বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬

দেশচিন্তা: অস্থিরতার মাঝেও আশার খোঁজে

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৫-০৮-০২ ২০:৫৭:১৪

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও গত এক সপ্তাহ নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশবাসীকে ভাবিয়েছে, কখনও ক্ষুব্ধ করেছে, আবার কোথাও কোথাও আশার আলোও দেখিয়েছে। গত সাত দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, দেশটি একদিকে যেমন গভীর সংকটে, অন্যদিকে সম্ভাবনার নতুন দ্বারও উন্মোচিত হচ্ছে।

গত সপ্তাহে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও এর কর্মপরিকল্পনা নিয়ে নানা বিতর্ক। ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংস্কার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির বার্তা দিলেও রাজনৈতিক দলগুলো এ প্রক্রিয়াকে ‘আংশিক’ এবং ‘সরকারনির্ভর’ বলে সমালোচনা করেছে। তবুও কমিশনের আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছে দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলো, যা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে এক আশার ইঙ্গিত। সংলাপে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), সিপিবি, ইসলামী আন্দোলন, গণসংহতি আন্দোলনসহ মোট ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করে। 
ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ জানান, এখন পর্যন্ত প্রায় ১৩টি বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। কিছু বিষয়ে ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট যুক্ত থাকবে। এছাড়া জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দেশের সংসদ কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের অংশ হিসেবে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন উচ্চকক্ষ হবে ১০০ আসনের এবং সদস্যরা জাতীয় নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে (পিআর পদ্ধতি) মনোনীত হবেন।প্রস্তাব অনুযায়ী, অর্থবিল ছাড়া অন্য সব বিল নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষে উপস্থাপন করতে হবে। উচ্চকক্ষ কোনো বিল স্থায়ীভাবে আটকে রাখতে পারবে না; এক মাসের বেশি আটকে রাখলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত বলে গণ্য হবে। উচ্চকক্ষ মূলত বিল পর্যালোচনা, বিশ্লেষণ এবং সুপারিশ প্রদানের দায়িত্ব পালন করবে।এদিকে, এক ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সর্বোচ্চ ১০ বছর দায়িত্ব পালন  ও বাংলাদেশে পুলিশের পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের প্রস্তাব পেশ করে কমিশন। আলোচনার পর অংশগ্রহণকারী দলগুলো এই প্রস্তাবে নীতিগত সম্মতি জানায়।
প্রস্তাব অনুযায়ী, এই কমিশন একজন অবসরপ্রাপ্ত আপিল বিভাগের বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত হবে। সদস্য সচিব হিসেবে থাকবেন একজন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অ্যাডিশনাল আইজিপি) পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তা। কমিশনে সরকার ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিসহ মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী এবং অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তারাও অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
চেয়ারপারসন ও সদস্য সচিব পূর্ণকালীন দায়িত্ব পালন করবেন।
কমিশনের অন্তত দুইজন সদস্য নারী হবেন।
এদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের এক ফেসবুক স্টাটাস নিয়ে গত সপ্তাহ রাজনৈতিক মাঠ ছিল বেশ সরগরম।নাহিদ ইসলাম দাবি করেছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে গত বছরের আগস্টে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জাতীয় সরকার ও নতুন সংবিধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি প্রস্তাবে সম্মত হননি।ফেসবুকে দীর্ঘ পোস্টে তিনি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে ‘সত্য নয়’ বলে উল্লেখ করেছেন।
পোস্টে নাহিদ লেখেন, “৫ আগস্ট রাতের প্রেস ব্রিফিংয়ের পর তারেক রহমানের সাথে আমাদের ভার্চুয়াল মিটিং হয়। সেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে জাতীয় সরকার ও নতুন সংবিধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তিনি এ প্রস্তাবে সম্মত হননি। বরং নাগরিক সমাজের সদস্যদের নিয়ে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরামর্শ দেন। আমরা তখন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম প্রস্তাব করি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে।”
তিনি আরও জানান, ৭ আগস্ট বিএনপি মহাসচিবের বাসায় অন্তর্বর্তী সরকার ও উপদেষ্টা পরিষদ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে তারেক রহমানের সাথে আরেকটি বৈঠকে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের বিষয়ে পর্যালোচনা হয়।
পোস্টে নাহিদ ইসলাম শিবির নেতা সাদিক কায়েমের দাবিকে ‘মিথ্যাচার’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “শিবিরের ইনস্ট্রাকশনে আমরা কাজ করেছি-এ অভিযোগ সত্য নয়। আমাদের সংগঠন ‘ছাত্রশক্তি’ গঠিত হয়েছে গুরুবার আড্ডা পাঠচক্র, ঢাবি ছাত্র অধিকার ও জাবির একটি স্টাডি সার্কেলের সমন্বয়ে। শিবিরের সাথে যোগাযোগ ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তারা যুক্ত ছিল না।”
নাহিদ ইসলাম সেনাবাহিনী সম্পর্কেও বিস্ফোরক দাবি করেছেন। তার বক্তব্য, “কথিত সেফ হাউজে থাকা ছাত্র সমন্বয়কদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল, যাতে তারা ফেসবুকে একদফা সরকার পতনের ঘোষণা দেয় এবং আমাদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে। আমরা শুরু থেকেই বলেছি, ক্ষমতা সেনাবাহিনী বা সেনা-সমর্থিত কোনো গ্রুপের কাছে দেওয়া যাবে না। এতে দেশ আরেকটি ‘এক এগারো’র মুখোমুখি হবে।”
তিনি অভিযোগ করেন, “কল রেকর্ড ফাঁস, নজরদারি, চরিত্রহনন, অপপ্রচার-এমন কোনো চেষ্টা বাদ দেওয়া হচ্ছে না। মিথ্যার উপর ভিত্তি করে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। যারা এই পথ অনুসরণ করছে, তারাও টিকবে না।”নাহিদ ইসলামের সর্বশেষ এই পোস্টে সেই রাজনৈতিক টানাপোড়েন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এদিকে,যত দ্রুত সম্ভব সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ করে লন্ডন বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অবিলম্বে নির্বাচন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
মির্জা ফখরুল বলেন, “সংস্কারের চিন্তা ও প্রস্তাব বিএনপির। আমরা কোনো সংস্কারকে ভয় পাই না, বরং স্বাগত জানাই।” তিনি উল্লেখ করেন, ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় ১২টি মৌলিক পরিবর্তনে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে, যা ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এমন কোনো সংস্কার প্রস্তাব আনা যাবে না, যা জাতির জন্য উপযোগী নয় বা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে,আসন্ন ফেব্রুয়ারি মাসের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে জামায়তে ইসলামী সরাসরি কোনো আপত্তি না জানালেও, নির্বাচন ঘিরে নানা ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছে বলে দাবি করেছে দলটি। জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। কিন্তু এখনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। নির্বাচন কমিশনের কাজগুলো যেমন-প্রবাসীদের ভোটার তালিকাভুক্ত করা, নতুন আইন তৈরি করা, ভোটার তালিকা হালনাগাদ-এসব কাজ দ্রুত এগোতে হবে। ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও প্রবাসী ভোটের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। তাই আমাদের আশঙ্কা, কোথাও কোনো ষড়যন্ত্র চলছে কি না।”তাহের অভিযোগ করে বলেন, “সচিবালয়ে এখনো স্বৈরাচারের প্রেতাত্মারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। যারা মেধা বাদ দিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পেয়েছে, তারাই এই প্রেতাত্মা। যদি একই পদ্ধতিতে নিয়োগ অব্যাহত থাকে, তাহলে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। তাই যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।”
এদিকে,জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি তৈরির দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, যদি এই সংস্কার কার্যক্রম এখন থেকেই শুরু না হয় এবং ভবিষ্যতের সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়, তবে দেশ অনিশ্চয়তা ও সংকটে পড়তে পারে।আখতার হোসেন জোর দিয়ে বলেন, “আমরা চাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকেই জুলাই সনদের বাস্তবায়ন শুরু হোক। এ জন্য একটি স্পষ্ট আইনি ভিত্তি এখনই তৈরি করতে হবে।”এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রামীণ পর্যায়ের নেতাদের মতামত নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে বাস্তবায়ন নির্ভর করবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদিচ্ছা ও সব পক্ষের আন্তরিকতার ওপর।


