বুধবার, ফেব্রুয়ারী ১১, ২০২৬

শা কি ব লো হা নী

  • আন্দোলনের মুখ
  • ২০২৫-০৫-১২ ১৬:৩৬:১৪

খাবার টেবিলে ছাদ থেকে ঝুলানো ল্যাম্পের আলোয়
সুচনা অপেক্ষা করছিলো ফুয়াদের। 
দরজায় আওয়াজ পেতেই 
সে পায়ের আঙ্গুলে ভর দিয়ে 
নিঃশব্দে দৌড়ে গেলো 
আলোআঁধারির সিড়ি বেয়ে নীচে। 
দরজার মুখেই ওকে বলতে, ‘ইহাম’ নামের একটি 
মেয়েকে আশ্রয় দিয়েছি। তোমার সাথে দেখা করতেও 
চেয়েছে। থাকে সে মিরপুরে। 
স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে 
কাওরান বাজার থেকে ফার্মগেট জুরে 
সরকারের লেলিয়ে দেয়া পুলিশ, র‍্যাব আর  
সন্ত্রাসীদের গুলীর সামনে বুক পেতে, 
স্বৈরশাসন পতনের আন্দোলন 
করছে ওরা। পুলিশের তারা খেয়ে 
আশ্রয় নিয়েছে। একটু পরেই চলে যাবে। 
আবার হয়তো আসবে।  
টিভি চ্যানেলগুলোতে ওদের বয়েসি ছেলেমেয়েদের 
দুঃসাহসী শ্লোগানে রক্তাক্ত হতে দেখছি সারাদিন। 
তুমিতো সব জানো। 
মুখ জুড়ে প্রেমভেজা একটা ভাব 
জাগিয়ে সে স্বামীর একেবারে কাছে এসে বসে। 
ফুয়াদ, তোমার নামের অর্থ, 
আর্ট কলেজের বকুল তলায় 
প্রেম নিবেদনের সময় 
নিজের হাতে হাত নিয়ে বলেছিলে ‘হৃদয়’। 
সেই ৪০ বছর আগের কথা।

এখন তুমি মেয়েটির সাথে এতটুকু 
খারাপ ব্যবহার করবে না। 
স্বৈরাচারী শাসক পতনের বিভিষিকাময় সংগ্রামে ওরা পরিশ্রান্ত। 
তুমি ওর প্রতি সেইমত হৃদয়বান থাকবে। 
গেস্ট রুমের বাথরুমে শাওয়ার নিতে বলেছি।
অনেক বছর আগের উঠিয়ে রাখা 
সালোয়ার কামিজ দিয়েছি পরতে। 
একটুখানি খেয়েই চলে যাবে। 
ওকে তুমি কিছু বলবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। 
শিক্ষক হিসেবে সে তোমাকে চেনে।

কথা শেষ না হতেই ফুয়াদ বলে উঠে, দেখো, আমি 
ইহামকে চিনি। ঐ মেয়ে এখানে কেনো মরতে এলো। 
নাটক করা, একটু আধটু কবিতা লেখা মেয়ে। 
অথচ পড়াশোনাতে আবার অস্বাভাবিক 
রকম ভালো। একটু বেশী আধুনিক আর বেপরোয়া 
কিসিমের ছিলো। অন্য ক্লাশের মেয়ে হয়েও 
আমার দর্শনের ক্লাশে মাঝে মাঝে 
এসে বসে থাকতো, বিড়ম্বনার কারণ হয়ে; 
পড়ানো ভালো লাগে বলে। 
দু'একজন বেরসিক শিক্ষকবন্ধু
বলেছে, ও আমার প্রতি ক্রাশ খেয়েছে। 
জানোতো আমি এসব কখনো প্রশ্রয় দেইনি। 
দেখো আমি নিজে একজন 
স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে 
অংশ নেয়া চিহ্নিত শিক্ষক,
আমরাতো নিজেরাই নিরাপদ নই। 

