ঢাকা|৫ জুন ২০২৫
জলবায়ু আন্দোলনের সাহসী কণ্ঠ ২২ বছর বয়সী সুইডিশ কর্মী গ্রেটা থুনবার্গ এবার মানবিক সহায়তার এক অনন্য অভিযানে যাত্রা শুরু করেছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার উদ্দেশ্যে। গত রোববার ইতালির কাটানিয়া উপকূল থেকে ‘ম্যাডলিন’ নামের একটি নৌযানে চড়ে তিনি রওনা হয়েছেন ফিলিস্তিনিদের জন্য সাহায্য নিয়ে।
এই ত্রাণবাহী নৌযানটি পরিচালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন (FFC)-এর মাধ্যমে। এতে রয়েছে শিশু খাদ্য, দুধ, ডায়াপার, চাল-আটা, পানি পরিশোধন যন্ত্রসহ বিভিন্ন জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী।
এই ত্রাণমিশনে গ্রেটা থুনবার্গের সঙ্গে আছেন আরও ১২ জন আন্তর্জাতিক শান্তিকর্মী। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন জনপ্রিয় ব্রিটিশ অভিনেতা লিয়াম কানিংহ্যাম, যিনি গেমস অব থ্রোনস-এ ‘ডেভোস সিওয়ার্থ’ চরিত্রে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
তারা এ মিশনকে ঘোষণা করেছেন “ইসরাইলি অবরোধ ও যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে সরাসরি, অহিংস প্রতিবাদ” হিসেবে।
গ্রেটার এই সাহসী যাত্রার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (IDF) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফরিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “আমরা প্রস্তুত রয়েছি। বিগত অভিজ্ঞতার আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আমরা দ্বিধা করব না।”
তবে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। গ্রেটার বহনকারী নৌযানকে ইতোমধ্যে একটি ড্রোন দ্বারা অনুসরণ করা হচ্ছে, যা গ্রিক কোস্ট গার্ডের বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
ফ্লোটিলার যাত্রা শুরু করার সময় কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে গ্রেটার। তিনি বলেন- “পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, চেষ্টা থেমে গেলে মানবতা থেমে যাবে। আমরা সেটা হতে দিতে পারি না।”
গ্রেটার সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ছবিগুলোতে তাকে দেখা যাচ্ছে ফিলিস্তিনি কেফিয়েহ পরে, ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে, ভূমধ্যসাগরে একটি নৌযানে। তিনি সাঁতার কেটেছেন নীল জলরাশিতে, যেন বিশ্ব বিবেককে জাগিয়ে তোলার এক প্রতীকী চিত্র।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর দফায় দফায় হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা উপত্যকা। এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছে ৫৪,৬০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি। সেইসঙ্গে টানা অবরোধে পুরো অঞ্চল পরিণত হয়েছে চরম খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষে।
মূলত ২০০৭ সাল থেকেই গাজা স্থল, জল ও আকাশপথে অবরুদ্ধ। কিন্তু ২০২৩ সালের পর এই অবরোধে রূপ নেয় মানবিক বিপর্যয়ে।
এটি ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের প্রথম মিশন নয়। এর আগে তাদের আরেকটি জাহাজ মাল্টার পথে রওনা দেওয়ার সময় ইসরাইলি ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবুও থেমে থাকেনি এ আন্দোলন।
গ্রেটাসহ অভিযানে থাকা সদস্যরা দাবি করছেন, তাদের নৌযানকে আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় ঢুকতেই ড্রোনে নজরদারি করা হচ্ছে। নিরাপত্তার জন্য তারা জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
বিশ্ব গণমাধ্যমে গ্রেটার এই উদ্যোগ প্রশংসা কুড়িয়েছে। অনেকেই একে মানবতার সাহসী কণ্ঠস্বর বলে অভিহিত করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘#FreedomFlotilla’, ‘#StandWithGaza’ ও ‘#GretaForHumanity’ হ্যাশট্যাগে ঝড় উঠেছে।
বিশ্বজুড়ে পরিচিত জলবায়ু আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে, গ্রেটা থুনবার্গ এখন গাজা উপত্যকার মানবিক সঙ্কটেও কণ্ঠ মিলিয়েছেন। এই যাত্রা তার আন্দোলনের এক নতুন রূপ, যেখানে পরিবেশবাদী অবস্থান মানবিক অধিকার রক্ষার সাথে একীভূত।
যেখানে রাষ্ট্রগুলো ব্যর্থ, সেখানেই একজন তরুণী মানবতার খাতিরে এগিয়ে এসেছেন। গ্রেটার এই যাত্রা শুধু একটি ত্রাণ মিশন নয়, বরং এটি একটি প্রতিবাদের জাহাজ-যা নীরব বিশ্ব বিবেকের সামনে প্রশ্ন তুলে দেয়: মানবতা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে আজ?