শনিবার, অক্টোবর ৩, ২০২৬

মোঃ বি ন য় আ মি ন

  • হাইপার ড্রাইভ
  • ২০২৫-০৩-২৪ ১৬:১৩:২০

দুপুরেবেলা বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম । আমার কাছে যদি একটি টাইম মেশিন থাকত কিংবা আমি যদি হাইপার ড্রাইভ দিতে পারতাম ? তা হলে কি হত ? আসলে আমি তো খুব সাধারণ একজন মানুষ , আমার চাওয়া পাওয়াও খুব সাধারণ এবং সামন্য । এই " যদি " ই যদি সম্ভব হত তবে খুব নিকট অতীতে চলে যাব । সময়ের উপর ভর করে আশি দশকে চলে যাব , একেবারে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে দেখব । এই আশি দশকের বিনয় আমিনকে । সেই সাথে সবাইকে । স্কুলের বন্ধু - কলেজের বন্ধুদের । আমাদের জোড় পুকুর , যেখানে ঘন্টার পর ঘন্টা গোসল করা , সারা পুকুরে দাবিয়ে বেড়া । ঢাল পাড় ব্রিজ থেকে পুকুরে গোঁত্তা মারা । তারপর চোখ দুটো লাল টকটকে ঘরে ফিরে মায়ের হাতে হালকা পাতলা মার খাওয়া । সেদিন থাকবে রোববার তাই স্কুল বন্ধ । বিকেলে মাজার মসজিদের মাঠে দলবেঁধে মহল্লার বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলা । একটু বৃষ্টি থাকলে খেলাটা আরেকটু জমবে । সাথে তিনফুট উঁচু ফুটপাথ থেকে কিছু আলস দর্শক আমাদের খেলা দেখবে । হইচই করে বা হাততালি দিয়ে তাদের আনন্দ প্রকাশ করবে । আরেক দিন খেলা সংক্ষিপ্ত করে গল্পের আসর বসবে । কেউ একজন গল্প বলা শুরু করবে সেই গল্প সন্ধ্যার আগে শেষ হবে না । এসব গল্পের মাঝে ভুত প্রেত বা রাজা বাদশা থাকবে । যখন আমি একা থাকব তখন খুঁজব যেখানে পথ চিকিৎসকেরা মজমা জমিয়ে বসেছে -- কানা জব্বর আলী - মলম বিক্রেতা , রুস্তম আলী - কৃমির ওষুধ বিক্রেতা , মেমচোরা বাতের বড়ি , বা শ্রীপুরর লাল - সবুজ বাতের বড়ি । কুদ্দুস মোল্লার তাবিজ তোমক । এদের মজার মজার কথাগুলি আবার শুনব ! ফিরে যাব আমার যুবা বয়সের সন্ধিক্ষণে ।
এলাকার বড়ভাই - মনির ভাই দুইটি বঁড়শি হাতে নিয়ে এসে বলবেন এই - বিনয় চল মাছ ধরতে যাই । তুমিও থাকলে একটা নিও । আমি মুড়ি চানাচুর নিয়েছি । তোমার ক্ষুধা পেলে খাবে । মাছ ধরার নেশায় চলে যাই সেই তিন চার কিলো মিটার দূরে মেরাদিয়া খালের পাড় । এই অঞ্চলে ধান খেত - পুকুর ডোবার অভাব নেই , অভাব নেই মাছের । মাছ যে সব সময় বঁড়শিতে ধরা খেত তা কিন্তু নয় । বড়শি নিয়ে বসে থাকা আর গল্পবাজ মনির ভাইয়ের মজার মজার গল্প যা শুনে আমি হাসতে হাসতে নরম ঘাসের উপরে শুয়ে পড়ব । সেই গল্প আবার আমি ফিরে এসে বন্ধুদের বলব তারাও খুব মজা পাবে । আশি দশকের শুরুর দিনগুলি এমনটি থাকবে ।
