মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬

এ স এ ম আ জা দ হো সে ন

  • একজন মনসুর আলী
  • ২০২৪-০৭-২৭ ২৩:০৫:৪৩

- রাখ তোর ঋতু-–ফিতু। আমার কাছে বছরের ৩৬৫ দিনই একই রকম মনে হয়। ওসব কবি সাহিত্যিকদের জন্য। ওঠ রিকশায় ... চল ঘুরে আসি । 
- ৩৬৫ দিনই একই রকম, কথাটা মনে ধরেছে মনসুর আলীর। তাছাড়া মনও আজ বিক্ষিপ্ত। শিখার সঙ্গে আবার দেখা হবার পর থেকে সে নিজেকে এসমাজের কেউ একজন ভাবতে শুরু করেছিলো। আত্মবিশ্বাস জন্মাচ্ছিল- কিছু না কিছু একটাতো হ’য়ে যাবেই। সেই শিখা আজ... 
বিনা বাক্যব্যয়ে রিকশায় উঠে বসে মনসুর আলী।কেরানীকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে,'কোথাও আমার হারিয়ে যেতে নেই মানা', চল বন্ধু আজ তুমি যেখানেই আমাকে নেবে আমি সেখানেই যাব, বিনা সংকোচে-হা হা হা। 
কেরানী টের পেল তার বন্ধুর মগজের নাট-বল্টুর কোথাও গড়বড় হয়েছে আজ,নইলে এধরনের আচরণ কখনোই ওকে করতে দেখেনি। কেরানী সিদ্ধান্ত নিল, আগে ওর ব্রেইন ট্রিটমেন্ট দরকার, তারপর পার্টি। কথা না বাড়িয়ে রিকশাওয়ালাকে বলল-এই রিকশা, চল মগবাজার।
মগবাজার মোড়ে রিকশা থেকে নামল তারা। কেরানী সিগারেট ধরালো, মনসুর আলীকে অফার করতেই সহাস্যে লুফে নিল সে। কেরানীকে অনুসরণ করে যে বাড়ির সামনে এসে দাড়ালো তার নাম 'শান্তি নিবাস'।প্রাচীর ঘেরা একটা একতলা বাড়ি। গেটের ভেতর হাতের দু'পাশে ফুলের বাগান। বাগানে ফুটে থাকা নানান রঙের ফুলের গন্ধে বাতাস ময়ময়। সব মিলিয়ে সুন্দর পরিবেশ। মনসুর আলীর মন অনেকটা ভালো হয়ে গেল। 
কলিংবেল টিপতেই গৃহভৃত্য এসে দরজা খুলে দিল। কেরানী জিজ্ঞেস করলো- কি রে আবুল, তোর মাইজি হ্যায় ? আবুল হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়ালো। কেরানীর যে এবাড়িতে অবাধ যাতায়াত মনসুর আলী বুঝল। 
- যাও, তোমার মাইজিকে বল আমি এসেছি,সঙ্গে মেহমান। 
- জি,আচ্ছা। আপনারা বসুন, আমি ডেকে দিচ্ছি। 
বসার ঘরে ঢুকে মনসুর আলীর মন পুরোপুরি ভালো হয়ে গেল। এত সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো ঘরে আগে কখনো সে ঢোকেনি । 
- কি বন্ধু! খারাপ জায়গায় এনেছি তোমাকে? বস,আরও ভালো লাগবে। 
- কোথায় তোমার খাস মেহমান,কেরানি? মেয়েলি কণ্ঠস্বরে মনসুর আলী চেয়ে দেখলো অপরূপ সাজে সজ্জিত এক রমণী তার সামনে দাঁড়িয়ে। উজ্জ্বল শ্যামলা ,মেদহীন দোহারা গড়ন, পটল চেরা চোখ, মুখে মুক্তঝরা হাসি,মার্জিত বেশ। অপুর্ব। 
- আরে, এস প্রিন্সেস। এ হল মনসুর, আমার কলেজ জীবনের বন্ধু। এরাইতো আমাকে কেরানী বলে ডাকতো। এদের গল্পই করেছি তোমার কাছে। মনসুর আজ আমার খাস মেহমান,তোমারও । বন্ধুর মনের অবস্থা ভালো নেই। তাই তোমার কাছে নিয়ে এলাম। আশাকরি প্রিন্সেস,আমার বন্ধুর সব দুঃখ তুমি ভুলিয়ে দেবে। 