সূচনা তড়িঘড়ি করে
স্বামীর বুকের সামনে উঠে দাঁড়ায়। 
চ্যালেঞ্জের ভঙ্গীমায় শাসিয়ে বলে, 
না, তুমি ওকে কোনভাবেই 
বের করে দিতে পারো না। 
বাসায় ঢোকার পেছনের দরজা 
ব্যবহার করতে দেখিয়েছি। 
ওর আরো দুএকজন আন্দোলনের 
সাথীবন্ধু যদি প্রয়োজনে আসতে চায়,
বলেছি নিয়ে আসতে। 
আমি ওদের শুধু খাবার আর গোছল 
করার আশ্রয় দিবো। 
তুমি কিচ্ছু বলতে পারবে না।

তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেলো, 
উত্তেজনা আর চোখে
মুখে আতঙ্ক নিয়ে ফুয়াদ বলে। 
সরকারের গোপন বাহিনী 
আমাদের গুম করে দেবে। 
কেউ ঘুণাক্ষরেও জানতে পারবে না। 

সরকার পতনের ছাত্র আন্দোলনে 
আমি নিজেতো জড়িয়ে পড়েছি। 
তুমি এর ভেতর জড়িও না সুচি, প্লিজ। 
তোমার প্রবাসী সন্তান দুটি বাবা মা দুজনকেই 
হারাবে। সূচনা কথার শেষ না শুনেই উঠে যায়। 

বাড়ির ছাদে বিকেলের নরম আলোয় 
আম গাছের ছায়া ফেলা
চেয়ারে গিয়ে বসে। পাতার ফাঁক দিয়ে 
পরা রোদ্দুর,বাতাসের দোলায় 
ওর শাড়ির ওপর আলো আধারির 
খেলা শুরু করেছে। 
আঙ্গুল দিয়ে আলতো করে সূচনা 
রোদের গা ছুঁয়ে দেয়।
আকাশের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে 
নিজের সন্তানদের কথা 
ভাবে। দেশের এমন পরিস্থিতে 
তমাল ও রিমীও নিশ্চয়
এমনভাবে আন্দোলনে ঝাপিয়ে পরতো। 
শরীরে কখন ঝিম লাগে টের পায়না
সুচনা। 
তমালের হাতে পানির বোতল। মাথায় সবুজ পট্টি
বাঁধা কেনো? দূর থেকে বিশাল মিছিল নিয়ে এদিকেই 
এগিয়ে আসছে। ওর কোলে রিমীর রক্তাক্ত মাথা,
আধেকটা শরীর কেমন বেকায়দায় ঝুলছে হাত পা ছড়িয়ে।
আতংকে চিৎকার করে ফুয়াদ ফুয়াদ বলে ডাকে সূচনা। 
কোন আওয়াজ বের হচ্ছে না কেনো গলা দিয়ে? 
    
কোকিলের তীব্র ডাকে সম্বিত ফিরে ধড়পড়িয়ে
উঠতে গিয়ে চেয়ার থেকে পরে যায়। 
শাড়ি ঠিক করে উঠতে গিয়ে 
ছাদে ওঠার দরজায় দেখে 
ভীত সন্ত্রস্থ ফুয়াদ ওর দিকে ছুটে আসছে।
বিচলিত সূচনা ভাবে এ কেমন ঘোর! 

শক্ত হাতে সুচনার দুই কাঁধ ঝাকিয়ে 
ফুয়াদ শুধু বলতে পারে,
এক্ষুনি নীচে আসো। 
ঘোর খাওয়া সূচনার নিজের কানে
নিজের চিৎকার অচেনা মনে হয়, 
আমার রিমির কি হয়েছে। এক পলকে 
দৌড়ে কখন নীচে চলে এসেছে
জানে না। দৌড়ে গিয়ে যুবকের কোলে 
ঝুলে থাকা 
মেয়েটির রক্তাক্ত মাথা বুকে চেপে ধরে 
চিৎকার দিয়ে আবার বলে,
আমার রিমি, মা। 
‘আহ’ শব্দের ভীষণ এক আওয়াজে সবাইকে
বিমুড় করে দেয় নারী,               বেঁচে নেই। 
তোমরা এতোগুলো মানুষ ও কে বাঁচাতে পারলে না। 

হতবাক, হতভম্ব ফুয়াদ কানের কাছে
মুখ নিয়ে শুধু বলে, রিমি না সূচনা, এ তোমার ‘ইহাম’। 
 


এ জাতীয় আরো খবর