মৈত্রেয়ী দেবী কবি, লেখক ও ঔপন্যাসিক।
তাঁর বিখ্যাত আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস 'ন হন্যতে' তাঁকে বিশেষ খ্যাতি এনে দেয়। এই উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৭৬ সালে সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।
উপন্যাসটি ইংরেজিতে 'ইট ডাজ নট ডাই' নামে অনূদিত হয়েছে।
সাহিত্য ছাড়াও সমাজসেবায় অনন্য অবদান রেখেছেন। ১৯৭৭ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ সম্মাননা 'পদ্মশ্রী' পুরস্কারে ভূষিত হন।
জন্ম ১৯১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর পিতার কর্মস্থল চট্টগ্রামে। পিতা সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ও মাতা হিমানী মাধুরী রায়।
তাঁর বাবা ছিলেন একজন দার্শনিক ও প্রাবন্ধিক। মৈত্রেয়ী দেবীর শৈশব কাটে তাঁদের পৈতৃক নিবাস বৃহত্তর বরিশালের আগৈলঝরার গৈলা গ্রামে।
১৯৩৬ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৩৪ সালে তিনি ড. মনোমোহন সেনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মনোমোহন সেন ছিলেন একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী। তিনি মংপুতে সিনকোনা ফ্যাক্টরির ম্যানেজার ছিলেন ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী ভেষজ সিনকোনা চাষ নিয়ে গবেষণা করেন।
মৈত্রেয়ী দেবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহভাজন হওয়ায় তাঁরা মংপুতে থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথ মৈত্রেয়ীর আমন্ত্রণে ১৯৩৮ সাল থেকে ১৯৪০ সালে চারবার সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন।
তাঁর সাহিত্য জীবন শুরু ষোল বছর বয়সে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'উদিত' ১৯৩০ সালে প্রকাশিত হয়। এই বইয়ের ভূমিকা লিখেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'চিত্তছায়া'।
১৯৪২ সালে রবীন্দ্রনাথের মংপুতে কাটানো দিনগুলোর স্মৃতি ও তাঁর সাথে আলাপচারিতা নিয়ে লিখেন স্মৃতিকথা 'মংপুতে রবীন্দ্রনাথ'। বইটি 'টেগোর বাই ফায়ারসাইড' নামে ইংরেজিতে অনূদিত হয়।
রবীন্দ্র বিষয়ক তাঁর অন্যান্য বইগুলো হলো স্বর্গের কাছাকাছি, কবি সার্বভৌম, রবীন্দ্রনাথ গৃহে ও বিশ্বে, রবীন্দ্রনাথ: দি ম্যান বিহাইন্ড হিজ পোয়েট্রি।
'ন হন্যতে' মানে 'যাকে বিনাশ করা যায় না'। এই বইতে তিনি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, জীবন বোধ, ইংরেজ শাসনামলের সমাজ ব্যবস্থা এবং জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরেন।
১৯৬১ সালে রবীন্দ্র শতবার্ষিকীতে আমন্ত্রিত হয়ে তিনি বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন যান৷ সোভিয়েত ইউনিয়ন তাঁকে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী পদকে ভূষিত করে।
মৈত্রেয়ী দেবী সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইউরোপ ও আমেরিকাতে রবীন্দ্রনাথের ওপরে ও শান্তির সমস্যা বিষয়ক বহু ভাষণ দেন।
তিনি ১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলাকালীন 'কাউন্সিল ফর প্রমোশন অব কমিউনাল হারমনি' সংস্থা স্থাপন করেন।
তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দিয়েছিলেন।
এছাড়া এই সময়ে তিনি কলকাতা থেকে ২৪ মাইল দূরে বাদু নামক গ্রামে ৯ বিঘা জমি জুড়ে কৃষি, মীন পালন, মৌ পালন, গো পালন, হাঁস, কুকুর পালনের সাথে শরনার্থী শিবিরের অনাথ শিশুদের জন্য 'খেলাঘর' নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এই সংস্থার দেখাশুনা করেন।
১৯৯০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।