মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায় না ইরান-এমনটাই জানিয়ে দিল তেহরান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিন আগেই দাবি করেছিলেন, ইরান আলোচনায় আগ্রহী এবং বৈঠক নির্ধারিত হয়েছে। কিন্তু তার এ দাবিকে "ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর" বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান সরকার।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই হামানেহ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, “আমাদের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার জন্য কোনো অনুরোধ পাঠানো হয়নি।”
এ বক্তব্য প্রকাশ করে ইরানি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ। তিনি আরও বলেন, "আলোচনার দরজা আমরা পুরোপুরি বন্ধ করে দিচ্ছি না, তবে বিশ্বাসভঙ্গের পর পুনরায় সংলাপ কঠিন।"
এদিকে একদিন আগেই, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “ইরান আমাদের সঙ্গে বৈঠক চায়। আমরা আলোচনার তারিখ নির্ধারণ করেছি।”
তবে তিনি সময় ও স্থান উল্লেখ করেননি।তিনি আরও দাবি করেন, “তারা আগের চেয়ে অনেক নমনীয় হয়ে উঠেছে। কিছু একটা চুক্তির দিকে তারা এগোচ্ছে।”
ইরানের প্রধান পারমাণবিক আলোচক আব্বাস আরাঘচি এক প্রবন্ধে মার্কিন প্রস্তাবকে “অবিশ্বস্ত ও কৌশলগত” বলে মন্তব্য করেন। ফিন্যানশিয়াল টাইমস–এ প্রকাশিত ওই লেখায় তিনি বলেন, “যখন আমরা সংলাপে আগ্রহ দেখালাম, তখনই আমাদের আবাসিক ও পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা কীভাবে আবার আস্থার পরিবেশ তৈরি করব?”
১৩ জুন ইসরায়েল ইরানের রাজধানী তেহরান, ইসফাহান ও ফোরদোতে নজিরবিহীন বিমান হামলা চালায়। এতে ইরানের একাধিক সামরিক কর্মকর্তা ও পারমাণবিক বিজ্ঞানী নিহত হন।
ইরানের হিসাব অনুযায়ী, হামলায় প্রাণ হারায় অন্তত ১,০৬০ জন।
এর জবাবে ইরান ১৮ জুন ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, যেখানে কমপক্ষে ২৮ জন নিহত হয়।
এই উত্তেজনার মাঝেই ২৪ জুন থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। কিন্তু তাতে আস্থা ফেরেনি।
তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ১২ এপ্রিল থেকে আলোচনা শুরু হলেও ২২ জুন ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্র নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এরপরই আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়।
আব্বাস আরাঘচি বলেন,“যখন আমরা সততার ভিত্তিতে আলোচনায় সম্মত হলাম, তখনই আমাদের সদিচ্ছাকে জবাব দেওয়া হলো বোমায়। কূটনীতিতে আগ্রহ থাকলেও এখন আমরা গভীর সংশয়ে।”
ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সম্প্রতি মার্কিন সাংবাদিক টাকার কার্লসন-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই, যদি আস্থা ও সম্মান রক্ষা করা হয়।”
তার এ বক্তব্য ঘিরেই ইরানে অভ্যন্তরীণ সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়।
রক্ষণশীল ‘কায়হান’ পত্রিকা কটাক্ষ করে লিখেছে, “আপনি কি ভুলে গেছেন,আলোচনার ছায়ায় তারা আমাদের উপরে হামলার প্রস্তুতি নিয়েছিল?”
‘জাভান’ দৈনিক বলেছে, “একটি দেশের প্রেসিডেন্টের বক্তব্য এতটা নমনীয় হওয়া উচিত নয়।”
অন্যদিকে সংস্কারপন্থী ‘হাম মিহান’ পত্রিকা প্রেসিডেন্টের বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে লিখেছে, “আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ইরানি নেতাদের উপস্থিতি দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ছিল। এই সাক্ষাৎকার দেরিতে হলেও সময়োপযোগী।”
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে ইরান সংলাপ বন্ধ করেনি, আবার অন্যদিকে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক পদক্ষেপ তাদের আস্থাকে ভেঙে দিয়েছে।
যদিও ট্রাম্প প্রশাসন আলোচনার দিকে এগোনোর ইঙ্গিত দিচ্ছে, তবে ইরান প্রশ্ন তুলছে বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গায়।
এই মুহূর্তে পারমাণবিক সমঝোতা ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা অনেকটাই ঝুলে আছে আন্তর্জাতিক কূটনীতির সততা ও নিরপেক্ষতার উপর।
কিওয়ার্ডস:ইরান যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা ২০২৫,ট্রাম্প ইরান বৈঠক দাবি,ইসমাইল বাকাই হিমেনেহ বক্তব্য,মাসউদ পেজেশকিয়ান টাকার কার্লসন সাক্ষাৎকার,ইরান-ইসরায়েল সামরিক উত্তেজনা,ইরান পারমাণবিক আলোচনা ২০২৫।