মঙ্গলবার, মে ২৬, ২০২৬

‘অপরাধীর হাতে অস্ত্র’: নেতানিয়াহুর স্বীকারোক্তিতে উন্মোচিত গাজার আরও এক নির্মম অধ্যায়

  • নিজস্ব আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • ২০২৫-০৬-০৬ ১১:০৬:৫৫
ফাইল ছবি

মধ্যপ্রাচ্যের নিকষ অন্ধকারে যখন প্রতিদিন ফিলিস্তিনিদের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে গাজা, তখন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক স্বীকারোক্তি যেন সেই রক্তপাতকে আরও জঘন্য রূপে প্রতিষ্ঠিত করল। বহুদিন ধরেই গুঞ্জন ছিল, গাজায় ইসরাইলের মদদে সক্রিয় কিছু ‘স্থানীয় গোষ্ঠী’ হামাস বিরোধী যুদ্ধের নামে মানবিক সহায়তা লুটপাটে লিপ্ত। এবার সেই গুঞ্জনই সত্যি করলেন নেতানিয়াহু নিজে।

নেতানিয়াহুর স্বীকারোক্তি: মিত্র না দালাল?
বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে জানিয়ে দিলেন-“আমরা হামাসের বিরুদ্ধে গাজায় কিছু শক্তিশালী গোত্র ও পরিবারকে সক্রিয় করেছি।” তাঁর এই ভাষ্য অনেকটা ‘অবধারিত সত্যকে মুখোশ খুলে দেওয়া’র মতোই। কারণ, যারা সক্রিয় হয়েছেন, তাদের কেউ কেউ চিহ্নিত ‘অপরাধী গ্যাং’। এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে-ত্রাণ সরবরাহে লুটপাট, খাদ্য ও ওষুধ আত্মসাৎ এবং সহিংসতা ছড়ানো।

কারা এই গোষ্ঠী? কেনই বা এদের সহায়তা করছে ইসরাইল?
নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যের আগে থেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়া যেমন এপি ও হারেৎজ এসব গোষ্ঠীর পরিচয় সামনে এনেছে।
বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে ‘পপুলার ফোর্সেস’ নামের একটি গোষ্ঠী, যার নেতৃত্বে রয়েছেন রাফাহ এলাকার গোত্র নেতা ইয়াসের আবু শাবাব।
এই গোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা আনুমানিক ১০০ এবং তারা কাজ করছে ইসরাইলি বাহিনীর ‘নীরব সম্মতি’ নিয়ে। এমনকি হারেৎজ পত্রিকা এদের নাম দিয়েছে ‘অ্যান্টি-টেরর সার্ভিস’-যা আদতে ইসরাইলের ছায়াসংগঠন হিসেবেই কাজ করছে।

গাজার রক্তাক্ত ত্রাণ কেন্দ্র ও ‘মানব কসাইখানা’
গাজা এখন আর শুধু যুদ্ধের নয়, মানবিক বিপর্যয়েরও ভূখণ্ড। ইসরাইল সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সহায়তা কেন্দ্রগুলো যেন হয়ে উঠেছে মৃত্যুকূপ।
গত এক সপ্তাহে চারবার এসব কেন্দ্রের বাইরে ত্রাণের আশায় জড়ো হওয়া মানুষদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। প্রাণ হারিয়েছে শতাধিক মানুষ।
জাতিসংঘের সাবেক মুখপাত্র ক্রিস গানেস এই পরিস্থিতিকে আখ্যা দিয়েছেন-“একটি মানব কসাইখানা”। তাঁর ভাষায়,
“এখানে মানুষকে খাদ্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জড়ো করা হচ্ছে, এরপর পশুর মতো গুলি করে মারা হচ্ছে।”

অপরাধীর হাতে রাষ্ট্রীয় অস্ত্র: ইসরাইলের অভ্যন্তরেও বিতর্ক
নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ইসরাইলের অভ্যন্তরেও বিতর্ক তুঙ্গে। বিরোধী দলগুলোর প্রশ্ন-মন্ত্রিসভা বা কনসেন্ট ছাড়াই কীভাবে অপরাধী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হলো অস্ত্র?
সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যান আগে থেকেই এ অভিযোগ তুলে আসছিলেন। এবার সেটিই নেতানিয়াহু নিজেই স্বীকার করায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে পড়েছে।

