সোমবার, অক্টোবর ৫, ২০২৬

চবি সমাবর্তনে ড. ইউনূসকে ডি-লিট: জ্ঞান ও বিবেকের একত্রে উচ্চারণ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৫-০৫-১৪ ১৫:২৯:৪০
ছবি সংগৃহিত

চট্টগ্রাম | ১৪ মে ২০২৫
সাহিত্য নয়, ছিল না গবেষণাও-তবুও এই ডি-লিট একেবারে অন্যরকম। এটি কোনো কাব্যের, দর্শনের বা ইতিহাসের জন্য নয়, একজন মানুষের জীবনের দর্শনকে স্বীকৃতি দেওয়া। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম সমাবর্তনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার (D.Litt) ডিগ্রি প্রদান সেই উচ্চারণ-যেখানে বুদ্ধি, মানবতা ও সামাজিক ন্যায়ের মিলন ঘটে জ্ঞানের মঞ্চে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে বুধবার সকাল থেকে জমায়েত হতে থাকে তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের ঢল। আনন্দের রঙ, ক্যাপ-গাউন আর ক্যামেরার ক্লিকের মাঝেও ভিন্ন মাত্রা এনে দেন সমাবর্তন বক্তা ড. ইউনূস। তাঁর উপস্থিতি যেন হয়ে ওঠে একটি নৈতিক ও উন্নয়নচেতনার রূপক-যেখানে একজন 'উদ্যোক্তা অর্থনীতিবিদ' রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠেন।
“এই ডিগ্রি আমি গ্রহণ করলাম বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য, যে ভবিষ্যৎ সৃষ্টির দায়িত্ব আজকের এই তরুণদের কাঁধে,” - বক্তৃতায় বলেন ড. ইউনূস।
সমাবর্তনে এবার অংশ নেন ২২ হাজারের বেশি স্নাতক। এর মধ্যে ৪২ জন পিএইচডি এবং ৩৩ জন এমফিল ডিগ্রিপ্রাপ্ত। উপাচার্যের স্বাক্ষরিত মূল সনদ হাতে নেওয়ার মুহূর্তে অনেকের চোখে ছিল জল-স্বপ্নপূরণের উচ্ছ্বাসে।
সমাবর্তন উপলক্ষে চবিতে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ, কড়া নিরাপত্তা, ক্যাম্পাসে রঙিন ব্যানার ও আলোকসজ্জা।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার, ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজসহ প্রশাসনিক ও একাডেমিক কর্তাব্যক্তিরা।

উপাচার্য ড. মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার বলেন, “এই ডিগ্রি চবির পক্ষ থেকে কেবল একজন রাষ্ট্রনায়ককে নয়, মানবিক উন্নয়নের দৃষ্টান্তকে শ্রদ্ধা জানানোর প্রতীক।”

চবির ইতিহাসে বিরল সম্মাননা, ব্যতিক্রমী সময়চেতনা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ সমাবর্তন হয়েছিল ২০১৬ সালে। এরপর আট বছর ধরে অপেক্ষা ছিল এই দিনের জন্য। এবারের সমাবর্তন শুধু আয়োজনের বিশালতায় নয়, একজন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, এখনকার শীর্ষ নির্বাহী এবং চট্টগ্রামের সন্তানকে সম্মানিত করার মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে অনন্য অধ্যায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, “ড. ইউনূসকে এই ডিগ্রি প্রদান শুধু প্রথাগত সম্মান নয়, এটি চট্টগ্রামের মাটি ও মননের প্রতি একধরনের আত্মিক সম্মান। কারণ তিনিই সেই ব্যক্তি, যিনি বিশ্বজয় করেও চট্টগ্রামের কথা ভুলে যাননি।”

যেখানে রাষ্ট্র আর বিশ্ববিদ্যালয় মিলেমিশে যায়
বর্তমানে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনায় আছে। তার মাঝেই এই সম্মাননা—একে রাজনৈতিক বা প্রটোকলের আড়ালে দেখা ভুল হবে। বরং এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও শিক্ষাবোধের এক দার্শনিক সংলাপ। একদিকে তরুণদের ডিগ্রিপ্রাপ্তি, অন্যদিকে একজন জাতিকর্তার নৈতিক ও মানবিক দর্শনের স্বীকৃতি।

সমাবর্তনে অংশ নেওয়া আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী তানজিলা রহমান বলেন, “আমরা এমন একজন ব্যক্তিকে আমাদের ক্যাম্পাসে পেয়েছি, যিনি বিশ্বকে দেখিয়েছেন-অর্থনীতি শুধু সংখ্যা নয়, এটা মানুষের মুক্তিরও পথ।”

ডিগ্রি নয়, দায়িত্বের আহ্বান
সমাবর্তনের মাঠে সেই দিন সূর্য যখন পশ্চিমাকাশে ঢলছিল, তখন হাজারো ক্যাপ মাথা থেকে ছুঁড়ে উঠেছিল আকাশে। সেই আকাশেই ভেসে বেড়াচ্ছিল এক নতুন দায়িত্ববোধ-ডিগ্রিপ্রাপ্ত স্নাতকদের, বিশ্ববিদ্যালয়ের, রাষ্ট্রের আর একজন ইউনূসের।
এই সম্মান শুধু ডি-লিট নয়, এটি আমাদের সময়ের এক অনিবার্য বার্তা-যেখানে শিক্ষা, নেতৃত্ব ও বিবেক একসূত্রে বাঁধা পড়েছে।

 


এ জাতীয় আরো খবর