রবিবার, মে ৩১, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার নতুন ঢেউ: ইসরায়েলকে ‘বিধ্বংসী হামলার’ হুমকি ইরানের,পাল্টা আঘাতে দুপক্ষই ক্ষতি

  • সকালের আলো আন্তর্জাতিক ডেস্ক,
  • ২০২৫-০৬-১৫ ০০:৫৮:২৬
ছবি সংগৃহিত

মধ্যপ্রাচ্যে ফের ঘনিয়ে আসছে যুদ্ধের ঘনঘটা। ইরান শনিবার রাতে ঘোষণা দিয়েছে, তারা খুব শিগগিরই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরেকটি ভয়াবহ ও বিস্তৃত সামরিক হামলা চালাবে। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিশেষ বার্তায় এ হুমকি দেওয়া হয় স্থানীয় সময় রাত ১০টার দিকে।
এর আগে শুক্রবার গভীর রাতে ইরান থেকে ছোড়া শতাধিক ব্যালিস্টিক মিসাইল ইসরায়েলের বেশ কয়েকটি কৌশলগত স্থাপনায় আঘাত হানে। এতে অন্তত তিনজন নিহত হন এবং প্রায় ২০০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইরান দাবি করেছে, এটি ছিল গাজায় ইসরায়েলি হামলার ‘উত্তর’ এবং একটি ‘প্রতিরোধমূলক বার্তা’
পরদিন শনিবার ইসরায়েল পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের ভেতরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলা চালায়। লক্ষ্য ছিল তেহরানের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বুশেহরের একটি গ্যাসক্ষেত্র ও শোধনাগার এবং কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন বন্দর নগরী বন্দর আব্বাস। হামলায় উল্লেখযোগ্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর।
এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় শনিবার রাতেই ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত একটি সতর্কবার্তায় জানানো হয়, “ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একটি ব্যাপক ও বিধ্বংসী প্রতিশোধমূলক হামলা আসন্ন, এবং তা ঘণ্টার ব্যবধানে ঘটবে।” দেশটির সামরিক সূত্রগুলোও ইঙ্গিত দিয়েছে, আকাশ ও সমুদ্রপথে বহুমাত্রিক হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত।
এদিকে শনিবার রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র এক টেলিভিশন বিবৃতিতে জানান, “আমরা এই মুহূর্তে ইরানের ওপর হামলা চালাচ্ছি।” তিনি বলেন, ইরানের হাতে এখনো বিপুল সংখ্যক মিসাইল ও ড্রোন মজুদ রয়েছে, যা ইসরায়েলের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। মুখপাত্র জানান, “আমরা ইরানের সারফেস-টু-সারফেস মিসাইল সিস্টেমগুলো টার্গেট করছি এবং ধ্বংস কার্যক্রম চলমান থাকবে।”
একই সময়ে ইরানের সামরিক ঘাঁটি খাতাম আল-আনবিয়া আকাশ প্রতিরক্ষা ঘাঁটির কমান্ডার মেহর নিউজকে দেওয়া এক বিবৃতিতে দাবি করেন, শেষ এক ঘণ্টার মধ্যে তারা ইসরায়েলের ১০টি সামরিক বিমান ভূপাতিত করেছে। যদিও তিনি এই বিমানের ধরন স্পষ্ট করেননি-সেগুলো যুদ্ধবিমান, নজরদারি বিমান নাকি ড্রোন ছিল, তা পরে জানানো হবে বলে উল্লেখ করেন।
এই পাল্টাপাল্টি হামলার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। জাতিসংঘের মহাসচিব উভয়পক্ষকে “তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির” আহ্বান জানিয়েছেন এবং সংকট সমাধানে কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন-তিনটি পরাশক্তি ইতোমধ্যে নিজেদের কূটনীতিকদের মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় করেছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই মুহূর্তে ইরান ও ইসরায়েল ‘সরাসরি যুদ্ধের’ দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা পরোক্ষ সংঘাত এই প্রথম খোলামেলা সামরিক অভিযানে রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও ইয়েমেনকে ঘিরে যেভাবে আঞ্চলিক জোটবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, তাতে যুদ্ধ শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
যুদ্ধ যদি বিস্তৃত আকারে রূপ নেয়, তাহলে তা শুধু ইরান-ইসরায়েল সম্পর্ক নয়, বরং পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ভারসাম্যকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে। বুশেহরের গ্যাসক্ষেত্রে হামলা ইতোমধ্যেই তেল ও গ্যাসের দামে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। বন্দর আব্বাসে হামলার পর হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা বাড়ছে।
ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এক নতুন স্তরে পা দিয়েছে-যেখানে আর ‘সতর্ক বার্তা’ নয়, বরং উভয়েরই হাতে রক্ত লেগে গেছে। বিশ্ববাসী এখন অপেক্ষায়, এই উত্তেজনার আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে কিনা, নাকি আরও ছড়িয়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্ফোরণপ্রবণ ভূখণ্ডে।

সূত্র: আলজাজিরা, মেহর নিউজ, রয়টার্স, বিবিসি।


এ জাতীয় আরো খবর