দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস পদত্যাগ করছেন কি না-এই প্রশ্নে জনমনে উৎকণ্ঠা বাড়ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, নানা গুঞ্জন এবং বৈঠকের তোড়জোড়ে তৈরি হয়েছে এক অনিশ্চয়তার আবহ।
গত বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর ড. ইউনূস জানিয়েছেন, তিনি যদি কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, তবে পদে থাকার যৌক্তিকতা নেই। এরপর থেকেই তার পদত্যাগ নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয় রাজনৈতিক অঙ্গনে।
আজ শনিবার (২৪ মে) বিকেলে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া একনেক বৈঠকের পর উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে ড. ইউনূসের একটি জরুরি সভাও ডাকা হতে পারে, যেখানে তার অবস্থান নিয়ে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ড. ইউনূসের ঘনিষ্ঠজনেরা তাকে পরামর্শ দিয়েছেন-পদত্যাগ নয়, বরং উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণ করে, রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ তুলে ধরার।
এই প্রেক্ষাপটে আজকের বৈঠকগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, বিকেল সাড়ে ৪টায় বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল তার সঙ্গে দেখা করবে, পরে জামায়াতের প্রতিনিধিরাও বৈঠকে অংশ নেবে।
এদিকে, সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব লিখেছেন, “অধ্যাপক ড. ইউনূস ক্ষমতার জন্য কাজ করছেন না, বরং বাংলাদেশের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তরের জন্য তার ভূমিকা দরকার।” তিনি আস্থার সঙ্গে জানান, ইউনূস পদত্যাগ করছেন না বলেই তিনি বিশ্বাস করেন।
তবে বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলোর মধ্যে ড. ইউনূসের অবস্থান নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, “আমরা প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগ চাই না, তবে যদি ব্যক্তিগতভাবে তিনি দায়িত্ব পালনে অপারগ হন, তাহলে রাষ্ট্র একটি বিকল্প ব্যবস্থা নেবে।”
বিএনপির আরেক সিনিয়র নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “ড. ইউনূস একজন সম্মানিত ব্যক্তি। জনগণ তার কাছ থেকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রত্যাশা করছে। তিনি দায়িত্বে থেকে সেই প্রত্যাশা পূরণ করলেই তার মর্যাদা অটুট থাকবে।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ড. ইউনূসের সামনে এখন তিনটি পথ খোলা রয়েছে-এক. পদত্যাগ করা, দুই. দায়িত্বে থেকে সময় নেওয়া, তিন. দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করা।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, “সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন-এই তিন বিষয়ে যদি প্রধান উপদেষ্টা সুস্পষ্ট বার্তা দেন, তাহলে সংকট অনেকটাই প্রশমিত হতে পারে।”
পিছনের প্রেক্ষাপট অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পর ৮ আগস্ট ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এরপর প্রায় ৯ মাস কেটে গেছে। নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক সমঝোতার অভাব, অভ্যুত্থানের হুমকি এবং মেয়র শপথ নিয়ে তৈরি হওয়া উত্তাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রাজনীতির এই টানাপড়েনে দেশ এখন তাকিয়ে আছে ড. ইউনূসের সিদ্ধান্তের দিকে। আজকের বৈঠকগুলোতে হয়তো সেই দোলাচলের কিছুটা নিরসন আসবে-এমনটাই প্রত্যাশা সবার।