চলমান হামলায় শিশু-সাংবাদিক কেউ রেহাই পাচ্ছে না
নেতানিয়াহুর বক্তব্য যেদিন আসে, সেই বৃহস্পতিবারেই ইসরাইলি হামলায় ৭০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন।
খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে এসেছে ৩১ জনের মৃতদেহ,

গাজা শহরের আল-আহলি আরব ও আল-শিফা হাসপাতালে আরও ২১টি,
মৃতদের মধ্যে চারজন ছিলেন সাংবাদিক, যারা হাসপাতালের আশপাশে রিপোর্টিং করছিলেন।
ফাদি আল-হিন্দির বর্ণনায় গাজার বিভীষিকা

গাজা সিটির বাসিন্দা ফাদি আল-হিন্দি আল জাজিরাকে বলেন, “আমি আমার সন্তানদের খোঁজে তাঁবু থেকে বের হতেই দেখি বাইসাইকেল আরোহীর শরীর দু’ভাগ হয়ে রাস্তায় পড়ে আছে। রাস্তাজুড়ে শুধু রক্ত, শরীরের টুকরো। আমরা সেগুলো কুড়িয়ে নিচ্ছিলাম।”
এই একটি বর্ণনাই বলে দেয় গাজার বাস্তবতা-সেখানে এখন জীবন নয়, শুধুই মৃত্যুর ছায়া।

হামাসের অবস্থান ও যুদ্ধবিরতির অনিশ্চয়তা
এদিকে হামাস নেতা খলিল আল-হাইয়া বলেছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের দূত স্টিভ উইটকফের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেনি, বরং কিছু সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু ইসরাইল আবারও মার্চের অস্থায়ী অস্ত্রবিরতি ভেঙে হামলা শুরু করায় সমাধানের পথ আগেই কঠিন হয়ে গেছে।

গণহত্যার হিসাব: গাজার মৃত্যুপরিসংখ্যানে স্তম্ভিত বিশ্ব
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী,
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ৫৪,৬৭৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত, আহত ১,২৫,৫৩০ জন।
গাজার মিডিয়া অফিস বলছে, প্রকৃত সংখ্যা ৬১,৭০০ ছাড়িয়ে গেছে।
ধ্বংসস্তূপে এখনও হাজারো লাশ চাপা পড়ে আছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

একটি প্রশ্নবিদ্ধ রাষ্ট্রীয় নীতি: সহিংসতা কি এখন ইসরাইলের কৌশল?
নেতানিয়াহুর স্বীকারোক্তি কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি নীতিগতভাবে একটি ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত-যেখানে রাষ্ট্র নিজেই অপরাধী গোষ্ঠীকে বৈধতা ও সহায়তা দিয়ে একটি দখলকৃত ভূখণ্ডে সহিংসতা ছড়াচ্ছে।
এটি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার নীতির পরিপন্থী হলেও, এখন পর্যন্ত জাতিসংঘ কিংবা বড় আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে তেমন কোনও কার্যকর প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না।

স্বীকারোক্তির পরও নিশ্চুপ বিশ্ব
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একটি স্বীকারোক্তি যেন আরও একবার উন্মোচন করল-গাজা কেবল একটি যুদ্ধক্ষেত্র নয়, এটি এখন রাষ্ট্রীয় সহিংসতার গবেষণাগার।
আর এই গবেষণায় ব্যবহৃত হচ্ছে মানুষ-শিশু, নারী, সাংবাদিক, চিকিৎসক।
তাদের রক্ত, তাদের দেহাবশেষ, তাদের আর্তনাদ-সবকিছুই যেন এখন কৌশলের উপকরণ।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হয়তো দেখছে, কিন্তু থামানোর মতো সাহস কি কারও আছে?


এ জাতীয় আরো খবর