পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের খুজদার শহর বুধবার সকালে এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার সাক্ষী হলো। স্কুলগামী শিশুদের বহনকারী একটি বাসে বিস্ফোরণে প্রাণ হারাল তিন শিশু ও দুই প্রাপ্তবয়স্ক। আহত হয়েছে আরও অনেকে। হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে দেশটির সরকার ও সেনাবাহিনী।
বুধবার সকাল, প্রতিদিনের মতো স্কুলে যাচ্ছিল শিক্ষার্থীদের বাস। খুজদার জিরো পয়েন্ট এলাকায় পৌঁছাতেই ঘটে ভয়ংকর বিস্ফোরণ। মুহূর্তেই কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। গ্লাস, ধাতব অংশ ছিটকে পড়ে দূরদূরান্তে। আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করে স্থানীয়রা।
বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় তিন শিশু ও দুই প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি। নিহতদের লাশ খুজদার সিএমএইচ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য কোয়েটা ও করাচিতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণমাধ্যম শাখা আইএসপিআর এক বিবৃতিতে জানায়, "ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত একটি কাপুরুষোচিত ও মানবতাবিরোধী হামলা এটি। সহজ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে শিশুদের, যাতে দেশের ভেতরে আতঙ্ক ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে।"
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, “যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়ে ভারতের সমর্থিত সন্ত্রাসীরা এখন বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ার মতো সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে অরাজকতা সৃষ্টি করছে।”
তারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা জানিয়ে বলে, “এই জঘন্য হামলার পেছনে থাকা পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারীদের খুঁজে বের করে শাস্তির মুখোমুখি করা হবে। দেশের মাটি থেকে সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করতেই সেনাবাহিনী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
খুজদারের ডেপুটি কমিশনার ইয়াসির ইকবাল দাশতি জানান, "বিস্ফোরণটি আত্মঘাতী হামলা হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলে দ্রুত মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ, ফ্রন্টিয়ার কোর (এফসি) ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের।"
সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট ঘটনাস্থলে তদন্ত শুরু করেছে। আশেপাশের এলাকায় বাড়ানো হয়েছে নজরদারি।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নকভি এক বিবৃতিতে বলেন, "নিরীহ শিশুদের যারা টার্গেট করে, তারা মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছে। এ ধরনের নৃশংস হামলার পেছনে দেশের শত্রুরা রয়েছে, যারা জাতীয় স্থিতিশীলতা ধ্বংস করতে চায়।"
তিনি নিহত শিশুদের পরিবারদের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেন এবং বলেন, "জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে আমরা এসব ষড়যন্ত্রের জবাব দেব।"
যোগাযোগমন্ত্রী আব্দুল আলীম খান বলেন, "এটি কেবল সন্ত্রাস নয়, এটি কাপুরুষতার চূড়ান্ত রূপ। শিশুদের বিরুদ্ধে এ ধরনের আঘাত গোটা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।"
খুজদারের মতো এলাকাগুলো বারবার সন্ত্রাসীদের টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিশু ও নারী-এইসব সহজলভ্য ‘সিম্বলিক টার্গেট’ বেছে নিয়ে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করাই তাদের উদ্দেশ্য।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানে রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক চাপের সময়ে এই ধরনের হামলা শুধু শোক নয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের সতর্কবার্তা।
খুজদারের রক্তাক্ত এই সকাল যেন পুরো পাকিস্তানকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। প্রাণ গেছে নিষ্পাপ শিশুদের, যাদের একমাত্র অপরাধ-তারা শিক্ষার আলো নিতে যাচ্ছিল।
এ হামলা যদি সত্যিই বিদেশি পৃষ্ঠপোষকতায় ঘটে থাকে, তবে তা শুধু পাকিস্তানের নয়, গোটা অঞ্চলের জন্য হুমকি। সন্ত্রাস, ভীতির রাজনীতি আর অশান্তির বিপরীতে দাঁড়াতে হলে প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ জাতীয় প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।