তারপর দেখলাম নদীটা বুকে হেঁটে এগোচ্ছে। দিনান্তের শেষ সূর্য তার বাড়ি ফিরে যাচ্ছে রাজপথের পাশের গলিপথ দিয়ে । পাহাড়টা উঠে দাঁড়িয়ে হঠাৎ গান ধরলো অচেনা গলায়। ঠিক সেই সময় ..... সেই পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে আকাশের কোলে মাথা রেখে রোদের ঘুমিয়ে পড়ার সময় ---
মেয়েটি ছেলেটিকে বললো...
......শোনো ।
......বলো ।
.....আবার কবে দেখা হবে ?
......আর কি দেখা হবে ?
........হবে না ?
........হয়তো না ।
.......কেন ?
.......তা তো জানি না।
........তাহলে তোমার কথা ভুল।
........হয়তো ভুল।
অনেকক্ষণ সব চুপচাপ। দুজনে শুধু দুজনের পিঠের ওম নিচ্ছে আর যে যার মতো ঘাস ছিঁড়ে তাদের বুকের পাঁজর গুনে যাচ্ছে। কতক্ষণ এভাবে কাটলো হিসেব নেই। আকাশের কালো চুল তখন গাছের পাতা বেয়ে নেমে এসেছে ছেলে এবং মেয়েটির গায়ে। যেন সেই ছোঁয়ায় জেগে উঠে ছেলেটি এবার বললো----------------
.........কি ভাবছো ?
...........কিছু না।
...........কিচ্ছু ভাবছো না ?
......... না ।
........তোমার ভাবনা হচ্ছে না ?
....... না।
..........তোমার ভয় করছে না ?
........... না।
...........কিন্তু কেন ?
..........জানি না তো !
..........আর যদি কখনো দেখা না হয় ?
.......... না হলে হবে না ।
........... আর যদি এভাবে কথা বলতে না পারি ?
.......... না পারলে পারবো না ।
......... আর যদি এমনি করে না ছুঁয়ে থাকতে পারো ?
........আমি তো তোমাকে সবসময় ছুঁয়েই থাকি।
........কি করে ? এও কি সম্ভব ? ( ছেলেটি উত্তেজিত)
.......সব সম্ভব।
.......কই, আমি তো পারি না ?
....... সে তোমার সীমাবদ্ধতা।
........(ছেলেটি এবার রাগে ফেটে পড়লো) কি বললে ? আমার সীমাবদ্ধতা? আমার ভালোবাসা, আবেগ, চাওয়া ...সব তোমার কাছে এত ঠুনকো?
.........তা তো বলি নি ।
.........তা হলে কী বলছো তুমি? কী বোঝাতে চাইছো ?
........তোমাকে তো কিছুই বোঝাতে চাই না আমি।
........তা হলে এ কথা বললে কেন ?
.......আমি যা ভাবি শুধু সেটুকুই বললাম তোমায়।
ছেলেটি সটান উঠে দাঁড়ালো। তখন অন্ধকারের চাদর পুরোপুরি মুড়ে ফেলেছে ওদের। কেউ কারো মুখ দেখতে পাচ্ছে না। এদিকে ছোঁয়াটাও হারিয়ে গেছে দাঁড়ানোর ব্যস্ততায়। দূরে কোথাও শাঁখ বাজিয়ে সন্ধ্যে দিচ্ছে গৃহস্থ বাড়ির গৃহলক্ষ্মী। উৎসব শুরু করেছে ঝিঁ ঝিঁ পোকার দল। বেশ কিছুক্ষণ তারা এভাবে একলা একা দাঁড়িয়ে থাকলো। আবারও নীরবতা ভাঙলো ছেলেটি। অন্ধকারের বুক চিরে প্রশ্ন করলো------------
.......... ভালোবাসো ?
