বুধবার, আগস্ট ১২, ২০২৬

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে উদীচীর নির্ধারিত কর্মসূচির ভেন্যু বাতিলের প্রতিবাদ

  • মঞ্জুর মোর্শদ মিল্টন
  • ২০২৬-০৭-৩০ ১৪:৩১:৩৭

উদীচী আয়োজিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বার্ষিকী উপলক্ষে পূর্বানুমোদিত সাংস্কৃতিক সমাবেশের অনুমতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ  বাতিল করেছে। উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন আজ এক যুক্ত বিবৃতিতে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান এবং পূর্বাপর ঘটনাবলী সম্পর্কে উদীচীর বক্তব্য তুলে ধরেন। নেতৃবৃন্দ বলেন:
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয়  বার্ষিকী উদযাপনের লক্ষ্যে  উদীচী ৩১ জুলাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ব্যবহারের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর আবেদন করে গত ২২ জুন । পরদিন, ২৩ জুন প্রক্টর অফিস থেকে উদীচীকে জানানো হয় যে আবেদনটি অনুমোদিত হয়েছে। পরবর্তীতে দীর্ঘ একমাস পর ২৩ জুলাই উদীচী আনুষ্ঠানিক অনুমতিপত্রটি সংগ্রহ করে। ওই সময় পর্যন্ত একই তারিখে অন্য কোনো সংগঠনের আবেদন বা অনুমোদনের বিষয়ে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিস থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, সোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর কিংবা ক্যাম্পাসের অন্য কোনো ভেন্যু ব্যবহারের অনুমতি নেওয়ার অভিজ্ঞতা যাদের রয়েছে, তাঁরা জানেন বুকিং তালিকা যাচাই না করে প্রক্টর অফিস কখনোই কোনো ভেন্যু বরাদ্দ দেয় না। সাধারণত এক বা দুই দিন সময় নিয়ে আবেদন যাচাই বাছাই শেষে, সংশ্লিষ্ট ভেন্যু খালি থাকা সাপেক্ষেই অনুমোদন প্রদান করা হয়। ফলে অনুমোদন সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় প্রক্টর অফিসের কথিত ‘ভুল’এর যে ব্যাখ্যা  তুলে ধরা হয়েছে, তা যেমন যুক্তিগতভাবে দুর্বল, তেমনি নিজেদের দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টাও বটে।
উদীচীকে দেয়া অনুমতি বাতিল করে গণ সংহতি আন্দোলনকে অনুমতি দেয়ার ব্যাপারটি অন্যায্য এবং অযৌক্তিক।
গণতান্ত্রিক সংগ্রামে মত ও পথের কিছু পার্থক্য থাকলেও প্রায় অভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্যে দীর্ঘ পথচলায় উদীচ গণসংহতি আন্দোলনসহ অনেক সংগঠনকে সহযোদ্ধা হিসেবেই বিবেচনা করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ, গণসংহতির বিবৃতি এবং পুরো ঘটনার প্রতি তাদের সহানুভূতিহীন প্রবণতা হতাশাজনক।  
গণসংহতি আন্দোলন বলেছে, তারা ৩ জুলাই ৩১ জুলাইয়ের কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু তারা কবে আনুষ্ঠানিকভাবে ভেন্যুর আবেদন করেছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি। আমাদের ধারণা, আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়ার আগেই তারা কর্মসূচির প্রচার শুরু করেছিল। অন্যথায়, ৩ জুলাই কিংবা তার পরপরই প্রক্টর অফিসে যোগাযোগ করলে তারা সহজেই জানতে পারত যে ওই তারিখে শহীদ মিনার ইতোমধ্যে উদীচীর জন্য বরাদ্দ রয়েছে। যদি সে সময়ই তারা উদীচীর সঙ্গে যোগাযোগ করত, তবে পরিস্থিতি বিবেচনা করে উদীচী পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে কর্মসূচির স্থান বা সময় পুনর্বিবেচনা করতে পারত। সেই রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক উদারতা উদীচীর রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে গণসংহতির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে  ২৮ জুলাই বিকেল তিনটার দিকে। আর সেদিনই সন্ধ্যা সাতটার দিকে প্রক্টর অফিস হঠাৎ করে ৩১ জুলাইয়ের জন্য উদীচীর বরাদ্দ বাতিলের নোটিশ জারি করে।
প্রশ্ন হলো, হঠাৎ কেন এই সিদ্ধান্ত?
প্রক্টর অফিস তাদের নোটিশে জানিয়েছে, ‘অনিবার্য কারণে’ ভেন্যুর বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে এবং ‘খালি থাকা সাপেক্ষে’ উদীচীকে ক্যাম্পাসের অন্য কোনো স্থানে কর্মসূচি আয়োজনের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
