আওয়ামী লীগের সকল কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ এবং নিবন্ধন স্থগিত হওয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এবার সরব হলেন সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। সোমবার (১২ মে) রাত ৯টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক আবেগঘন ও তাত্ত্বিক রাজনৈতিক পোস্টে তিনি "লীগমুক্ত বাংলাদেশ" গড়ার লড়াইকে আরও গভীর ও সংগঠিত করতে আহ্বান জানান।
মাহফুজ আলম লিখেছেন, “আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলো, কিন্তু লড়াই এখনো শেষ হয়নি। মুজিববাদের সাংস্কৃতিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক শোষণ ব্যবস্থাকে পরাস্ত না করা পর্যন্ত আমাদের লড়াই চলবে।”
তিনি আরও লেখেন, “ফ্যাসিবাদের ফলে যে সামাজিক ফ্যাসিবাদ সৃষ্টি হয়েছে, তা সমাজকে কলুষিত করছে। মজলুম জনগোষ্ঠীকে যেন জালিম বানিয়ে না তোলা হয়, সেই দিকেও আমাদের নজর রাখতে হবে। এই রাষ্ট্রকে মানুষের রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে হলে অভ্যুত্থানপন্থী সকল শক্তিকে দূরদর্শী ও গণমুখী ভূমিকা নিতে হবে।”
ফেসবুক পোস্টে উপদেষ্টা মাহফুজ আলম রাজনৈতিক বিরোধ ও প্রতিযোগিতাকে স্বাভাবিক বলে উল্লেখ করলেও, তা যেন বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনে অন্তরায় না হয়, সেই আহ্বানও জানান। “আদর্শিক মতপার্থক্য থাকবেই, নির্বাচনী প্রতিযোগিতাও থাকবে। কিন্তু দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সবাইকে ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষ’ হয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। যুগপৎ অথবা পৃথকভাবে হলেও, সবাইকে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।”
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “১৯৭১-এর পর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় কাঠামো মুজিববাদের নামে ছিন্নভিন্ন করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে করেছে দুর্বল, প্রশাসনকে করেছে একচেটিয়া। এই পচনের বিরুদ্ধে নূতন রাজনৈতিক চুক্তি ছাড়া ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।”
এই পোস্টটি এসেছে এমন এক সন্ধিক্ষণে, যখন একদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী আওয়ামী লীগের যাবতীয় সাংগঠনিক, প্রচার এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হয়েছে, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন দলটির রাজনৈতিক নিবন্ধন স্থগিত করেছে। অর্থাৎ দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই প্রাচীন দলটির কার্যক্রম রাষ্ট্রীয়ভাবে বন্ধ হলো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, উপদেষ্টা মাহফুজের এই পোস্ট ‘সরকারি রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং ভবিষ্যতের রূপরেখার ইঙ্গিত।’ বিশেষ করে, যেভাবে তিনি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদ মোকাবেলার কথা বলেছেন, তাতে বোঝা যায়-এই সরকার কেবল পুরনো দল নিষিদ্ধ করেই থামতে চায় না, তারা একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তা প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ।
মাহফুজ আলম তার পোস্টে বারবার "মুজিববাদ" শব্দটি ব্যবহার করে তা ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষয়িষ্ণুতা ও শোষণের ধারক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর মাধ্যমে শুধু রাজনৈতিক ইতিহাস নয়, বরং দেশের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আদর্শকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার সূচনা করেছেন তিনি।
তার ভাষায়, “আমরা যদি এই শাসনব্যবস্থার কাঠামোতে পরিবর্তন না আনতে পারি, যদি গণতন্ত্রকে জনগণের হাতে না ফিরিয়ে দিতে পারি-তবে এই ইতিহাস আবারও পুনরাবৃত্তি ঘটাবে। তাই এখনই সময় নতুন চুক্তির, নতুন পথের।”
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনসমূহের সমস্ত প্রচারণা, মিছিল, সভা, সেমিনার, সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশনা-সবই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে দলটির সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক কার্যত ভেঙে পড়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, এই নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষিতে নিবন্ধন স্থগিত করা হয়েছে। ফলে দলটি এখন কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না।
এই পরিস্থিতি দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পুনর্গঠনের সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। মাহফুজ আলমের বক্তব্যে যেভাবে সাংস্কৃতিক রাজনীতির পুনর্গঠনের কথা এসেছে, তাতে বোঝা যায়-রাষ্ট্র শুধু দল নয়, আদর্শেও রূপান্তরের পথে।
রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মতে, মুজিববাদের বাইরে রাষ্ট্রচিন্তা এবং ক্ষমতা কাঠামোর যে বিকল্প নির্মাণের কথা বলা হচ্ছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে বৃহৎ সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐক্য গঠন আবশ্যক।