গত সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে একাধিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ইসরায়েল ও লেবাননের হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ নতুন মাত্রা পেয়েছে। সীমান্ত এলাকায় রকেট হামলা ও বিমান হামলায় উভয়পক্ষের হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। জাতিসংঘ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আহ্বান জানিয়েছে। এদিকে,ইউরোপীয় দেশগুলোর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকৃতির ধারাবাহিক পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। এরদোগান বলেছেন, “ইউরোপ থেকে, বিশেষ করে ফ্রান্স ও ব্রিটেন থেকে আসা সাম্প্রতিক মানবিক প্রতিক্রিয়াগুলো অত্যন্ত মূল্যবান। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির জন্য গৃহীত প্রতিটি পদক্ষেপকে আমরা স্বাগত জানাই।” তিনি আরও যোগ করেন, “গাজায় নৃশংসতার মুখে কেউ চুপ থাকতে পারে না। শিশুরা ক্ষুধায় মারা যাচ্ছে, খাদ্যের সন্ধানে থাকা বেসামরিক মানুষদের ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মানবিক ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোই একমাত্র পথ।” ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে সর্বশেষ পর্তুগাল ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, যা দেশীয় বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট দল আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতিতে নানামুখী কর্মসূচি চালু করেছে।এছাড়া ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের পণ্যের উপর শুল্কহার রিসিডিউলিং করেছেন।
ইউরোপের কয়েকটি দেশে রেকর্ড তাপমাত্রা বিরাজ করছে। ফ্রান্স, স্পেন ও ইতালিতে তাপদাহে বহু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে এবং কয়েকটি অঞ্চলে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
রাশিয়ার কামচাতকা উপদ্বীপে ঘটে যাওয়া ৮.৮ মাত্রার ভূমিকম্প ও সুনামী আন্তর্জাতিকভাবে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল; তবে তাৎক্ষণিক সতর্কতা ব্যবস্থা ও জরুরি প্রতিক্রিয়ার কারণে প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি পরিচালনায় সাফল্য পাওয়া গেছে।
যদিও এটি একটি ভয়াবহ ভূকম্পন ছিল, কিন্তু সর্বমোট ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে ছিল অল্প-কিছু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত, মোবাইল নেটওয়ার্ক খণ্ডিত হয়েছে। 
জাপানে টাইফুন আঘাত হেনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। হাজারো মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ফিলিপাইনে বন্যায় অন্তত ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) সতর্ক করেছে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে তেলবাজারে অস্থিরতা এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোর ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এই ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে আগামী কয়েক সপ্তাহেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। বিশ্ব নেতাদের কূটনৈতিক উদ্যোগ ও নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো নজর কাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


