রবিবার, মে ১৭, ২০২৬

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ প্রচারে সরকারের ভূমিকা: আদৌ কী যুক্তিসঙ্গত?

  • এম এ আলীম সরকার
  • ২০২৬-০১-৩১ ১৯:১৯:৫৪

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে তিনবার গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে, তা যথাক্রমে জেনারেল জিয়াউর রহমানের সময়ে ১৯৭৭ সালে ৩০ সেপ্টেম্বর, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময়ে ১৯৮৫ সালে ২১ মার্চ ও বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে  ১৯৯১ সালে ১৫ সেপ্টেম্বরে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। 
ছাত্রজনতার গণ-অভ্যুত্থানের ৫ আগস্টে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুস সংস্কার কমিশন গঠন করেন। সংস্কার কমিশন রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য গণভোটের প্রস্তাব দেন। রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ৮৪টি প্রস্তাবের ওপর গণভোটের জন্য ২৫টি রাজনৈতিক দল  মতভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টা জাতীয় সংসদ ও গণভোট ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ঘোষণা দেন। পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশেই প্রথম এরকম একটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে, গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন একসাথে। ইতিপূর্বে তিনবার গণভোট হয়েছে, প্রত্যেক গণভোটে  একটি প্রশ্নের ওপর জনগণ 'হ্যা' অথবা 'না' ভোট দিয়েছে। কিন্তু এবারের গণভোট ব্যতিক্রম, যা ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব চারটি সংক্ষিপ্ত বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত করে ব্যালটে উল্লেখ থাকবে, একটি সরাসরি প্রশ্নের উত্তরে ভোটারদের 'হ্যা' অথবা 'না' ভোট দিতে হবে। ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে  ৪৭টি সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং অবশিষ্ট ৩৭টি সাধারণ আইন, অধ্যাদেশ কিংবা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। তবে এসব সংস্কার প্রস্তাবের সবগুলো নিয়ে বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল বিভিন্ন প্রস্তাবে ভিন্নমত জানিয়েছে। প্রথমে শুরুতে একটি প্রস্তাব ছিল, যে সব প্রস্তাবে কোনো দল ভিন্নমত দিবে, তারা ক্ষমতায় গেলে সে সব সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না। কিন্তু এ বিষয়ে সমাধানে পৌঁছাতে না পারায় সরকার শেষ পর্যন্ত গণভোটের পথ বেছে নেয়। গণভোটে 'হ্যা' জয়ী হলে আগামী সংসদ ৮৪টি সংস্কার বাস্তবায়নে সাংবিধানিকভাবে বাধ্য থাকবে। আর 'না' জয়ী হলে জুলাই সনদ কার্যকর হবে না। চারটি বিষয়ের ওপর মতামত চাওয়া হবে। যে চারটি বিষয়ের ওপর গণভোট হবে, যা দেশের ৯০ ভাগ লোক গণভোটের বিষয়  সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই নেই। তারা কীভাবে গণভোটে 'হ্যা' অথবা 'না' ভোট দিবে। জনগণের একটি প্রশ্ন?, ভোটারদের চারটি বিষয়ের মধ্যে দুটি  সম্মতি আছে আর দুটির নেই, সেক্ষেত্রে ভোটাররা 'হ্যা' অথবা 'না' কোথায় ভোট দিবে। একজন ভোটারের চারটি বিষয়ের ওপর মত নাও থাকতে পারে। এটা একটা গোঁজামিলের নির্বাচন। সাম্প্রতিক সময়ে চারটি বিষয়ের ওপর গণভোটের যে বিধান রাখা হয়েছে, একে গণভোট বলা যায় না। গণভোট হয় একটি প্রশ্নের ওপর 'হ্যাঁ' অথবা 'না'। কিন্তু একের অধিক প্রশ্নের ওপর 'হ্যাঁ' অথবা 'না' ভোট দেওয়া্ যায় না। শুধু তাই নয়, পৃথিবীর ইতিহাসেও কোনো দেশে এরকম গণভোট অনুষ্ঠিত হয়নি। আমাদের দেশে প্রকৃত রাজনীতি ও নেতৃত্বের শূন্যতার কারণে এরকম একটি গণভোটের মতো জবরদস্তি পাথর জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। জনগণের কল্যানে জনগণের রাজনীতি না থাকার কারণে দেশে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এর জন্য দায়ী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সময় গত তিনটি জাতীয় সংসদ ভোটারবিহীন  নির্বাচন হয়েছে, জনগণের তেমন কোনো উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল না বলেই চলে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ ও গণভোট একইদিনে অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য জনগণের উৎসাহ ও উদ্দীপনা অনেক বেশি হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কেন যেন, জনগণের উৎসাহ উদ্দীপনা তেমন দেখা যাচ্ছে না। এবং ভোটার প্রার্থীরাও নিজের ভোটের প্রচারণার চেয়ে গণভোটের 'হ্যা' এর পক্ষে  প্রচার চালাচ্ছে বেশি। একমাত্র জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের 'না' এর পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান করেছে। দেশের রাজনীতির দুর্সময়ের ক্রান্তিলগ্নে জিএম কাদের  সৎসাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তাগণ গণভোটের 'হ্যা' এর পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য যেভাবে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে, তা স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান- মেম্বার নির্বাচনের মতো। গণভোটের 'হ্যাঁ' প্রচারে সরকারের ভুমিকা জনসাধারণের নিকট প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে মনে হয়। 
