মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস অরাজনৈতিক ও নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করতে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, “একটি পক্ষের নয়, জাতির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জাতির সামনে তুলে ধরাই সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।”
সোমবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই নির্দেশনা দেন তিনি। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজ উদ্দিন মিয়া, এবং মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
বৈঠকে ড. ইউনূস বলেন, “মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে। এই ট্রাস্টের অধীন থাকা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি জনস্বার্থে কীভাবে ব্যবহৃত হতে পারে, তা খতিয়ে দেখতে হবে। এজন্য দ্রুত একজন স্বতন্ত্র পরামর্শক নিয়োগ এবং পরে একটি দক্ষ কমিটি গঠন করা হবে।”
তিনি উল্লেখ করেন, “এই ট্রাস্ট শুধু স্মৃতি সংরক্ষণ নয়, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা ও জাতির জন্য মূল্যবান ঐতিহাসিক সম্পদ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এখন সময় এসেছে এটিকে আবার জীবন্ত করে তোলার।”
উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বৈঠকে বলেন, “পূর্ববর্তী সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে এমনসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব বিবরণ বা মুক্তিযোদ্ধাদের সরাসরি অংশগ্রহণের চিহ্ন নেই। বরং একক পরিবারকে কেন্দ্র করে অতিরঞ্জিত ও দলীয়করণ করা ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।”
তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, “‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন’ শীর্ষক প্রকল্পে ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ের পরেও গবেষণার বাস্তব কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি। এসব প্রকল্পে অর্থ অপচয় হয়েছে এবং ইতিহাস বিকৃতি ঘটেছে।”
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেন, “মুক্তিযোদ্ধা ট্রাস্টের সম্পত্তিগুলো বহু মূল্যবান জাতীয় সম্পদ। অথচ এসব সম্পত্তি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে পূর্ববর্তী সরকারের আমলে। এখন সময় এসেছে এগুলোর স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও জনসেবায় রূপান্তরের।”
ফারুক ই আজম বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধাদের সুবিধাভোগী শ্রেণি হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। তাদের জন্য বরাদ্দ সম্পত্তি, ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা রাজনৈতিকভাবে বণ্টন করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গড়া অবকাঠামো ছিল দলীয় কার্যক্রমের আখড়া।”
প্রধান উপদেষ্টা বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দিয়ে বলেন, “সকল ভবিষ্যৎ প্রকল্পে নিশ্চিত করতে হবে যাতে প্রকৃত ইতিহাস দলমত নির্বিশেষে যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয় এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা সুরক্ষিত থাকে।”
সম্পাদকীয় মন্তব্য:
জাতীয় ইতিহাসের পবিত্রতা রক্ষার এই প্রয়াস নতুন সরকারের পক্ষ থেকে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদি প্রকৃত গবেষণা, স্বচ্ছতা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হয়, তাহলে দীর্ঘদিনের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিভ্রান্তি ও দলীয়করণ থেকে জাতি বেরিয়ে আসতে পারবে।
কীওয়ার্ডস:
মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট, ড. ইউনূস উপদেষ্টা, ফারুক ই আজম, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়, আওয়ামী লীগ মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতা যুদ্ধ প্রকল্প, মুক্তিযুদ্ধের দলীয়করণ, জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ, মুক্তিযোদ্ধা সম্পত্তি