পরিচয়
আর ভবে ছিলাম কিনা জানি না
এই ভবে নই
আমাকে চেনে ওই গৃহপতি সমাধি
ভিটেমাটি
পোড়োঘর
গড়াই-বিধুত ভুঁই;
চেনে বুড়ো শ্যাওড়া কাঁটাভরা বাবলা
সুস্থিত হিজল শিমুল
চেনে জিভ ডেউয়া কামরাঙা চালতা
লটকন সফেদা তেঁতুল
চিনি আমি কদবেল আতাফল জামরুল
কষকষে বেতফল
চিনি ফাটা বাঙ্গি চুকামিঠা আমড়া
বকশি বিলের পানিফল
চেনে আহা ভাঁটফুল, শাপলা, সুভদ্রা-শিউলি, কদম-ভাদর
চেনে গাঁদা, কাশফুল, ধুতরা, সাপ-ডাকা-কামিনী, শুক্লা-টগর
চেনে ভুঁই খেসারি মুসুরি
শীত শীত-রাত্রির হুড়া-পোড়া-চক
চেনে বিষ-পিঁপড়া, বোলতা
লাল-কেলো, নীল বিছা, রক্ত চোষক চীনা-জোঁক
চিনি আমি খলশে ট্যাংরা তিতপুঁটি মলা ঢ্যালা শুশুকের বিল
চিনি বগা মাছরাঙা, কাদাখোঁচা চখাচখি দূর আকাশের চিল
চেনে চৈত বর্ষা, উড়া-ধুলা হাঁটু-প্যাক
আকাশের নানারঙা মেঘ
চেনে ভ্যাদা ঢোঁড়া সাপ
বাতিল ডোবার, লাফানো ঝাঁপানো শত ভেক
চিনি আমি গরু আর মহিষের ঢিমে চলা ক্ষরপ্রায়—
জীর্ণ, গাড়ির সারি
চিনি আজো সেসবের নিরীহ সরল সব গাড়োয়ান
আধপেটা অনাহারী
চিনি হাল আমলের নসিমন করিমন—
নীরবতা-হত্যাকারী
চিনি ঠিক সেসবের, ডেকরা গোঁয়ার কাঁচা ড্রাইভার
অবিরত-খিস্তিকারী
চিনি আমি ভিটেহারা ভূমিহারা নিঃস্ব, কত না রুগ্ন কৃষক
চিনি হায় তেমনি মনমরা পূজারী, ভিক্ষু, সহজিয়া দেহাতি সাধক
চিনি শঠ আড়ত-মালিক, কৌশলী পোদ্দার—
ফসল-ফড়িয়া বর্বর
চেনে ঠিক অনুভব ধড়িবাজ মেম্বর, চিকন ঘিলুর নানা গ্রাম্য ইতর
চেনে এই দুই পা, কুহকী পথের হাঁ, অপরূপ মাঘের শিশির
চেনে এক ভাবুক কিশোর—
নিশীথের টোল–ঘর
কুপি-জ্বলা গুদারা ঘাটের হেঁয়ালি নিবিড়
চেনে এই দেহ-ঘ্রাণ রাত-জাগা লাথি-খাওয়া হেলিত—
সদরের প্রতীত কুকুর
চেনে এই পায়ের বাজান সদরের সরু সরু ছায়াপথ
নিশুতির হুতুম বাদুড়
চিনি আমি ঠিকঠাক হাট থেকে ফিরে চলা—
টর্চ লাইট হাতে ধরা মানুষের—
সাইকেল সারি
চিনে নাক
চিনে কান
চিনে এই আদ্যজ্ঞান
ঝিঁঝিঁ-ডাকা রাত-পথ, আগুন ও ধোঁয়া আহা পাতার-বিড়ির
কলিমহর চেনে আমাকে
চেনে তার পচা-ডোবা কুয়োতলা গুড়-খোলা কুসরের ক্ষেত
চেনে তার ভূতভূত-বাঁশঝাড়
শ্যালা-পড়া ডাকঘর
নদীধার
বাঁশের মাচান, জ্যোৎস্না-সমেত
চেনে ওই মাছপারা খোকসা পাংশা, জানিপুর গঞ্জের ঠাট
চেনে ওই দুধসর বেনিপুর পানটির ফুটবল কাবাডির মাঠ
চেনে ঝানু এই চোখ—
ভাজাগজা নইটানা বাতাসার—
ঝোলাগুড়-জিলাপির—
কত কত পাকা কারিগর
চেনে আহা এই জিভ—
বনগাঁর নাড়ু মোয়া, ভেড়ামারা-তিলেখাজা—
রামদিয়া-মুড়কি-মটকা—
কুমারখালির দই-সর
চেনে বেদে সাধুহাটি
ষোড়শীর জানালা, ইশারা, ম্লান-হাসি, শঙ্খ দেহের মায়াডোর
চেনে তার পলিমাটি—
শ্যামলিমা হৃদয়ের, রঙধনু দোহদের, নকশিকাঁথার কারূঘোর
চেনে ঢালু নাও ঘাট
ভাঙা নাও
মৃধা মাঝি, গড়াইয়ের বিষণ্ণ প্রসন্ন জল
চেনে এই স্মৃতির চরণ—
কুমারখালির রেল, বাল্যের জংশন-পাটাতন
আর ভবে ছিলাম কিনা জানিনা
এই ভবে
এই বেদে ষোল আনা নগরের কই…