শনিবার, মে ৩০, ২০২৬

জাতীয় ঐকমত্যের পথে আরেক ধাপ এগিয়ে: “জুলাই সনদ আমাদের গর্বের দলিল হবে”-প্রধান উপদেষ্টা

  • বিশেষ প্রতিনিধি
  • ২০২৫-০৬-০২ ২২:৪৬:৫৭
ছবি সংগৃহিত

ঢাকা-২ জুন ২০২৫
রাজনীতিতে বিভাজন নয়, বরং জাতীয় ঐক্যের অনন্য দৃষ্টান্ত গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, “আমরা তো রাজনীতির বিভক্তিকরণে বিশ্বাস করি না, বরং ঐক্য গড়তে চেয়েছি। আর সেই ঐক্যই ফুটে উঠবে আসন্ন ‘জুলাই সনদ’-এ, যা জাতির জন্য গর্বের এক দলিল হয়ে থাকবে।”
সোমবার (২ জুন) সন্ধ্যায় রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে আয়োজিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় পর্বের সর্বদলীয় বৈঠকের সূচনায় এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ও বর্তমান প্রশাসনের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস।
ড. ইউনূস বলেন, “দ্বিতীয় দফা সংলাপে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে-আগের দফার দূরত্ব যেটুকু ছিল,তা ঘুচিয়ে এমন একটি সমন্বিত ঐকমত্য তৈরি করা, যা সত্যিকার অর্থে জাতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে সামনে এগিয়ে নিতে পারবে। ‘জুলাই সনদ’-এর খসড়া ইতোমধ্যেই অনেক রাজনৈতিক দল সম্মত হয়েছে, এবার সেটিকে আরও সমৃদ্ধ করতে চাই।”
তিনি আরও বলেন, “এই সনদে যেন রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতিতে দেশের ভবিষ্যৎ শাসন কাঠামোর দিকনির্দেশনা, নির্বাচন কমিশনের সংস্কার, প্রশাসনিক ভারসাম্য ও নাগরিক অধিকারের বিষয়গুলো ফুটে ওঠে। যেন এটি দেখে মানুষ বলতে পারে-এই দেশ একসাথে এগোতে চায়।”
জাতীয় সংলাপে দলগুলোর অংশগ্রহণ ও মনোযোগ দেখে অভিভূত বলেও উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, “আমি সত্যিই আশ্চর্য হয়েছি, রাজনৈতিক নেতারা কতটা গভীরভাবে আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। শুরুতে ভেবেছিলাম কেউ পাশ কাটিয়ে যাবে। কিন্তু বরং প্রত্যেকেই অত্যন্ত মনোযোগী। এটি আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি অনেক মিটিং করি প্রতিদিন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই এই বৈঠকে, যেখানে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সত্যিকার আলোচনা হচ্ছে।”
প্রধান উপদেষ্টা জানান, শুরুর দিকে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করা বেশ জটিল মনে হয়েছিল। কিন্তু দ্রুতই একটি সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি করে ১২টি কমিশন গঠন করা হয়, যারা ৯০ দিনের মধ্যে সুপারিশ জমা দিয়েছে। “এবার সেই সুপারিশের ভিত্তিতে আমরা ঐকমত্য গঠনের পর্যায়ে পৌঁছেছি।”
এইসব কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই এখন “জুলাই সনদ” তৈরির প্রস্তুতি চলছে। ড. ইউনূস বলেন, “এই ঐকমত্যের ভিত্তিতে আমরা চাই একটি সমন্বিত জাতীয় রূপরেখা-যা আগামী দিনের শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।”
সংলাপের দ্বিতীয় পর্ব নিয়ে আশাবাদ জানিয়ে ইউনূস বলেন, “অনেক বিষয়ে আমরা কাছাকাছি এসেছি। আরেকটু আলোচনা করলেই সম্পূর্ণ ঐকমত্য গড়ে উঠবে। আমরা চাই না এই বিরল সুযোগ হাতছাড়া হোক।”
তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “আপনারা যেভাবে সহযোগিতা করেছেন, তা অভাবনীয়। এত আগ্রহ নিয়ে সবাই একত্রে বসছেন-এটা সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের ইঙ্গিত।”
ড. ইউনূসের বক্তৃতা শুধু একটি সংলাপের সূচনা নয়, বরং রাজনৈতিক উত্তরণ ও ঐক্যের একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। একটি সময় ছিল যখন রাজনৈতিক সমঝোতা ছিল অনুপস্থিত, আজ সেখানে চলছে পরস্পর সম্মত সংলাপ-যা একটি বহুদলীয় গণতন্ত্রের শক্ত ভিত্তি রচনা করতে পারে।
“আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি, তবে একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক এবং অংশগ্রহণমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব,” বলেও মন্তব্য করেন ড. ইউনূস।
একটি ঐতিহাসিক পর্বের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। “জুলাই সনদ” যদি সফলভাবে গৃহীত হয়, তবে তা হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক পরমতসহিষ্ণুতা ও গণতান্ত্রিক সংলাপের নতুন মাইলফলক। আর তার জন্য প্রয়োজন-সবার আন্তরিকতা, শ্রদ্ধাবোধ এবং দেশপ্রেম।
সুতরাং, রাজনৈতিক মতপার্থক্য পেরিয়ে একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে সামনে এগোনোর এখনই সময়। 'জুলাই সনদ' শুধু একটি দলিল নয়, এটি হতে পারে জাতির নতুন আত্মপরিচয়ের ভিত্তি।

 


এ জাতীয় আরো খবর