ঈদের দিনে বাবা এক সের গরুর মাংস কিনে আনবেন , এর সাথে দুই সের আলু দেবেন । সেই ঈদের রান্না করা মাংস আমরা ছোটরা রসিয়ে রসিয়ে খাব দুই দিন ধরে । মাংস তো ঈদের রাতেই শেষ হয়ে যাবে কিন্তু ঝোল মাখানো আলু থেকে যাবে -- বিকেল বেলা সেই আলু মাখানো ঝোল নোয়াখাইল্ল্যা দোকান থেকে চার ছটাক ( এক পোয়া বা ২৫০ গ্রাম ) মুড়ি কিনে মেখে খাব । এইটুকু মাখানো মুড়ি নিয়ে চার ভাই বোনের মাঝে একটু কাড়াকাড়ি লেগে যাবে । ছোট ভাই অভিযোগ করে বলবে -- ভাই তুই বেশী খেয়েছিস । বোন বলবে -- আমি তো পেলাম না । আরেকটু মুড়ি কেনার পয়সা নেই তো । তাই দুই চারটি আলু খেয়ে মনকে শান্তনা দেব !
কিছু একটা নিয়ে আদরের ছোট ভাইটির সাথে এক পশলা মারামারি করব -- একবার নয় হাজারবার । আদরের ছোট বোনটিকে কোন কারণে বেশ মার দেব । সে কেঁদে কেঁদে বাবার কাছে বিচার দেবে । বাবা পেয়ারা গাছের ঠাল দিয়ে আমাকে বেদম মার দেবেন , সে মার দেখে ছোট বোনের কান্না । বাবাকে থামতে বলবে । বাবার মাথায় যেন খুন চেপে যাবে । কিন্তু তিনিও থামবেন এক সময় , দেখবেন আমি মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি দেব ।
তিন চার বন্ধু - দল বেঁধে জোনাকি সিনেমা হলে চলে যাব সিনেমা দেখতে । আমাদের টাকা পয়সা তো কম , তাই আমরা থার্ড ক্লাসের টিকিট কাটব মাত্র এক টাকা পঁচিশ পয়সা দিয়ে । সিনেমা শেষে বাড়ি ফেরব সদ্য দেখা সিনেমার গানের সুর তুলে তুলে বা সিনেমার কাহিনীর হাসির দিক বলে বলে । তখন সেই দৃশ্য মনে হতেই হাসি দিয়ে মাটিতে বসে পড়ব । রবিউল , হাবা হাসমত , খাঁন জয়নুল বা টেলি সামাদের অভিনয়ের কথা মনে পড়লেই সে দৃশ্যের কথা মনে পড়ে যাবে । টয়লেটে বসেও হাসব । সেই হাসির রেশ চার পাঁচ দিন থাকবে । ক্লাসে বসেও হাসব । স্যার জিজ্ঞেস করবেন - এই দাঁড়া , হাসছিস কেন ? আমি বলব - স্যার এমেনি ! স্যার রেগে বলবেন - কান ধরে দাঁড়িয়ে থাক !
সিনেমা দেখে ঘরে ফিরে দেখব বাবা এখন ঘরে নেই বলে বিরাট করে শ্বাস ছেড়ে হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বসব । ক্ষুধা পাবে কিন্তু নাস্তা দেবার কেউ থাকবে না । মুড়ি থাকবে ওস্টার মিল্কের ডিব্বায় তাই নিয়ে খেতে বসব । বা তিন পয়সার দুটি বাবুল বিস্কুট কিনে আনব নোয়াখাইল্ল্যার দোকান থেকে । বাবা আসার আগেই আমাদের পড়াশুনা শেষ হয়ে যাবে ! আসলে পড়াশুনা চাপ থাকবে খুব কম ।
বৃষ্টি হচ্ছিল মুষলধারে হতে থাকবে । চার পাঁচ বন্ধু এসে ডাকাডাকি করবে -- ভিজবে বলে । এদের কারোর হাতে ছোট একটি রাবারের বল থাকবে । বলা মাত্রই বের হয়ে যাব । বৃষ্টিতে ভেজা , কাদায় মাখামাখি , রাস্তার পাশে পেয়ারা গাছের কষ্টি পেয়ার চিবাবো । বৃষ্টি কমে আসবে জোড় পুকুরে দল বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়াব । চলতেই থাকবে যে পর্যন্ত চোখ দুটি লাল না হবে । এই সময় বাসায় এসে মায়ের কাছে বুকুনি খেতে হবে ? হয়ত হবে , হয়ত হবে না ।
শীতের আগনের সাথে সাথে বাতাসের গতি বদলে যাবে । চলবে বন্ধুদের মাঝে ঘুড়ি উড়ান । সুতা মাঞ্জা । যাদের পয়সা থাকবে তারা ভাল নাটাই কিনবে , রহমত আলিদের কাছ থেকে ঘুড়ি নাটাই আর মাঞ্জার সরঞ্জাম কিনে নেবে । আমার এতো পয়সা থাকবে না । আমি আস্টার মিল্কের ডিব্বাকে নাটাই হিসেবে বানাব । আর হাতে বানান ঘুড়ি, যা লেখার কাগজ দিয়ে বানাব । তবে আমি প্যাঁচ খেলতে যাব না । কেউ প্যাঁচ লাগাবে -- আব্বাস , আশরাফ - চান মিয়া প্যাঁচ খেলায় ওস্তাদ হবে । আমার ঘুড়ি তাড়াতাড়ি নামিয়ে নেব । ওরা আমাকে " পেতু " বলে টিটকারি দেবে !
কোন এক দুপুরে দুই বন্ধু মিলে বের হয়ে পড়ব , মুকুলদের গাছের টসটসে কামরাঙা চুরি করব । বা আশরাফদের বাসার পিছনে হাই সাহেবের শ্বশুর বাড়িতে পেয়ারা গাছের পেয়ারা চুরি করব । খুব মজার পেয়ারা । বা ছোট বাদলদের বাসার ছাদ ডিংগিয়ে বড় বাদল ভাইদের বাসার ছাদে চলে যাব খুব সাবধানে । যেন কেউ টের না পায় চার পাঁচটে কাঁচা পাকা পেয়ারা পেড়ে নেব -- তবে খুব সাবধানে পাড়ব । এরা অনেক ভাই বোন তো যে কেউ গাছের নীচে এমনিতেই ঘুর ঘুর করবে । দেখে ফেললে আমাদের খবর হবে । আমার সাথে থাকবে বন্ধু চান মিয়া । আধা পাকা পেয়ারা নিয়ে খিল গাঁও রেইল গেইটের অল্প দূরে ঢালের দুর্বা ঘাসের গালিচায় বসে পকেটে থাকা লবন মরিচ মিশিয়ে খুব আয়েশ করে , গল্প করে করে খাব । আমাদের খাওয়া শেষ হতে হতে আমাদের খোঁজে দুই একজন বন্ধু চলে আসবে --- বিকেলে মাজার মাঠে আজকে নিজেদের মধ্যে ফুটবলের ম্যাচ বা বাজি থাকবে । যে দল জিতবে সে দল খাওয়াবে চটপটি আর আইসক্রিম । তবে চটপটি বিক্রি করে বাজারের মুখে । এলাকায় এক মাত্র বিক্রেতা । সকাল বেলা থেকে দুপুর বারোটা অব্দি । ঝাল মুড়িও পাওয়া যায় । ঘটি চেনাচুর আসে সন্ধ্যাবেলা । মুড়ি চানাচুর - কাঁচা মরিচ পেয়াজ মিশিয়ে খাওয়া হতে পারে । খাই তো আমরা, প্রায় সময় । চাদা চার আনা বা বেশী হলে আট আনা । ফজলু বেশী দেবে --- ও দোকানে বসে । আমাদের অনেকের কাছে পয়সা থাকবে না কিন্তু ফজলু বা আশারাফের কাছে পয়সা থাকবে ।
তারপর আশি দশকের শেষের দিকে কলেজে চলে যাব । এখন আমি বড় হয়ে হবো । যুবক । স্বাধীন । কলেজের স্যারেরা আপনি করে বলবেন । অবাক কান্ড ! স্যারেরা ছাত্রদের আপনি করে ডাকবেন কেন ? এরা কি মনে করছেন আমরা এস এস সি পাশ করে বড় হয়ে গেছি । আসলেই তো বড় হয়েছি । আমাদের কেউ কেউ ক্লিন সেভ করে , গালে আফটার সেভ লোশন মেখে আসবে । স্যার মেডামেরা বলবেন " তোমরা একটু বড় হয়ে গেছ বটে কিন্তু তত বড় হওনি । মাত্র স্কুলের গন্ডি পাড় হয়েছ । ভার্সিটিতে যখন যাবে তখন বুঝবে আসলেই বড় হয়েছ ।"
কিভাবে যেন কলেজের বরাদ্দ দুই বছর পার হয়ে যাবে । এসে যাবে আশি দশকের চূড়ান্ত সময়ের শেষ সীমান্তে ।
" এই উঠো উঠো --- আর কত ঘুমাও ? মাগরিবের আজান দিয়েছে । " বউয়ের ডাকাডাকিতে হাইপার ড্রাইভারের সময় পরিভ্রমণ সংক্ষিপ্ত হয়ে গেল ! আজ ২০২৪ সনের এপ্রিল মাস । গরমের চটে কাহিল অবস্থা ।

 


এ জাতীয় আরো খবর