আওয়ামী লীগকে আদৌ রাজনৈতিক দল বলা যায় কি না-এই প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে লন্ডনের খ্যাতনামা গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউজ-এ আয়োজিত এক নীতিনির্ধারক সংলাপে তিনি এ মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “যদি একটি দল তরুণদের গুলি করে হত্যা করে, মানুষ গুম করে, রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ করে, তাহলে সেটিকে এখনো রাজনৈতিক দল হিসেবে গণ্য করা যায় কি না-এই প্রশ্ন সমাজে উঠেছে। এটি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়, কিন্তু আলোচনার বিষয় বটে।”
ড. ইউনূসের এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয় যে, অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক চরিত্র ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার ফলাফলের আগ পর্যন্ত দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।
সংলাপের সঞ্চালক ড. ইউনূসকে জিজ্ঞাসা করেন-জুলাই চার্টারের আলোকে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক বিন্যাস গড়ে উঠছে, তাতে বিরোধী দলগুলোর, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের জন্য কি কোনো জায়গা রাখা হয়েছে? সমালোচকরা যেটিকে ‘গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন’ বলছেন, তার জবাবে ড. ইউনূস বলেন:
“অভ্যুত্থানের পর একটি জনমতের প্রতিফলন ঘটেছে। মানুষ রাস্তায় নেমে বলেছে-আমরা মুক্তি চাই। তারা ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশত্যাগকে মুক্তির প্রতীক হিসেবে দেখেছে। আমরা ধরে নিয়েছিলাম, সেদিনই একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। কিন্তু পালিয়ে যাওয়া নেতারা এখনও দেশের অভ্যন্তরে অস্থিরতা ছড়াচ্ছেন। তারা গোপনে উসকানি দিয়ে যাচ্ছে, অথচ কোনো অনুশোচনা নেই।”
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, “আমরা দলকে নিষিদ্ধ করিনি। আমরা বলেছি, বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। বিচার হচ্ছে সেই সব ব্যক্তির, যারা হত্যা, অর্থ আত্মসাৎ বা সহিংসতার মতো অপরাধে অভিযুক্ত। দেশের রাজনীতি ও জনগণের নিরাপত্তা বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “এখন কেউ যদি বলে, এই বিচার নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব হওয়া উচিত, তাহলে আমি বলব-তারা আমাদের দায়িত্ব দেওয়ার সময় এটাই বলেছেন: বিচার, সংস্কার, নির্বাচন-এই তিনটি দায়িত্বই আমাদের পালন করতে হবে।”
এ বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার একটি আইন সংশোধনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের বিচারিক প্রক্রিয়াকে সাংগঠনিক কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসে। তার ফলে দলটির কার্যক্রম বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকে।
আলোচনার একপর্যায়ে ড. ইউনূস বলেন, “আমরা কোনো প্রতিহিংসার রাজনীতি করছি না। বরং আমরা চাই, অপরাধীরা বিচারের মুখোমুখি হোক। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আমরা এই প্রক্রিয়াকে দেখছি।”
ড. ইউনূসের বক্তব্য নিয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে তার “আওয়ামী লীগ কি আদৌ রাজনৈতিক দল?”-এই প্রশ্ন রাজনৈতিক শিবিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
বিরোধীরা বলছে, এটি একটি ন্যায়বিচারমূলক প্রয়াস, যেখানে অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির মুখোমুখি করা হচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা বলছেন, এটি একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনীতি এবং তা ভবিষ্যতের গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
ড. ইউনূস বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নয়, বরং এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সহিংসতা, দুর্নীতি ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতি থাকবে না। বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন একটি নতুন ভিত্তি।”
তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকার এ পর্যন্ত তিনটি লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে:
১. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা,
২. রাজনৈতিক সংস্কার,
৩. সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন।