ঢাকা-১৬ জুন ২০২৫
বাংলাদেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের শীর্ষ দুই উত্তরসূরীর বিদেশি সম্পদ এবার সরাসরি নজরদারিতে। চাঞ্চল্যকর এই অভিযানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ব্রিটেনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে সাফিয়াত সোবহান (সানভীর) ও সাফওয়ান সোবহানের সম্পদ জব্দের অনুরোধ জানিয়েছে।
সোমবার (১৬ জুন) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদক প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য নিশ্চিত করেন কমিশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন। তিনি জানান, “আজ আমরা আরও কিছু সম্পত্তির তথ্য যুক্তরাজ্যে পাঠিয়েছি, যার মধ্যে বসুন্ধরার ভাইস চেয়ারম্যানদ্বয়ের সম্পদও রয়েছে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আহমেদ আকবর সোবহান ও তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের বিরুদ্ধে পাঁচটি গুরুতর অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে:
সরকারি রাজস্ব ফাঁকি
ভূমি দখল ও বেআইনি সম্পদ অর্জন
ব্যাংক ঋণের অর্থ আত্মসাৎ
অবৈধ অর্থ স্থানান্তর ও হস্তান্তর
আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং
এমন অভিযোগের ভিত্তিতে পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে ইতোমধ্যেই দুদকে হাজির হতে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, শুধু বসুন্ধরা পরিবারের সম্পদই নয়, আরও দুই বিতর্কিত ব্যক্তির সম্পদের ব্যাপারেও চিঠি দেওয়া হয়েছে যুক্তরাজ্যকে:
আনিসুজ্জামান চৌধুরী রনি (সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ভাই)
মোহাম্মদ আদনান ইমাম (সাবেক নির্বাহী কমিটি চেয়ারম্যান, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক)
চিঠিগুলোতে সম্পদ জব্দ, লেনদেন স্থগিত এবং তথ্য বিনিময়ের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আলোচিত হয় ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের নামও। তিনি যুক্তরাজ্যের সাবেক ট্রেজারি মিনিস্টার ও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে দুদক চেয়ারম্যান বলেন,
“টিউলিপ সিদ্দিক যতই বলুন তিনি ব্রিটিশ নাগরিক, আমাদের কাগজপত্রে তিনি বাংলাদেশি। আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি। নির্দোষ হলে তাঁর মন্ত্রিত্ব গেল কেন?”
তিনি আরও বলেন, “যদি তার বিরুদ্ধে কিছু না থাকে, তবে তাঁর আইনজীবী আমাদের কাছে চিঠি দিলেন কেন? এটা কোনো রাজনীতি নয়, তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান।”
টিউলিপ নিজে অবশ্য এই অভিযোগকে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার” বলে অভিহিত করেছেন।
দুদক চেয়ারম্যান মোমেন বলেন, “মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে পাচার করা অর্থ ফেরত আনা খুবই জটিল প্রক্রিয়া। কিন্তু আমরা সব আইনি পথ অনুসরণ করছি। প্রয়োজনে বিদেশি আদালতে আমাদের অবস্থান তুলে ধরা হবে।”
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ, মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স ট্রিটিস (MLAT) এবং ইন্টারপোলের সহায়তা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বসুন্ধরা পরিবারের ওপর দুদকের এই নজরদারি শুধুই অর্থনৈতিক নয়, এর সঙ্গে ক্ষমতাবদলের পর রাজনৈতিক বার্তাও জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে ‘অপ্রতিরোধ্য অর্থবল’–এর প্রতীক হয়ে ওঠা এই পরিবার প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় তদন্তের মুখে।
এর পাশাপাশি টিউলিপ ইস্যুতে এক ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও লক্ষ করা যাচ্ছে, যা প্রবাসী বাংলাদেশি রাজনীতিকদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রশ্নে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দেশের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পরিবারের দুই উত্তরসূরী যখন আন্তর্জাতিক তদন্তের আওতায় পড়েন, তখন সেটি শুধু একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, রাষ্ট্রের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান কতটা কার্যকর-সেটিও পরিমাপের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
এখন দেখার বিষয়,এই ‘লন্ডন কনেকশন’ থেকে বাংলাদেশের জনগণ তাদের লুট হয়ে যাওয়া অর্থ ফেরত পায় কি না।