গণভোট গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। সংবিধান রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো বা দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার একটি স্বীকৃত পদ্ধতি হলো গণভোট। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ যেকোনো একটির পক্ষে সরকারের এই সক্রিয় প্রচার আদৌ কতটা যুক্তিসঙ্গত? সংবিধান পরিপন্থী কি না, সেটা সরকারের ভেবে দেখা উচিত।
গণভোটের বিষয়ে গণভোটে ’হ্যা’ অথবা 'না" এর পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য প্রজাতন্ত্রে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি জনগণকে আহ্বান করলে, গণভোটের ফলাফল প্রভাবিত হতে পারে, জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে না এবং ভোটও নিরপেক্ষ হবে না। গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এর অনুচ্ছেদ ৮৬ অনুযায়ী ' হ্যা' বা 'না' এর পক্ষে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাগণ প্রচার চালালে, এটি দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। 
গণভোটের ২১ ধারায় বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান মোতাবেক যেসব কার্য অপরাধ ও নির্বাচন আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে, এবং একই ধরনের কার্য গণভোটের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার গণভোটের 'হ্যা' এর পক্ষে প্রচার চালিয়ে গণভোটের নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলেছে। দেশে  আইন আছে কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই। আমরা কেউই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নই।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রজাতন্ত্রে নিয়োজিত কর্মকর্তাগণ সংবিধান পরিপন্থী গণভোটে 'হ্যা' এর পক্ষে যেভাবে প্রচার চালিয়েছে, সেক্ষেত্রে আইনের দৃষ্টিতে এদের কী হবে ? 
গণতান্ত্রিক তত্ত্ব অনুযায়ী সরকার জনগণের প্রতিনিধি। সে কারণে জনগণ জানতে চায়, এই গণভোটের প্রয়োজন কেন এবং গণভোটে 'হ্যাঁ'  অথবা 'না' জয়ী হলে  রাষ্ট্র কোন পথে যাবে সে বিষয়ে সরকার তথ্য ও ব্যাখ্যা প্রচার করার অধিকার ও দায়িত্ব সরকারের রয়েছে। অনেক দেশে, যেমন যুক্তরাজ্য বা কানাডায়, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের অবস্থান জানায়। কিন্তু সেখানে স্পষ্টভাবে একটি নীতিগত সীমারেখা মানা হয়, তাঁরা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করে একতরফা প্রচার করে না বরং তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রচার করে। যখন সরকার  রাষ্ট্রীয় অর্থ, প্রশাসন ও সরকারি গণমাধ্যম যদি একটি নির্দিষ্ট মতের পক্ষে ব্যবহৃত হয়, তাহলে গণভোট আর স্বাধীন থাকে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার প্রশ্নে ব্রেক্সিট গণভোটে দেখা গেছে, সরকারি প্রচারের সীমা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছে , একপর্যায়ে আদালতের হস্তক্ষেপও হয়েছে। বাংলাদেশেও গণভোটে সরকারের 'হ্যা' ভোটে প্রচারের ভূমিকা জনগণের কাছে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে। 
গণভোটের প্রধান শর্ত হলো, ভোটার যেন ভয় বা প্রভাব ছাড়া সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু সরকার যখন প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বান জানায় এবং ভিন্নমতকে অযৌক্তিক বা রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করে, তখন সাধারণ মানুষের স্বাধীন মত প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তবে সরকারের সম্পূর্ণ নীরবতা কাম্য নয়। জনগণকে স্বাধীনভাবে গণভোটে 'হ্যা' অথবা 'না' মত দেওয়ার জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। 

লেখকঃ প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সভাপতি, বাংলাদেশ গণমুক্তি
 পার্টি (বিজিপি)।


এ জাতীয় আরো খবর