অগ্রজ নেতা
হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দিকে ছাপিয়ে
একজন শেখ মুজিবের-
জাতির স্বাধীনতার প্রতীক পুরুষ হয়ে উঠবার; কাণ্ডারি হয়ে উঠবার; সর্বোপরি
বংগবন্ধু থেকে জনক হয়ে উঠবার গল্পটি স্বার্থক হয়ে উঠেছিলঃ
বৃহৎ বাঙালি সংহতি চেতনার সামষ্টিক রূপায়নে।
কিন্তু
অজপাড়া গাঁ টুঙ্গিপাড়া থেকে উঠে আসা একজন শেখ মুজিব
কি করে করলেন এমন অসাধ্য সাধন! কোন মোহন বাঁশির সূরে
তিনি জাগিয়ে দিলেন হতাশা নিমজ্জনে ডুবে থাকা, পড়ে পড়ে মার খাওয়া
একটা জাতিকে! হ্যাঁ, তিনি পেরেছিলেন বটে। তিনিই বাঙালি জাতিকে
দিতে পেরেছিলেন পথের সন্ধান! মুক্তির পথরেখা!
কিন্তু কি করে?
আসলে তিনি ছিলেন রাজনীতির কবি।
যার বুকে ছিল স্বাধীনতার প্রচ্ছদ ছবি।।
‘শত্রুতার বীজ বুনে’
যেদিন শিখর কর্তা সেজে ওরা ছাপ্পান্ন ভাগ জনগণের ভাষা
‘বাংলাকে’
‘না’ বলে
উর্দুকে বেছে নিয়েছিল পাকিস্তানের একমাত্র
রাষ্ট্রভাষারূপে;
সেই থেকে, সেদিন থেকে শুরু হয়েছিল
বাংলার বাঙালিদের
জীবনের অংক মিলিয়ে জাগরণের নয়া ইতিহাস গড়ার
নতুন বেলা। জাতিগত সন্ধিক্ষণের সে কালে একজন শেখ মুজিব
অভ্যন্তরীণ শূন্যতা ভেদ করে সময়ের কাঁধে হাত রেখে ধীরে ধীরে
এগিয়ে এলেন অনেকের অলক্ষ্যে। সেদিন তিনি আরো অনেকের মত
নির্বিকার চিত্তে ঠায় বসে থাকেননিঃ
নীরবে নিশ্চুপে।
তিনি বাঙালির দুঃখ দিনের মনের সাথী হলেন; সঙ্গের সাথী হলেন। অনিরুদ্ধতার
ঘোষণা দিয়ে তিনি এগিয়ে এলেন বাঙালি সত্তার আভিজাত্যের
উদ্ধার অভিযানে।
তার গমগম করে বেজে উঠা কণ্ঠস্বরে বাঙালি শুনতে পেলো
হ্যামিলনের বাঁশীওয়ালার ডাক।
লাভের সম্ভাবনায় এগুনো দ্বিধাগ্রস্ত মধ্যবিত্ত; হতাশা নিমজ্জনে ডুবে থাকা
মজদুর; আপনি বাঁচার দর্শনে বিশ্বাসী অভিজাত শ্রেণী; নানান সামাজিক শক্তির
টানাপোড়ন আর অনেকের সাধের পাকিস্তানের প্রতি মতিচ্ছন্ন বিভ্রান্তিকে ঘুচিয়ে তিনি
এক করে ফেললেনঃ
এক দুর্লভ মহা নেতৃত্বের গুণে।
ধীরে ধীরে
৫২, ৬২, ৬৬, ৬৯, ৭০ উত্তাল সময় পেরিয়ে তিনি জাতিকে
৭১ এর
আগুন সময়ে নিয়ে এলেন। থাকলেন
মোক্ষম সময়ের অপেক্ষায়।
ততদিনে তিনি বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্নগুলোকে
নিটোল স্বপ্নে পরিণত করে বাঙালিকে দিয়ে দিয়েছেন
বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভাবাদর্শ ও দর্শন।
৭ মার্চ তারিখে জনতার কবি শেখ মুজিব
কবিতার চেয়েও কাব্যিকভাবে জনতাকে শুধালেন তার সেই
অমর কাব্যের কবিতাখানি। জনতা বুঝে নিলো হিসাব।
আলোচনার নামে চলা ইঁদুর- বিড়াল খেলার মাঝেই
