শাহানা বেগম নীলাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'এই বিয়েতে কী তোর মত নেই?'
নীলা বিছানা থেকে উঠে বসলো। বললো,'না মা। সেরকম কিছু নয়। অযথা ভাবছো কেন?'
'তোর কী পছন্দের কেউ আছে? থাকলে আমাকে বলতে পারিস।'
নীলা মা'র চোখের দিকে অবাক হয়ে তাকালো, 'কেউ থাকলে আমি কী তোমাকে বলতাম না মা? আশ্চর্য!'
'তাহলে তুই এতো চুপচাপ কেন? মারুফকে ধমকেছিস কেন?'
'এমনি।'
'ঠিক আছে। নাস্তা খাবি, চল!'
'ভাললাগছে না মা। এ ঘরে পাঠিয়ে দাও।'
'শাহানা বেগম মেয়ের মুখের দিকে নিস্পলক তাকিয়ে রইলেন। আর নীলা মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইল। তারপর শাহানা বেগম বুয়াকে ডাকলেন,
'রমজানের মা!'
'জী আম্মা!'
'নীলার নাস্তা এ ঘরে নিয়ে আয় তো।'
'আনতাছি আম্মা।'
রমজানের মা বিছানার উপর নাস্তা রেখে চলে গেল।
শাহানা বেগম রুটির এক অংশ ছিঁড়ে ওতে ভাজি মিশিয়ে মেয়ের মুখে তুলে ধরলেন। বললেন, 'হা কর।' কিন্তু নীলা তাতে সাড়া দিলো না। চুপ করেই বসে রইল।
'কিরে! খাবি না?'
'রেখে দাও মা। পরে খাব।'
'এ কথা বললে তো চলবে না!' বলে শাহানা বেগম ভাজি মেশানো রুটির টুকরোটা জোর করেই নীলার মুখে পুরে দিলেন। নীলা রুটির টুকরো মুখে নিলো ঠিকই কিন্তু সাথে সাথে ওর চক্ষু যুগল অশ্রুসজল হয়ে উঠলো। রুটির টুকরো চিবিয়ে গিলতে ওর খুব কষ্ট হলো। এভাবে কয়েক বার খাওয়ার পর পানি খেল নীলা। তারপর বললো, 'আর খাবো না মা।'
ছোট মারুফ শুধু ফ্যালফেলিয়ে সবকিছু দেখলো কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। ওর চোখে মুখে শুধু বিস্ময়, 'আজ নীলাপুর কী হলো? এমন করছে কেন নীলাপু?'
মা উঠে চলে গেলেন। ছোট মারুফও মা'র পিছু পিছু চলে গেল। যাবার আগে মা বলে গেলেন, 'দ্যাখ নীলা! একটু পরে গোসল সেরে ফ্রেস হয়ে নিবি। ছেলেপক্ষ তোকে দেখতে আসছে। মেহমানদের কাছে তোর বাবাকে ছোট করে দিসনে। কোন ছেলেমানুষী করা চলবে না।'
নীলা সে কথায় কর্ণপাত না করে জানালার পাশে গিয়ে বসলো। পাঁচ তলার উপর এ ঘর থেকে বাইরের দৃশ্য পরিস্কার দেখা যায়। নীলা জানালা দিয়ে উদাসী চোখে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলো।
একটু পরে রিক্সাভ্যানে করে বাবা আর শরীফকে অনেক বাজার-সওদা নিয়ে বাড়ির গেটে নামতে দেখলো নীলা। সাথে ভ্যানচালকসহ আরও একজন লোক আছে। তাঁর বেশভূষা দেখে ওকে মুটে বলে মনে হলো নীলার। বাবা আর শরীফ মিলে ওর মাথার ঝাঁকার উপরে বড় বড় বোঝাগুলো তুলে দিলো। ভাড়া মিটিয়ে শরীফ আর বাবাও কিছু সওদা ব্যাগে ভরে দু'হাতে করে নিয়ে হেঁটে সিঁড়ির দিকে পথ ধরলেন। পিছু পিছু মুটেও হাঁটলো। ভ্যানচালক রিক্সাভ্যানটা ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেলো।
ঠিক দশ মিনিট পরে বাবার গলার হালকা আওয়াজ শুনতে পেল নীলা। আওয়াজটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। কথা বলতে বলতে বাবা সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠে আসছেন। দূর থেকে ওদের পায়ের চটির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে সে। বাবা বলছেন, 'বাজারে দ্রব্যমূল্যের যে অবস্থা! এভাবে চললে এদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণী বলে কিছু থাকবে না। অচিরেই বিলীন হয়ে যাবে। তখন থাকবে শুধু দুটো শ্রেণী-উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্ত।' পায়ের চটির আওয়াজ আরও স্পষ্ট হতে হতে একসময় এসে থেমে গেল। এখন কেবল গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে নীলা। 'রাখো রাখো! নিচে নামিয়ে রাখো। শরীফ তুই একটু ধর তো। হ্যাঁ হ্যাঁ। ব্যাস ব্যাস। হয়েছে, হয়েছে। থাক। এই নাও তোমার মজুরি। এইডা কী দিলেন স্যার! বিয়া বাড়ির এত্তাডি মাল পাঁচ তলার উফরে টাইন্যা আনতে আমার জানডা বারায়া গেসে। আর একশো টাকা বাড়ায়া দ্যান স্যার। তোমরা তো বলেই খালাস! আমরা বেশিটা পাই কোথা থেকে? ঠিক আছে দিচ্ছি। এই নাও। আর শোন! বিয়ে নয়, ছেলেপক্ষ আজ আমার মেয়েকে দেখতে আসছে, বুঝেছো? না বুঝে মূর্খের মতো কথা বলো না। গর্ধব কোথাকার! অ আইচ্ছা। সেলাম স্যার।'
কলিং বেল বেজে উঠলো। এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলেন শাহানা বেগম। দরজার ওপাশ থেকে সওদাগুলো টেনে টেনে রান্নাঘরে নিয়ে এলো শরীফ আর আরিফ।
'উফ! বাজার করা কী কষ্ট যে শানু! তোমাকে বলে তা ঠিক বোঝাতে পারবো না। এক গ্লাস পানি এনে দাও তো।' বলতে বলতে ড্রয়িং রুমের সোফায় গিয়ে বসলেন চৌধুরী সাহেব। সাহানা বেগম বৈদ্যুতিক পাখাটার সুইচ অন করে দিয়ে তাড়াতাড়ি একগ্লাস ঠান্ডা জল স্বামীকে এনে দিলেন।
চৌধুরী সাহেব বললেন, 'তোমরা সবাই নাস্তা খেয়েছো তো?'
