১৪ মে, ভোরের আলো ফোটার আগেই সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যেন হয়ে উঠবে এক অন্যরকম তীর্থস্থান। ৪১৯ জন হজযাত্রী, সাদা কাপড়ে আবৃত, চোখে স্বপ্ন আর হৃদয়ে আবেগ নিয়ে রওনা হবেন মহান পবিত্র মক্কা-মদিনার পথে। তবে এবার গল্পটা একটু আলাদা। কারণ, এই প্রথমবারের মতো পাঁচটি সরাসরি হজ ফ্লাইট চালু হচ্ছে সিলেট থেকে।
দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের পথে প্রথম পা
এতদিন হজযাত্রীদের ঢাকা হয়ে যেতে হতো। সিলেটের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে স্বপ্ন দেখতেন-নিজের শহর থেকেই যেন পবিত্র ভূমিতে যাত্রা শুরু করতে পারেন। এবার সেই স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ বিমানের সিলেট ম্যানেজার শাহনেওয়াজ তালুকদার জানিয়েছেন, “১৪ মে প্রথম ফ্লাইটটি যাবে সরাসরি মদিনায়। এরপর ২৩, ২৫, ২৬ ও ২৯ মে যথাক্রমে চারটি ফ্লাইট যাবে সিলেট-জেদ্দা রুটে।”
প্রবীণদের জন্য স্বস্তির বার্তা
সিলেট অঞ্চলে প্রতি বছর অনেক বয়স্ক মানুষ হজে যান। তাদের জন্য ঢাকা হয়ে যাত্রা মানেই ছিল ধকল, বাড়তি খরচ আর মানসিক চাপ।
এবার সিলেট থেকেই সরাসরি ফ্লাইট চালু হওয়ায় সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পাচ্ছেন এই প্রবীণ হজযাত্রীরা।
৭০ বছর বয়সী হজযাত্রী আব্দুল মতিন বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ! এবার আর ঢাকায় দৌড়াতে হবে না। বাড়ির পাশে বিমানবন্দর থেকে মদিনায় রওনা দিতে পারব, এটা ভাবতেই চোখ ভিজে আসে।”
‘রোড টু মক্কা’ সুবিধা না থাকলেও প্রত্যাশা অটুট
ঢাকা থেকে যাওয়া হজযাত্রীরা ‘রোড টু মক্কা’ প্রকল্পের আওতায় সৌদিতে ইমিগ্রেশন ছাড়াই ঢাকায় সব কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারবেন। কিন্তু সিলেট থেকে যাওয়া যাত্রীদের ইমিগ্রেশন হবে সৌদিতেই।
তবে হজযাত্রী ও ট্রাভেল এজেন্টরা বলছেন, “প্রকল্পে না থাকলেও আমরা খুশি-আমরা এখন অন্তত সিলেট থেকেই যেতে পারছি।”
২ হাজার ৭০০ জনের মহাযাত্রা, সিলেটের গর্ব
এই বছর ২ হাজার ৭০০ হজযাত্রী যাচ্ছেন সিলেট অঞ্চল থেকে, যার মধ্যে ২ হাজার ৯৫ জন যাচ্ছেন বাংলাদেশ বিমানের সরাসরি ফ্লাইটে।
আটাব সিলেট জোনের সভাপতি মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান খান রেজওয়ান জানিয়েছেন, “এই উদ্যোগ কেবল ধর্মীয় অনুভূতির বিষয় নয়, এটা সিলেটের সম্মানেরও প্রতীক।”
সিলেটের তিনটি শীর্ষ এজেন্সির সফল সমন্বয়
সিলেটের তিনটি অভিজ্ঞ হজ এজেন্সি পুরো কার্যক্রমের দায়িত্ব নিয়েছে। নিবন্ধন, ভিসা, প্রশিক্ষণ-সবই হয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে। ফলে যাত্রীদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমেছে।
এই উদ্যোগ কি কেবল শুরু?
সিলেট থেকে সরাসরি হজ ফ্লাইট চালু হওয়া শুধু একটি সুবিধা নয়, এটি বাংলাদেশের বিকেন্দ্রীকরণ ও আঞ্চলিক উন্নয়নের একটি বড় উদাহরণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “যদি এই প্রকল্প সফল হয়, ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল থেকেও এ ধরনের ফ্লাইট চালু হতে পারে।”
শেষ কথায়-এটা কেবল একটি ফ্লাইট নয়, এটা সিলেটবাসীর আত্মপরিচয়ের উড়ান
১৪ মে ভোরে যখন বিমানটি মদিনার উদ্দেশ্যে আকাশে উঠবে, তখন শুধু ৪১৯ যাত্রীই উড়বেন না-উড়বে সিলেটবাসীর গর্ব, ভালোবাসা ও দীর্ঘ অপেক্ষার প্রাপ্তি।