(না দেখতে পাওয়া মুখ থেকে সঠিকভাবে ধেয়ে এলো)
............খুউউব।
...........তাহলে এমন করে থাকো কেন ? এত অস্বাভাবিক!
.......... কেমন করে থাকি ? আমি কিন্তু খুব স্বাভাবিক।
..........এত নির্লিপ্ত কেন ? এমন অপূর্ণতা নিয়ে বাঁচতে পারবে ?
.........আমি অপূর্ণ তোমাকে কে বললো ? আমি তো কানায় কানায় পূর্ণ।
..........আমাকে না পেয়েও তুমি কীভাবে পূর্ণ হও?
......... তোমাকে তো পেয়েছি আমার মতো করে।
.......... এ পাওয়া তো অসম্পূর্ণ পাওয়া ! একে তুমি পূর্ণতা বলো ?
(মেয়েটি এবার অন্ধকারের বুকে হাজার ওয়াট বাতি জ্বেলে হাঃ হাঃ করে হেসে উঠলো )
..........আমার চেয়ে পূর্ণ করে তোমাকে আর কেউ পেতে পারবে ?
.......... মানে ?
.......... মানে--- আমার ভিতর তোমার এই যে ঘর বাড়ি, এই সংসার পেতে সারাক্ষণ ঝগড়া, খুনসুটি, প্রেম, আদর, আবদার ...সব....সব চলে, বলো তো....এমনটি করে আর কেউ তোমাকে পাবে ?
.......... কিন্তু .......
......... কিন্তু তুমি আমাকে এভাবে পাও না------ তাই তো ? আরে বাবা, এটাই তো তোমার সীমাবদ্ধতা। এতে রাগের কি আছে ? তুমি আমাকে তোমার চোখের দৃষ্টি দিয়ে যতটা দেখো, আমি বন্ধ চোখে মনের দৃষ্টি দিয়ে আরো অনেক অনেক বেশি করে দেখি তোমায়। প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করি তোমার বুকের ধুকপুক। একলা হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ করে বুঝতে পারি তুমি আমার পাশেই হাঁটছো। তোমার আলোতে.....আঁধারে আমিই তো তোমাকে ছুঁয়ে থাকি। তুমি বুঝতেই পারো না। খালি খালি আমার উপর রাগ করো।
তাই আজ একটা সিদ্ধান্তে এসেই গেলাম।
..........কি সিদ্ধান্ত ?
..........তোমার প্রতি কোনো অভিযোগ আমার কোনোদিনই ছিলো না.....আজও নেই। আমি শুধু তোমাকে ভালোবাসতে পেরেই ধন্য। তোমাকেও চিরজীবনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই কারন তুমিই আমাকে শিখিয়েছো....ভালোবাসা আসলে কী ? জীবনের পরম পাওয়া আমার হয়ে গেছে। এখন আর আমার কিছু পাবার নেই এ জগৎ থেকে। তাই আজ এই জগতের সঙ্গে আমার সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করলাম ....একমাত্র আমার ভালোবাসার জন্য। এই সুখ নিয়ে আজ তোমার কাছ থেকেও বিদায় নিচ্ছি। ভালো থেকো......( আর কিছু বললো না মেয়েটি। ছেলেটিকেও বিন্দুমাত্র বলার সুযোগ না দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো পাহাড় থেকে । খাদের গভীর অতল থেকে একটা অস্পষ্ট কথা ভেসে এলো......ভা....লো....বা.....সি..........)
ছেলেটির সামনে মুহূর্তে সারা পৃথিবী দুলে উঠলো। পায়ের মাটি সরে গেল এক লহমায়। আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাথা ঘুরে সে পড়ে গেল অন্ধকার মাটির বুকে। জীবনের চাওয়া -পাওয়া, কান্না-হাসি, ক্ষোভ-বিক্ষোভ ....সব.....সব থেকে গেল পেছনে।
আসলে ভালোবাসার হিসেব হয় না কোনো।