গত সপ্তাহে সারাদেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে জনমনে।একের পর এক সহিংস ঘটনা, ডাকাতি, খুন, নারী নির্যাতন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলার অবনতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একাধিক জেলায় সংঘটিত এসব ঘটনায় জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক বৃদ্ধি পেয়েছে। হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে গাছ ফেলে ট্রাকে ডাকাতির ঘটনা দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের কাছে সংঘটিত এই ঘটনায় যাত্রীদের কাছ থেকে মোবাইল, নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং কয়েকজনকে মারধর করা হয়। টহল পুলিশ পৌঁছালে ডাকাতেরা পালিয়ে যায়। তবে এই ঘটনার পর সড়কে রাতের নিরাপত্তা জোরদারের দাবি উঠেছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন ও জুলাই মাসে নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩৮-এ। এর মধ্যে ৫১ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, ৭৮ জন খুন হয়েছেন, এবং বহুজন অপহরণ ও যৌন সহিংসতার শিকার। এসব ঘটনা প্রমাণ করছে, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন এলাকায় খুনের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতা, জমি-সংক্রান্ত বিরোধ ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে কয়েকটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। একই সময়ে কয়েকজন নারী ও কন্যার রহস্যজনক মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের দাবি রাখে।
রাজধানী ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে। রাতের অন্ধকারে রিকশা, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারে যাত্রীদের লক্ষ্য করে ছিনতাইকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে কিছু অভিযান পরিচালনা করা হলেও অপরাধীদের দমন পুরোপুরি সম্ভব হয়নি।
এসব ঘটনায় পুলিশ বলছে, তারা নিরাপত্তা জোরদার করতে মাঠে কাজ করছে। তবে নেটওয়ার্ক সমস্যা,পর্যাপ্ত টহলের ঘাটতি ও স্থানীয় সহযোগিতার অভাবের কারণে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। অপরাধ দমন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জনগণকেও সচেতন ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
তবে সাধারণ মানুষ মনে করছে, কেবল অপরাধীদের গ্রেফতার করলেই হবে না, বিচার ও শাস্তি দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, সড়ক নিরাপত্তা, নারীর সুরক্ষা এবং রাতের শহরে পুলিশের টহল জোরদার করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বৃত্তি পরীক্ষা’ নিয়ে গত সপ্তাহে নতুন করে আলোচনার ঝড় ওঠে। বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন ঐক্য পরিষদ দাবি করেছে, সরকারি পরীক্ষায় তাদের শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়া বৈষম্যমূলক। অন্যদিকে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়েছে-এই বৃত্তি নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুদের জন্য আর্থিক প্রণোদনা, যা তাদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষায় সহায়ক হবে। এই বিতর্কের মাধ্যমে একদিকে যেমন বেসরকারি ও সরকারি শিক্ষার বৈষম্য উন্মোচিত হয়েছে, অন্যদিকে নীতিনির্ধারকদের আরও কার্যকর সমাধানের প্রয়োজনীয়তাও প্রকাশ পেয়েছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে সপ্তাহটি ছিল চ্যালেঞ্জিং। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, ডলারের সরবরাহ সংকট এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে বিশেষজ্ঞদের নতুন বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও দুর্বল বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকার বলছে, বাজেট বাস্তবায়নে সুশাসন ও প্রযুক্তি-নির্ভর মনিটরিং বাড়ানো হবে। এদিকে বহুল আলোচিত বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। 

সপ্তাহজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল নারীর নিরাপত্তা, মাদকবিরোধী অভিযান এবং পরিবেশ দূষণ। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ায় সরকার নতুন করে কিছু উদ্যোগ ঘোষণা করেছে। তবে জনগণ মনে করছে, ঘোষণার চেয়ে কার্যকর বাস্তবায়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গত এক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে, দেশ একদিকে সমস্যার জালে জড়িয়ে আছে, অন্যদিকে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও বিদ্যমান। রাজনৈতিক সংলাপ, সড়ক নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা-এই চারটি খাতেই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। সরকার, বিরোধী দল এবং সাধারণ নাগরিক-সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা ছাড়া ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব নয়।
দেশবাসীর প্রত্যাশা, আগামী সপ্তাহগুলোতে সংকট নয়, বরং সমাধানের পথে আরও দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যাবে।

লেখকঃ কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজকর্মী।

E-mail:smazadh@yahoo.com 

 


এ জাতীয় আরো খবর