বুধবার, জানুয়ারী ১৪, ২০২৬

খাদ্য ভবনের দিনলিপি: মুচকি হাসি আর আত্মমর্যাদার কথা

  • মোঃ ইমন মিজি
  • ২০২৫-১২-০৯ ০৯:৫৪:৩৩

ঘড়িতে তখন আনুমানিক দুটো। দুপুরের নির্জনতা সবেমাত্র কাটতে শুরু করেছে, যখন আমি খাদ্য ভবনের প্রধান ফটকের সামনে এসে দাঁড়ালাম। ভবনটির কাঠামো যতখানি মজবুত, এর ভেতরে ঢোকার নিয়ম-কানুনও ঠিক ততটাই কড়াকড়ি। চেকপোস্টে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক পরিচিত মুখ—আলতাব সাহেব। প্রথম দেখায়ই এক উষ্ণ সালাম বিনিময় হলো।
"আসসালামু আলাইকুম," বললাম আমি।
"ওয়ালাইকুম আসসালাম," আলতাব সাহেব প্রতি-উত্তর দিলেন।
আমার কাজটা ছিল ফাইল সংক্রান্ত, সেটা মিটিয়ে আমি বিকেলে ফেরার পথে আবার সেই গেটেই এলাম। আলতাব সাহেব গেটটা খুলে দিলেন। "যাই তাহলে," একটি সংক্ষিপ্ত বিদায় জানিয়ে আমি বেরিয়ে এলাম।

দ্বিতীয় সাক্ষাৎ ও একটি প্রশ্ন
কয়েকদিন পরের কথা। আবারও সেই খাদ্য ভবনে আমার আসা। এবার চেকপোস্টে আলতাব সাহেব ছাড়াও আরও দুজন দাঁড়িয়ে আছেন। পরিচিত মুখের ভিড়ে আলতাব সাহেবকে দেখে খানিকটা ভরসা পেলাম।
মাঝের জন, যার চোখে-মুখে সামান্য সন্দেহের ছাপ, সরাসরি প্রশ্ন করে বসলেন: "কোথায় যাবেন?"
"এই অফিসের পাঁচ তলায়," শান্তভাবে উত্তর দিলাম।
"কি উদ্দেশ্যে যাবেন?"
"এই ফাইলগুলো নিয়ে যাবো হাকিম স্যারের কাছে।"
এবার আলতাব সাহেব দায়িত্ব নিলেন। সঙ্গী দুজনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "ওই খাতায় নাম লিখে যেতে বলো। কোন স্যারের কাছে যাবে, স্যারের নাম, আপনার ফোন নম্বর, আর আসার সময়। আর শেষে যাওয়ার সময়টাও যেন লিখে দেন।"
নিয়ম মেনে সব লিখলাম এবং পাঁচ তলার দিকে এগিয়ে গেলাম। হাকিম স্যারের কক্ষ। সালাম দিয়ে প্রবেশ করতেই তিনি শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন। "কে পাঠিয়েছে তোমাকে ফাইলগুলো নিয়ে?"
"একরাম স্যার," ছোট্ট করে উত্তর দিলাম।
তিনি ফাইলগুলির দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বললেন, "যাও, থুয়ে যাও। আমি দেখে নেব।"
কাজ শেষ। অল্প সময়ের মধ্যেই লিফট ধরে নিচে নেমে এলাম।