'হ্যাঁ।'
'তাহলে কাটা বাছা শেষ করে জলদি রান্না চড়িয়ে দাও। আর নীলাকে বলে দাও, ও যেন গোসল সেরে সময়মতো শাড়ি আর গহনা পরে সাজুগুজু করে বসে থাকে। আজ শুক্রবার। জুমার নামাজ আছে। নামাজ শেষ করেই মেহমানরা চলে আসবে। দ্যাখো কোথাও যেন ভুল না হয়।'
'সেসব নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। আমি সব ব্যবস্থাই করে রেখেছি।'
এর ঘন্টা দুয়েক পরে জুমার নামাজের আজান হলো। চৌধুরী সাহেব উত্তমরুপে অজু গোসল সেরে নিলেন। তারপর আলমারিতে তুলে রাখা সবচেয়ে ভালো পাজামা পাঞ্জাবী বের করে পরিধান করে তাতে খুশবু লাগিয়ে নিলেন। ছেলেরাও একইভাবে তৈরি হলো। তারপর ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে জুমার নামাজের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন তিনি।
শাহানা বেগম আলমারিতে সযত্নে তুলে রাখা তাঁর বিবাহের গহনা ভর্তি বাক্সটা সাবধানে বের করে আনলেন। শাড়ির আঁচল দিয়ে পরম যত্নে বাক্সটা মুছে নিলেন। তারপর একটু অন্যমনস্ক হয়ে কী যেন ভাবলেন। হয়তো সাতাশ বছর আগের মধুময় সেই দিনের কথা মনে পড়লো তাঁর, যেদিন তাঁরা পবিত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। আর এই গহনাগুলো পড়েই সেদিন নববধূ সেজে বসে ছিলেন তিনি। নীলার বাবার আর্থিক সংকট তখনও ছিল। কিন্তু তারপরও তিনি বিয়েতে তাঁর সাধ্যমত এই গহনাগুলো তাকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। পুরনো দিনের সেই সব স্মৃতিই হয়তো তাঁর হৃদয়কে স্পর্শ করলো।
এবার তিনি তাঁর সবচেয়ে দামী ও পছন্দের শাড়ি, সায়া আর শাড়ির সাথে ম্যাচিং করা ব্লাউজ বের করে আনলেন। তাঁর মনে পড়লো তাঁদের বিবাহের রজত জয়ন্তীতে নীলার বাবা এই দামী শাড়ি, সায়া আর শাড়ির সাথে ম্যাচিং করা ব্লাউজ তাঁকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। সেবার ছেলেমেয়েরা বাবা-মা'র বিবাহের পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বাসায় কেক কেটে মহা আনন্দ উৎসব করেছিল। শাহানা বেগমের আরও মনে পড়লো সেদিন নীলার বাবা চিকমিকে রঙিন কাগজে মোড়ানো একটা বাক্স হাতে করে এনে সারপ্রাইজ দিয়ে বলেছিলেন, 'শানু! জীবনে তোমায় ভালো কিছু তো দিতে পারিনি, আজ খুব ইচ্ছে করলো। তাই তোমার জন্যে এটা নিয়ে এলাম।' সেদিন বাক্সটা খুলে খুব অবাক হয়েছিলেন শাহানা বেগম। এতো সুন্দর শাড়ি! তার তো মনেই ছিলনা আজ তাঁদের বিবাহ বার্ষিকী! একদমই ভুলে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নীলার বাবা ঠিকই মনে রেখেছিলেন। 'কী দরকার ছিল এতো খরচের' মুখে বলেছিলেন ঠিকই কিন্তু মনে মনে খুব খুশীই হয়েছিলেন। সেই দিনের সুখস্মৃতির কথা মনে পড়তেই খুশিতে মনটা ভরে গেলো শাহানা বেগমের।
জিনিসগুলো নিয়ে নীলার ঘরে এলেন তিনি। সেগুলো বিছানার উপর রাখলেন। তারপর বললেন, 'গোসল সেরে এগুলো পরে সাজুগুজু করে ফ্যাল নীলা। ছেলে পক্ষের আসার সময় হয়ে এলো। আমি যাই। আমার হাতে এখন অনেক কাজ।'
কিন্তু নীলা একবারের জন্যও জিনিসগুলোর দিকে ফিরে তাকালো না। গোসলও করলো না। যেভাবে বসে ছিল, ঠিক সেভাবেই বসে রইলো। বিছানার উপর জিনিসগুলো অলস পড়ে রইলো।