ্বের নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার ও অভিবাসন পরিস্থিতিতে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের গোয়েন্দা লড়াই এখন আর গোপন নেই। একে একে সামনে আসছে হামলা, পাল্টা হামলা ও চর গ্রেপ্তারের চিত্র। ছায়া থেকে বের হয়ে যুদ্ধ এখন বাস্তব পরিসরে ঢুকে পড়েছে—এবং তার অনিবার্য অভিঘাত হয়তো বিশ্ব রাজনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে যাচ্ছে।

 


এ জাতীয় আরো খবর