উরুগুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট, বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা বামপন্থি নেতা হোসে ‘পেপে’ মুজিকা ৮৯ বছর বয়সে মারা গেছেন। দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে ২০২৫ সালের ১৩ মে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই নেতা। তার মৃত্যুতে শুধু লাতিন আমেরিকা নয়, শোকস্তব্ধ পুরো বিশ্ব।
মুজিকা ছিলেন ব্যতিক্রমী এক রাজনীতিক। প্রেসিডেন্ট পদে থেকেও তিনি বাস করতেন শহরতলির নিজ খামারে, চালাতেন পুরনো ভক্সওয়াগন বিটল-তাকে বলা হতো ‘বিশ্বের সবচেয়ে গরিব প্রেসিডেন্ট’। কিন্তু আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে ছিলেন অদম্য।
তরুণ বয়সে মুজিকা ছিলেন ‘তুপামারোস’ নামে এক বিপ্লবী গোষ্ঠীর নেতা। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তিনি সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেন, বারবার গ্রেফতার হন, নির্যাতিত হন এবং প্রায় এক দশক একাকী কারাবন্দি থাকেন।
১৯৮৫ সালে উরুগুয়েতে গণতন্ত্র ফিরলে সাধারণ ক্ষমার মাধ্যমে মুক্তি পান। পরে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ‘ফ্রেন্তে অ্যাম্পলিও’ জোটে যোগ দেন এবং ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মুজিকা উরুগুয়েকে আধুনিক ও মানবিক সংস্কারের পথে নিয়ে যান। গর্ভপাত ও সমকামী বিয়ে বৈধ করেন, গাঁজার নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেন।
তাঁর ভাষায়, “রাজনীতি যদি বিলাসে ডুবে যায়, তা মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আমি বিশ্বাস করি, একজন নেতাকে সাধারণ মানুষের মতোই জীবনযাপন করতে হবে।”
প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সরকারি প্রাসাদে না থেকে তিনি থাকতেন একটি ক্ষুদ্র খামারে, যেখানে তিনি নিজেই ফুল চাষ করতেন। তিনি নিজের ৯০% বেতন দান করতেন দরিদ্রদের কল্যাণে।
২০২২ সালে আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করি, যেন রাজা নির্বাচন করি-প্রাসাদ, লাল গালিচা, রাজকীয় আচরণ। কিন্তু আসল রাজনীতি হলো মানুষের পাশে থাকা।”
তাঁর স্ত্রী লুসিয়া তোপোলানস্কিও ছিলেন তুপামারোস আন্দোলনের নেত্রী। মুজিকার রাজনীতিক জীবনজুড়েই তিনি ছিলেন ছায়াসঙ্গী, পরে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
মৃত্যুর আগে ২০২৪ সালে মুজিকার গলায় ক্যানসার ধরা পড়ে। চিকিৎসায় কিছুটা উন্নতি হলেও, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জানা যায়, ক্যানসার যকৃতে ছড়িয়ে পড়েছে। মৃত্যুর আগে তিনি বলেন, “সত্যি বলতে, আমি মরতে চলেছি। তবে একজন যোদ্ধার বিশ্রামের অধিকার তো থাকেই।”
বিশ্বজুড়ে শোক-মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাউম বলেন, “পেপে ছিলেন প্রজ্ঞা ও সরলতার প্রতীক। তিনি আমাদের পথ দেখিয়েছেন।” চিলির প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বোরিচ বলেন, “তিনি প্রমাণ করে গেছেন, আরও ভালো কিছু সম্ভব।”
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রো শোকবার্তায় লেখেন, “বিদায় বন্ধু। লাতিন আমেরিকার এক দিনের ঐক্যের সংগীতের স্বপ্ন আপনি আমাদের মাঝে রেখে গেলেন।”
পেপে মুজিকা শুধু উরুগুয়েরই নয়, পুরো বিশ্বের জন্য ছিলেন এক ব্যতিক্রমী নেতা-যিনি অস্ত্র থেকে কলম, বিদ্রোহ থেকে রাষ্ট্র, প্রাসাদ থেকে খামারে এসে পৌঁছেছিলেন। তার জীবন ছিল আদর্শবাদী রাজনীতির জীবন্ত উদাহরণ।
মুজিকা আমাদের শিখিয়েছেন, রাজনীতি কেবল ক্ষমতার খেলা নয়-এটি একটি জীবনচর্চা, যা জনমানুষের সঙ্গে, মাঠের ধুলোমাটির সঙ্গে মিশে থাকে। এই অমলিন নেতা আজ বিদায় নিলেও, তার জীবন, দর্শন ও সরলতা বিশ্বকে অনুপ্রাণিত করবে বহুদিন।