ট্রে হাতে ঘরে ঢুকল আবুল, তাতে বিভিন্ন পানীয়র বোতল। দেশী-বিদেশী। কেরানী নিজ হাতে ঢেলে নিল। প্রিন্সেস দু-গ্লাসে ঢেলে একটি বাড়িয়ে দিল মনসুর আলীর দিকে। মনসুর আলীর মনে আজ কোন বাঁধা নেই, সংকোচ নেই।গ্লাস হাতে নিয়ে সহাস্যে প্রিন্সেসের সাথে চিয়ার্স করল-যেমনটি বাংলা সিনেমায় করে থাকে। 
ঘরে আলো আঁধারের খেলা। ক্যসেট প্লেয়ার বাজছে,সাথে প্রিন্সেসের ছন্দময় নাচ। মনসুর আলী গ্লাসের পর গ্লাস... , পুরো পৃথিবী এখন তার সামনে ঘুরছে। চোখের সামনে লাল-নীল-সবুজ-হলুদ রঙের বাহারি নাচন। মনসুর আলী এসবের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে...। তার কানে অস্ফুট বাজছে- এ নেশা শক্ত ...নেশা ... ... এ নেশা ... মাতাল ... করে। 
কারও নরম হাতের স্পর্শে মনসুর আলীর ঘুম ভাঙে । ছোট্ট পরিপাটি ঘরে নরম সফেদ বিছানায় নিজেকে আবিষ্কার করে সে। স্পর্শটা মাথায় অনুভব করেছিলো। পেছনে তাকাতেই মাথার কাছে প্রিন্সেসকে বসা দেখলো। তড়িঘড়ি উঠে বসে মনসুর আলী। 
- যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন ! সারারাত আমি আর আবুল... , আচ্ছা,এত খেয়েছিলেন কেন? 
- সত্যি,বড় কষ্ট দিয়েছি আপনাদের। মাফ করবেন। লজ্জিতভাবে উত্তর দেয় মনসুর আলী। কেরানী কোথায়? ওকে দেখছিনা যে? 
- আপনাকে আমার হেফাজতে রেখে কি এক বিশেষ কাজে রাতেই চলে গেছে, আসবে হয়তো এখুনি। 
- আমি এখন যাব। কেরানী এলে বলবেন পরে ওর সাথে দেখা করবো। 
- না,না তা কী করে হয়! আবুল আপনার জন্য নাস্তা আনছে ।আর কেরানী আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন,যার জিনিস তাকে বুঝে দেবনা ? 
- প্লিজ,আমাকে যেতে দিন। আমার জরুরী কাজ আছে। আমি পরে কেরানীকে বুঝিয়ে বলবো । আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করবো? 
- কী কথা, বলুন। 
- কেরানীর সাথে আপনার পরিচয় কীভাবে? ও আপনাকে প্রিন্সেস বলে ডাকল ...আপনার নাম ...। 
- সে অনেক কথা। আর এক ইতিহাস। সে কথা থাক। আপনার কিন্তু যাওয়া হচ্ছে না। 
মনসুর আলী বুঝলো এখানে বেশীক্ষণ থাকা মানে ঘনিষ্ঠতা । মায়ায় জড়িয়ে যাওয়া। সে আর মায়ায় জড়াতে চায় না। যতশীঘ্র সম্ভব বের হ’তে হবে। 
'শান্তি নিবাস' থেকে বের হয়ে বড় রাস্তায় এল সে। লায়লার বাসায় ফিরতে মন চাইছে না। এশহর তারকাছে অসহ্য লাগছে।সে পালাবে এখান থেকে। প্রকৃতি বা সমুদ্রের কাছে যাবে। পকেটে হাত দিল, একটা পাঁচ টাকার নোট আর একটা কাগজ বেরিয়ে এল। কাগজে শিখার নাম আর অফিসের ফোন নাম্বার লেখা। শিখার নাম সে আর মনে করতে চায় না। কাগজটা ফেলে দিতে যেয়েও কি মনে করে আবার পকেটেই রেখে দিল। সে পালাবে।আজই এশহর ছেড়ে পালাবে। দ্রুত বড় রাস্তাটা পার হতে চাইলো মনসুর আলী। কিন্তু তার আগেই রাস্তার মাঝা মাঝি ধাবমান ট্রাক... । 
- হ্যালো এটা কি ৯০০৯৬৯...?

 


এ জাতীয় আরো খবর