আমাদের প্রশ্ন, ‘খালি থাকা সাপেক্ষে ক্যাম্পাসের অন্য কোন স্থানে কর্মসূচি আয়োজনের অনুমতি দেয়া যেতে পারে’এই নীতিটি কি শুধু উদীচীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য? গণসংহতি যখন একই ভেন্যুর জন্য আবেদন করল, তখন কি প্রক্টর অফিস দেখেনি যে সেটি এক মাস আগেই অন্য একটি সংগঠনের জন্য বরাদ্দ হয়ে গেছে?
যে সংগঠন এক মাসেরও বেশি আগে বৈধভাবে অনুমোদন পেয়েছে, তাদের বরাদ্দ বাতিল করে কয়েক দিন আগে আবেদনকারী আরেকটি সংগঠনকে একই ভেন্যু বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনায় কি কোনো ক্ষমতার প্রভাব কাজ করেনি?
নিশ্চয়ই প্রক্টর অফিসের প্রশাসনিক দায় রয়েছে। তারা প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই ভেন্যু বরাদ্দ বাতিল করার এখতিয়ার রাখে।  যদি ‘অনিবার্য কারণ’এর জন্য উদীচীর কর্মসূচি বাতিল করা হয়ে থাকে, তবে সেই একই ভেন্যুতে কীভাবে গণ সংহতি আন্দোলনকে অনুমতি দেওয়া হলো? যদি ভেন্যুটি প্রশাসনিক বা সরকারি প্রয়োজনে ব্যবহৃত হতো, কিংবা খালি রাখা হতো, তবে ‘অনিবার্য কারণ’এর যুক্তি অন্তত কিছুটা গ্রহণযোগ্য হতে পারত। কিন্তু বাতিল হওয়া সেই একই স্থানে অন্য একটি সংগঠনের কর্মসূচির অনুমোদন পাওয়া প্রমাণ করে যে ‘অনিবার্য কারণ’এর আড়ালে ক্ষমতার প্রভাবই কার্যকর হয়েছে।
ক্ষমতার এই চর্চা শুধু প্রশাসনিক অন্যায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি সহযোদ্ধা, মিত্র ও সমমুখী সংগ্রামের শক্তিগুলোর প্রতিও ন্যূনতম সহমর্মিতা ও দায়বোধকে অস্বীকার করে। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আমরা গণসংহতি আন্দোলনের আচরণে সেই বাস্তবতাই প্রত্যক্ষ করলাম।
গতকাল সারাদিন চেষ্টা করেও আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারিনি। তিনি আমাদের সাক্ষাৎ এড়িয়ে যান। পরে সহকারী প্রক্টরের সঙ্গে আলোচনায় জানা যায়, উদীচীকে অনুমোদন দেওয়ার পর বুকিং তালিকা পুনরায় যাচাই না করেই ভুলবশত গণসংহতিকেও একই ভেন্যুর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এটি নিঃসন্দেহে একটি অপ্রত্যাশিত ও গুরুতর প্রশাসনিক ভুল। কিন্তু ভুলটি যখন ধরা পড়ল, তখন ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত হতো-যে সংগঠন আগে বৈধভাবে অনুমতি পেয়েছে, তার অনুমোদন বহাল রাখা। পরিবর্তে প্রক্টর মহোদয় উদীচীর অনুমোদনই বাতিল করেছেন। ফলে এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা উপেক্ষা করা হয়েছে এবং ক্ষমতার প্রভাবই অধিক কার্যকর ছিল বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই অন্যায্য, বৈষম্যমূলক ও নীতিবহির্ভূত সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। ভেন্যু বরাদ্দের ক্ষেত্রে অন্যায্যভাবে ক্ষমতা বলয়ের যে প্রভাব বিস্তারের চর্চা শুরু হয়েছে তার ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষে আগামীতে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আমরা শংকা প্রকাশ করছি।
জুলাই মাস সেইসব শহীদের আত্মত্যাগের স্মারক, যাঁরা বৈষম্যহীন সমাজ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। সেই মাসেই এমন একটি বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত তাদের আত্মত্যাগের চেতনাকেই অবমাননা করে।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিবাদস্বরূপ আমরা ৩১ জুলাইয়ের পূর্বঘোষিত সাংস্কৃতিক সমাবেশ স্থগিত করতে বাধ্য হচ্ছি।
আগামী ৫ আগস্ট বিকেল ৫টায় উদীচী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বার্ষিকী পালন করা হবে। সকল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ, সংস্কৃতিকর্মী ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে আমাদের এই আয়োজনে সংহতি জানিয়ে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাই।
 

 


এ জাতীয় আরো খবর