রবিবার, মে ৩১, ২০২৬

ঘূর্ণিঝড় 'শক্তি' আসছে? বঙ্গোপসাগরের গর্জন নিয়ে আগাম সতর্কতা

  • বিশেষ প্রতিনিধি
  • ২০২৫-০৫-১১ ২৩:০৯:৫২
ছবি সংগৃহিত

আকাশ যেন নিঃশব্দে কিছু বলছে। বঙ্গোপসাগরের বুকে জমে উঠছে অদৃশ্য উত্তেজনা। আবহাওয়াবিদদের চোখ বলছে, মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে সেই উত্তেজনাই রূপ নিতে পারে এক ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ে-নাম হতে পারে ‘শক্তি’।
সাগরের অদ্ভুত শান্ত নিস্তব্ধতা, ক্রমশ তাপমাত্রা ও বাতাসের চাপের অস্বাভাবিক আচরণ, আর আবহাওয়া বিশ্লেষকদের ব্যাকুল নজর-সবকিছু মিলে এখন উপকূলজুড়ে এক নিঃশব্দ উদ্বেগ।
“বঙ্গোপসাগরে প্রতিকূল পরিস্থিতির যে ইঙ্গিত মিলছে, তা ঘূর্ণিঝড় তৈরির জন্য একেবারেই উপযুক্ত। সময়ের অপেক্ষা মাত্র,”
এভাবেই রোববার (১১ মে) নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল পলাশ।

ঘূর্ণিঝড় ‘শক্তি’: কী জানা যাচ্ছে এখন পর্যন্ত?
সম্ভাব্য সৃষ্টি: ২৩–২৮ মে-র মধ্যে
সম্ভাব্য আঘাত এলাকা: ভারতের ওড়িশা উপকূল থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম উপকূল
সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে: খুলনা বিভাগ (বাংলাদেশ) এবং পশ্চিমবঙ্গ উপকূল (ভারত)
ঘূর্ণিঝড় নাম: ‘শক্তি’-শ্রীলঙ্কার প্রস্তাবিত নাম
স্থলভাগে আঘাতের সময়: ২৪–২৬ মে (আনুমানিক)
আবহাওয়ার প্রতিটি পরিবর্তন নজরে রাখছে বিজ্ঞানীরা
পলাশ জানান,“সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা, নিম্নচাপ অঞ্চলগুলোর বিকাশ, বায়ুমণ্ডলের মধ্যম স্তরে আর্দ্রতার পরিমাণ—সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে, একটি পূর্ণমাত্রার ঘূর্ণিঝড়ের জন্ম ঘনিয়ে আসছে।”
বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিম (BWOT)-এর আগাম পূর্বাভাস অনুসারে,
১৬–১৮ মে: সাগরে একটি সার্কুলেশন (চক্রবায়ুর পূর্বাবস্থা) সৃষ্টি হতে পারে
এরপর তা ধাপে ধাপে লঘুচাপ → নিম্নচাপ → গভীর নিম্নচাপ → ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে

জনসাধারণের জন্য কী বার্তা?
যদিও ঘূর্ণিঝড় ‘শক্তি’ এখনো গঠিত হয়নি, তবে যা বোঝা যাচ্ছে, তা হলো—
‘প্রস্তুত থাকাই এখন সবচেয়ে বড় সতর্কতা’।

মৎস্যজীবীদের প্রতি পরামর্শ:
গভীর সাগরে না যাওয়ার আহ্বান
ট্রলার ও নৌকাগুলো নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে ফেলার নির্দেশনা

উপকূলীয় বাসিন্দাদের জন্য:
জরুরি প্রয়োজনীয়তা সংরক্ষণ করা
আবহাওয়ার প্রতিটি হালনাগাদ সতর্কতা মনোযোগ দিয়ে শোনা
আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি

প্রশাসনের প্রস্তুতি:
স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ ইতোমধ্যে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছে।

ঘূর্ণিঝড়ের নেপথ্য বিজ্ঞান: কেন মে মাস ঝুঁকিপূর্ণ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
মে মাসে বঙ্গোপসাগরের জলতলের তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে
এই তাপমাত্রা ২৮–৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়
উপরন্তু, উত্তর ভারত মহাসাগরীয় মৌসুমি বায়ুর সূচনা সময় হওয়ায় বাতাসের গতিবিধি জটিল হয়ে ওঠে
এই কারণেই প্রতিবছর এপ্রিল-মে ও অক্টোবর-নভেম্বর-এই দুটি মৌসুমকে ‘ঘূর্ণিঝড়-সক্রিয় মৌসুম’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
‘শক্তি’ শুধু আবহাওয়ার নাম নয়, বাস্তবতারও পরীক্ষা হতে পারে
যদি ঘূর্ণিঝড় ‘শক্তি’ বাস্তবে রূপ নেয় এবং উপকূলবর্তী অঞ্চলে আঘাত হানে, তাহলে উপকূলবাসীর জীবন-জীবিকা আবারও মুখোমুখি হবে এক বড় চ্যালেঞ্জের।
এটি কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়-এটি আমাদের ব্যবস্থা, প্রস্তুতি এবং সামাজিক সংহতিরও পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।

দুর্যোগ নয়, সচেতনতা হোক নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই-কিন্তু প্রস্তুতি, তথ্য এবং সচেতনতাই পারে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে।
ঘূর্ণিঝড় ‘শক্তি’ হোক বা না হোক-এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সতর্ক থাকা, সচেতন থাকা এবং প্রস্তুত থাকা।


এ জাতীয় আরো খবর