সোমবার, মে ২৫, ২০২৬

আকাশের কান্না: আহমেদাবাদ দুর্ঘটনার ছায়ায় ভারতের ভয়াবহ বিমান বিপর্যয়ের ইতিহাস

  • নিজস্ব প্রতিবেদক,
  • ২০২৫-০৬-১৩ ০০:৪২:০২
ছবি সংগৃহিত
ঢাকা- ১৩ জুন ২০২৫
একটি মাত্র দুর্ঘটনা কতখানি ব্যথা আর শোকের রেখাপাত করতে পারে, তা আবারও চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আহমেদাবাদ-লন্ডনগামী এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট A171-এর মর্মান্তিক পরিণতি। ২০২৫ সালের ১২ জুন ভোরে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই বিধ্বস্ত হয় এই বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার। নিহতের সংখ্যা নিয়ে এখনও সরকারি হিসাব স্পষ্ট না হলেও, বিমানে থাকা অধিকাংশ যাত্রীরই প্রাণ হারানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই দুর্ঘটনা যেন স্মরণ করিয়ে দিল ভারতের বিমান চলাচলের দীর্ঘ ইতিহাসে একের পর এক ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিমান বিপর্যয়গুলোর কথা-যেগুলো শুধুই প্রযুক্তিগত নয়, বরং কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কখনো সন্ত্রাস, আবার কখনো মানবিক ভুলের করুণ দলিল।
 
ভারতের আকাশে অমোচনীয় দুর্ঘটনার ছাপ: একটি রক্তাক্ত ইতিহাস
মন্ট ব্ল্যাঙ্কের বুকে কান্না (১৯৬৬)
এয়ার ইন্ডিয়ার 'কাঞ্চনজঙ্ঘা' ফ্লাইটটি বিধ্বস্ত হয় সুইজারল্যান্ডের বরফাবৃত মন্ট ব্ল্যাঙ্কে। বোয়িং ৭০৭ বিমানের সকল ১১৭ যাত্রী ও ক্রু নিহত হন। এটি ছিল আন্তর্জাতিক রুটে ভারতের প্রথম বড় বিপর্যয়।
 
আরব সাগরে নিঃশেষ (১৯৭৮)
একটি বোয়িং ৭৪৭ বিমান মুম্বাই ছাড়ার কিছু পরই যান্ত্রিক বিভ্রান্তিতে সাগরে পড়ে। ২১৩ জনের সবাই মারা যান। এটি ছিল ভারতের সবচেয়ে বড় ‘ইন্সট্রুমেন্ট ফেইলিওর’ সংক্রান্ত দুর্ঘটনাগুলোর একটি।
 
কানিষ্কা বিস্ফোরণ,মধ্য আকাশে সন্ত্রাস (১৯৮৫)
কানাডা থেকে ভারতের পথে থাকা এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৮২ আয়ারল্যান্ড উপকূলে মাঝ আকাশে উড়ে যায় সন্ত্রাসী বোমায়। নিহত হন ৩২৯ জন। এটি ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বিমানবাহিত সন্ত্রাসী হামলা।
 
চরখি দাদরির আকাশে মুখোমুখি সংঘর্ষ (১৯৯৬)
হরিয়ানার চরখি দাদরির উপর আকাশে দুইটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট—সৌদি ও কাজাখস্তান এয়ারলাইন্স—পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে পড়ে। ৩৪৯ জন যাত্রীর কেউই বাঁচেননি। এটিই বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী মধ্য আকাশ সংঘর্ষগুলোর একটি।
 
ম্যাঙ্গালুরু বিপর্যয় (২০১০)
একটি এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস ফ্লাইট রানওয়ে অতিক্রম করে খাদে পড়ে। ১৫৮ জন প্রাণ হারান, যাত্রীদের অধিকাংশ ছিলেন প্রবাসফেরত শ্রমিক। দুর্ঘটনাটি আলোচনায় এনেছিল ‘টেবিলটপ রানওয়ে’র ঝুঁকি।
 
কোজিকোডের বর্ষায় মৃত্যু (২০২০)
বৃষ্টির মধ্যে অবতরণ করতে গিয়ে ডুবে যায় এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের আরেকটি ফ্লাইট। ২১ জনের মৃত্যু হয়, আহত হন শতাধিক। এটিও ছিল টেবিলটপ রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ার আরেকটি করুণ উদাহরণ।
 
মানচিত্রে বিক্ষিপ্ত,স্মৃতিতে জড়ো ভারতের বিমান বিপর্যয়: সংক্ষিপ্ত তালিকা
সাল             দুর্ঘটনার নাম        নিহত
১৯৬৬ মন্ট ব্ল্যাঙ্ক (ফ্রান্স)        ১১৭
১৯৭৬ মুম্বাই-মাদ্রাজ (ফ্লাইট ১৭১) ৯৫
১৯৭৮ আরব সাগর                   ২১৩
১৯৮২ মুম্বাই অবতরণ (ফ্লাইট ৪০৩) ১৭
১৯৮৫ কানিষ্কা (ফ্লাইট ১৮২) ৩২৯
১৯৮৮ আহমেদাবাদ (IC-113) ১৩০
১৯৯০ বেঙ্গালুরু (ফ্লাইট ৬০৫) ৯২
১৯৯৩ আওরঙ্গাবাদ সংঘর্ষ ৫৫+
১৯৯৬ চরখি দাদরি সংঘর্ষ      ৩৪৯
১৯৯৮ পাটনা (ফ্লাইট ৭৪১২) ৬০
২০১০ ম্যাঙ্গালুরু            ১৫৮
২০২০ কোজিকোড            ২১
২০২৫ আহমেদাবাদ-লন্ডন (A171) প্রাথমিক রিপোর্টে বহু হতাহতের আশঙ্কা
 
প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা?
বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে ভারত অনেকদূর এগোলেও বারবার এমন প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা প্রশ্ন তোলে:
পাইলট প্রশিক্ষণ কতটা মানসম্পন্ন?
আবহাওয়া সতর্কতা কতটা নির্ভুল?
রানওয়ে অবকাঠামো কতটা প্রস্তুত ঝুঁকির জন্য?
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকনোলজি থাকলেও “মানবিক ত্রুটি”, “রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি” এবং “সংকটকালীন ব্যবস্থাপনার অভাব”-এই তিনটি প্রধান কারণ ভারতের বিমানবিধ্বস্ত ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে।
 
আকাশের স্মরণপত্রে আরেকটি শোকরেখা
আহমেদাবাদ-লন্ডনের এই সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা কেবল একটি সংখ্যা নয়। এটি ভারতের আকাশে আরেকটি রক্তাক্ত লেখা, একটি পরিবারের চিরকালীন অপূরণীয় শূন্যতা। আর আমাদের জন্য এটি এক তীব্র অনুস্মারক: উচ্চতা যতই হোক না কেন, নিরাপত্তা ছাড়া সে আকাশ মৃত্যুফাঁদেও পরিণত হতে পারে।

এ জাতীয় আরো খবর