ক্যাথলিক বিশ্ব একজন পথপ্রদর্শককে হারিয়েছে, আর যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা হারিয়েছে একজন নীরব সঙ্গীকে। সোমবার (২১ এপ্রিল) পোপ ফ্রান্সিসের মৃত্যুতে শোকাতুর সারা বিশ্ব, কিন্তু ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া গাজাবাসীর হৃদয়ে যেন সৃষ্টি হয়েছে আরও এক শূন্যতা।
গাজার খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জন্য পোপ ছিলেন শুধু ধর্মীয় নেতা নন, তিনি ছিলেন এক আশ্রয়দাতা কণ্ঠ, যিনি প্রতিদিন খোঁজ নিতেন বেঁচে আছেন কি না-এমন এক সময়েও, যখন আকাশ থেকে ঝরছিল বোমা।
৬৩ বছর বয়সি করিমা তারাজি নিউ জার্সির নিউয়ার্কে ক্যাথেড্রাল ব্যাসিলিকা অফ দ্য সেক্রেড হার্টে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে বলছিলেন, “আজ সকালে, আমার পরিবারের সঙ্গে কথা বললাম। তারা বলল, ‘আজ একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ছিল। আমরা পোপের কণ্ঠস্বর পাইনি।’”
২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলি বোমায় তারাজির পরিবারের ১৭ সদস্য সেন্ট পোরফাইরিয়াস গ্রীক অর্থোডক্স গির্জার অভ্যন্তরে নিহত হন। সেই ধ্বংসযজ্ঞের পর দুই গির্জা-হলি ফ্যামিলি চার্চ ও পোরফাইরিয়াস-হয়ে ওঠে গাজার অসংখ্য পরিবারের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল। সেখানেই আশ্রয় নিয়েছিল তারাজির পরিবারও। যুদ্ধ আর অন্ধকারের ভেতরেও প্রতি রাতে পোপের ফোনে খুঁজে পেতেন সাহস, সহানুভূতি আর মানবিকতার এক নিঃশব্দ আলিঙ্গন।
তারাজির কথায়, “গত দেড় বছরে এমন একটি দিন যায়নি, যেদিন আমাদের গির্জায় থাকা পরিবার পোপের কণ্ঠস্বর পায়নি। তিনি আমাদের বেঁচে থাকার সাহস জুগিয়েছেন।”
বিশ্বের কোটি কোটি খ্রিস্টান আজ শোকবিধুর। কিন্তু গাজায়, যেখানে প্রতিটি দিন যুদ্ধের একেকটি অধ্যায়, সেখানে পোপের মৃত্যু যেন আরও একটি ছায়া নামিয়েছে। তারাজি বলেন, “আমরা কেবল এক ধর্মগুরুকে হারাইনি। আমরা হারিয়েছি এমন একজনকে, যিনি আমাদের অস্তিত্বের পাশে ছিলেন, যখন পুরো দুনিয়া চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।”
আন্তর্জাতিক সহানুভূতির কেন্দ্রবিন্দু
পোপ ফ্রান্সিস ছিলেন বিশ্বের ক্যাথলিকদের আধ্যাত্মিক নেতা হলেও তাঁর দৃষ্টি বরাবরই ছড়িয়ে ছিল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দিকে। ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট, সাহসী এবং নীতিনিষ্ঠ।
ইসরায়েলের গাজায় গণহত্যার মতো সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে ২০২৩ সাল থেকেই ধারাবাহিকভাবে নিন্দা জানিয়ে এসেছেন পোপ। পবিত্র ভূমিতে নিরস্ত্র নাগরিকদের হত্যা, ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা ও মানবিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর। ফলে তাঁর মৃত্যুতে ফিলিস্তিনি খ্রিস্টানরা শুধুমাত্র ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, রাজনৈতিক ও মানবিক দিক থেকেও নিজেদের অত্যন্ত দুর্বল এবং একা অনুভব করছেন।
নিউ জার্সির প্রার্থনা, গাজার কান্না
পোপের স্মরণে মঙ্গলবার নিউ জার্সির নিউয়ার্কে ক্যাথেড্রাল ব্যাসিলিকায় আয়োজিত প্রার্থনায় অংশ নেন প্রায় দুই হাজার মানুষ। আলো-সজ্জিত চ্যাপেলভর্তি সেই অনুষ্ঠানে ছিল এক অপার আবেগ, আর উপস্থিত ছিল মধ্যপ্রাচ্য থেকে পালিয়ে আসা উদ্বাস্তু পরিবারগুলো, যাদের জীবনে পোপ ফ্রান্সিস ছিলেন শান্তির প্রতীক।
প্রার্থনারত এক যুবক বলছিলেন, “তিনি শুধু রোমের পোপ ছিলেন না; তিনি ছিলেন গাজার একটি গির্জার প্রতিদিনকার সান্ত্বনা।”
মানবতার এক নতুন সংজ্ঞা
পোপ ফ্রান্সিস এক অনন্যধর্মী ধর্মগুরু ছিলেন, যিনি গির্জার প্রাচীর ভেঙে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। তিনি শুধু প্রার্থনার কথা বলেননি; তিনি বলেন রাজনৈতিক অন্যায়, সামাজিক বৈষম্য এবং যুদ্ধের বিরুদ্ধে। একাধারে তিনি ছিলেন পরিবেশ রক্ষার পক্ষে, আর অন্যদিকে উদ্বাস্তুদের অধিকারের জোরালো পক্ষে।
এই বৈশ্বিক নেতার মৃত্যুতে একেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান যেখানে শোকবার্তা পাঠান, বাংলাদেশ সেখানে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। কিন্তু গাজার সেই দুটি গির্জায়-যেখানে প্রার্থনার বদলে এখন শব্দ শোনা যায় ড্রোনের গুঞ্জন আর ধ্বংসস্তূপে চাপা কান্নার-সেখানে পোপের অনুপস্থিতি যেন আরও প্রগাঢ়।
এক নিঃশব্দ যাত্রা, এক চিরকালীন স্মৃতি
মৃত্যু বড় সত্য, তবু কিছু মৃত্যু আমাদের নিঃস্ব করে দেয়। পোপ ফ্রান্সিসের মৃত্যু তেমনই এক ঘটনা, যা কেবল ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বীদের নয়, বরং বিশ্বের সব প্রান্তিক, নিপীড়িত, শান্তিকামী মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
গাজার গির্জাগুলো আজ নিস্তব্ধ। সেখানে শুধু নেই পোপের কণ্ঠস্বর, নেই তার সান্ত্বনার ফোন। কিন্তু আছে তার স্মৃতি, আছে তার দেয়া আশার আলো। যে আলো হয়তো যুদ্ধের আঁধারে এখনও টিকে থাকার সাহস জোগায়।