রক্তচঞ্চল উত্তাল মিছিলে মিছিলে সয়লাব হয়ে গেলো
সমগ্র বঙ্গীয় সমতল। বাঙালির বুকের রাজপথে ফুটলো হাজারো
রক্তপলাশ। সমুদ্রের মত ফুঁসে উঠলো জনতা।
সময়ের অপেক্ষায় থাকা সেনাপতি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া; অপেক্ষায় থাকলেন বাঙালির প্রাণের বন্ধু হয়ে উঠা শেখ মুজিবও।
ঢাকার আকাশে পাকিদের প্রথম গুলির শব্দ ধ্বনি বেজে উঠতে না উঠতেই
ছাব্বিশের প্রথম প্রহরে ইথারে ইথারে ভেসে এলো সেই শেখ মুজিবের গমগমে কণ্ঠস্বর। তিনি বললেনঃ
আজ থেকে আমরা স্বাধীন।
একাত্তরের সেই আগুন সময়ে বাঁচ-মরার জীবন্ত সংকটে থাকা
বীর বাঙালি জনতা সকল উত্তেজনার পারদ উঠালো
বারুদ গন্ধ সময়ের হাত ধরে।
অপুর্ব থেকে অপেক্ষায় থাকা; প্রস্তুত হয়ে থাকা
বীর বাঙালি জনতা চেতনায় মুক্তির এস্রাজ বাজিয়ে
বহমান রক্তস্রোতে মিশে
অস্ত্র হাতে নেমে পড়লোঃ
মরণপণ লড়াইয়ে।
টর্চার সেলের ভয়ংকর অত্যাচার; ভারী বোমার আওয়াজ; দাউ দাউ আগুনের
লেলিহান শিখা; শ্বাপদ অপশক্তি পাকিদের মেশিনগানের ঠা ঠা শব্দ
সেদিন ভয় জাগাতে পারেনি উদ্দীপ্ত তরুণের অসীম সাহসী বুকে। টগবগ করে ফোটা তাদের
অন্তরাত্মা সেদিন শুনেছে শুধুঃ
জয়ভেরি বাজে ঐ দূরে!
এক সময় জয় ধ্বনির কোলাহলে বাঙালি জীবনে নেমে এলোঃ
নূতন ভোরের আলো। এলো অপুর্ণ সাধের স্বাধীনতা।
বীরের বেশে ফিরে এলেন শেখ মুজিবঃ
জনকের বসন পরে।
স্বাধীনতার আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে
বংগবন্ধু মুজিব
স্বাধীনতার স্থপতি মুজিব
জাতির জনক শেখ মুজিব
দেশ গড়ার সংগ্রামে নেমে পড়লেনঃ
তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেনঃ
স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার দৃঢ়
প্রত্যয় ও ব্রতে।
কিন্তু হায়!
প্রতিশোধের প্রত্যাশায় ওঁত পেতে থাকা পাকি চরের দল একদিন সুযোগ বুঝে
এগিয়ে এলো। ওরা হিংস্র বর্বরতায়
থামিয়ে দিলো সব কিছু! হারিয়ে গেলেন
বঙ্গবন্ধুঃ
তমসাচ্ছন্ন পনেরো আগস্টের অন্ধকার গহবরে!
এখন বাঙালির চোখে চোখে শোকের দীর্ঘ বালুচর।
পাকি চরদের নির্মম হিংস্রতা থামাতে পারেনি বলে সহস্র রাতের আঁধার যেন
অভিশাপ হয়ে লেপ্টে আছে বাঙালির হৃদয়ের অলিন্দে অলিন্দে।
চারপাশ জুড়ে যেন এখন মরুভূমির ধূ-ধূ শূন্যতা। আহা!
বুক বেয়ে নেমে আসা এক দীঘি জলও যেন যথেষ্ট নয়ঃ
অপারগতার দায়মুক্তি শোধে।
বাঙালির বর্ষা ভেজা অন্তর এখন শুধু হারিয়ে মানিক খুঁজে।
কিন্তু কোথায় পাবে তারে?
আর তাইতো
বাঙালি এখন কষ্টের বিষাক্ত দংশনে কাঁদেঃ
শূন্যতার ভাষায়।