বেতনের প্রশ্ন ও মুচকি হাসি
চেকপোস্টের সামনে আসতেই আলতাব সাহেব সহ সেই দুজন আমাকে ঘিরে ধরলেন। এবার তাদের প্রশ্নগুলো যেন ছিল অনেকটা আমাকে ছোট দেখানোর একটা চেষ্টা।
"বেতন কত পাও? আর কত দেয় তোমাকে?"
প্রশ্নটা শুনে আমার ভেতরটা মুহূর্তে চমকে উঠলো। এটি একান্তই আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার, আর প্রকাশ্য চেকপোস্টে এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করা একেবারেই বেমানান। কিন্তু আমি মুহূর্তের বিরতিতে একটি মুচকি হাসি দিয়ে উত্তর দিলাম।
"কত পাই, এই মুহূর্তে এই প্রশ্ন করা আপনাদের বেমানান। যা পাই, এতে আমার চলে যায়। হাজার দশেক... ধরুন!"—আমি খানিকটা বাড়িয়ে বললাম, তবে সুরটা রাখলাম একদম দৃঢ়।
"বেশি পেলেও আপনারা তো কোন নেবেন না, আবার কম পেলেও আপনারা আমাকে দিবেন না। তাহলে বুঝতে পারছেন তো? খামাখা সময় অযথা নষ্ট করেন কেন?"
আমি তাদের চোখে চোখ রেখে বললাম, "যা দেয়, এতে চলে যায়, আলহামদুলিল্লাহ। সামনে এর থেকে আরও ভালো কিছু হবে, নিজের প্রতি দীর্ঘ বিশ্বাস রাখতে হবে। আপনারাও কিন্তু একবারে এরকম হন নাই, ধীরে ধীরেই আজকের অবস্থানে এসেছেন। আমারও এক সময় ভালো কিছু হবে, এই ধীরে ধীরেই।"

বকশিশের দাবি ও বিদায়
আমার আত্মবিশ্বাসী উত্তর শুনে তারা কিছুটা অপ্রস্তুত হলেন বটে, কিন্তু এবার তাদের মুখ থেকে অপ্রত্যাশিত একটা কথা বেরিয়ে এলো: "আমাদের বকশিশ দিবেন না?"
আমি আবার প্রশ্ন করলাম: "আমাকে তো আপনাদের এখানে চেকপোস্টে টাকা দেওয়ার জন্য বাড়তি টাকা দেয় না! আগে কোন সময় শুনি নাই, এখনই শুনলাম আপনাদের কাছ থেকে। হ্যাঁ, অবশ্য, খুশি হয়ে মন থেকে দেন। এখন হয় নাই, পরে হবে। সময় তো আর চলে যায় নাই।"
তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে একটু থেমে বললাম, "এই কর্মের মাঝেই আছে, বুঝছেন আপনারা? আপনার স্যারকে বলবেন, ওখানে চেকপোস্টে যারা দায়িত্ব পালন করেন, তারা বকশিশ খোঁজেন।" এই কথা বলে আমি হেসে উড়িয়ে দিলাম। এই হাসিটা ছিল তাদের দাবিকে হালকা করে দেওয়ার এবং নিজের অবস্থান ধরে রাখার হাসি।
তারা হাসির প্রত্যুত্তরে বললেন, "যান, ভালো থাকবেন।"
একজন আবার জিজ্ঞেস করলেন: "ওর সাথে, কোথায় থেকে আসছেন আপনি?"
আমি অবাক হয়ে বললাম, "প্রথম দেখাতে বললেন না কোথায় থেকে আসলাম? শেষেই এসে বললেন? তাহলে আর কি না বলে যাওয়া যায়?"
তাদের কৌতূহল মেটাতে শেষমেশ বললাম, "তাহলে শুনুন। আগারগাঁও থেকে এসেছি।"
"আপনারাও ভালো থাকেন," বলে আমি দ্রুত পা চালিয়ে খাদ্য ভবন থেকে বেরিয়ে এলাম। পেছনে রেখে গেলাম আমার মুচকি হাসি, আত্মমর্যাদার কথা এবং চেকপোস্টের সেই কৌতূহলী ও দাবিদার মুখগুলোকে। আমি জানি, যেকোনো বড় ভবনের গেট কেবল শারীরিক প্রবেশপথ নয়, এটি আত্মমর্যাদা এবং বিশ্বাসের প্রবেশপথও বটে।

শ্যামকুড়, মহেশপুর ঝিনাইদাহ 


এ জাতীয় আরো খবর