সোমবার, মে ২৫, ২০২৬

খাবারের জন্য গিয়েছিলেন,ফিরলেন রক্তাক্ত শরীরে-গাজায় ত্রাণসন্ধানী নিরীহ মানুষদের ওপর ইসরায়েলি গুলি

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
  • ২০২৫-০৬-০৫ ০০:৪৮:৩৪
ছবি সংগৃহিত

গাজার রাফাহ সীমান্তে খাবারের আশায় আসা মানুষের আহাজারি আর গুলির শব্দ একাকার হয়ে গেছে। ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে জীবন নিয়ে ফিরতে না পারার বেদনা প্রতিদিনই গভীরতর হচ্ছে। একদিকে ক্ষুধার জ্বালা, অন্যদিকে যুদ্ধের বিভীষিকা-এই দুই চেপে ধরেছে ফিলিস্তিনি জনগণকে।
৩৬ বছর বয়সী খালেদ আল-লাহহাম ছিলেন এমনই একজন, যিনি বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয় হিসেবে একটি খাবারের বাক্সের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আল-মাওয়াসির এলাকার এক তাঁবুতে স্ত্রী ও আট সন্তানের সঙ্গে মানবেতর জীবন যাপন করছিলেন তিনি। গত ২৭ মে, প্রথমবার ত্রাণ পাওয়ার অভিজ্ঞতায় খানিক আশাবাদী হয়েছিলেন খালেদ।
❝একটি বাক্সে কিছু চাল, ডাল আর শুকনো খাবার ছিল। মনে হয়েছিল, অন্তত আজ রাতে শিশুদের না খেয়ে ঘুমাতে হবে না,❞ বলছিলেন তিনি।
রোববার (১ জুন) সকালে সেই আশার পিছনে আরেকবার ছুটেছিলেন খালেদ। তবে এবার ভাগ্য তার প্রতি নির্মম। রাফাহর আল-আলম গোলচত্বরে অবস্থিত ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রের কাছে পৌঁছাতেই হঠাৎ চারদিকে গুলির শব্দ। আতঙ্কে গাড়ির দরজা খুলতেই পারেননি তিনি।
❝আমার পায়ের পাশ দিয়ে গুলি চলে যায়। ভয়েই আমি গাড়ি থেকে নামতে পারছিলাম না,❞ স্মৃতিচারণ করছিলেন তিনি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে।
একজন বন্ধু খালেদকে কোনোভাবে হাসপাতালে নিয়ে যান। মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেলেও, ভাঙা স্বরে খালেদ বলেন,
❝আমি কল্পনাও করিনি, এক বাক্স খাবারের জন্য মরতে হবে।❞
এই ঘটনার আরেক করুণ সাক্ষী ১৩ বছর বয়সী ইয়াজান মুসলেহ। খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালের একটি ত্রিপলের তাঁবুতে বিছানায় শুয়ে আছে সে। তার পেট ও হাতে গুলির চিহ্ন, সাদা ব্যান্ডেজ ঢাকা ক্ষতচিহ্ন।
তার বাবা ইহাব বলেন, ❝ভিড় দেখে আমি দুই ছেলেকে একটু দূরে পাঠিয়েছিলাম, নিরাপদ মনে করেই। কিন্তু গুলির আওতায় পড়ে যায় তারাও।❞
ইয়াজানের পাশে বসে থাকা ভাই ইয়াজিদ বলছিল, ❝আমি দেখেছি ওর পেট থেকে নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাচ্ছে। আমি কিছু করতে পারিনি।❞
ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে আহত হয়েছেন আরও অনেকে। তাদের মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ আল-হোমস। তিনি জানান,
❝আমরা বাচ্চাদের জন্য একটু খাবার আনতে গিয়েছিলাম। ওরা গুলি করল-একবার আমার পায়ে, একবার মুখে।❞
গত ৮ দিনে, মার্কিন-সমর্থিত সংস্থা গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) কর্তৃক পরিচালিত ত্রাণকেন্দ্রগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন ১০২ জন ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনি। আহত হয়েছেন আরও এক শতাধিক।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় খাদ্য সহায়তা দিতে যাওয়া মানুষদের নিশানা করাও একধরনের যুদ্ধাপরাধ।
খালেদের প্রশ্ন এখন শুধু ব্যক্তিগত নয়, এক আন্তর্জাতিক যন্ত্রণার প্রতিধ্বনি: ❝আমরা কীভাবে আমাদের সন্তানদের বলব তোমরা শুধু ক্ষুধার্তই নয়, টার্গেটও?❞
ইসরায়েলের সঙ্গে হামাসের সংঘাতে সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অসহায় সাধারণ মানুষ। যারা অস্ত্র বহন করে না, যুদ্ধ চায় না-শুধু একটু খাবার, পানি আর বেঁচে থাকার আশ্রয় খোঁজে। সেই মানুষেরা এখন বারবার প্রমাণ করছেন-বিপন্নতার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তারা কেবল সংখ্যা নয়, বরং একেকটি ভাঙা জীবন আর ছিন্নভিন্ন স্বপ্ন।

 


এ জাতীয় আরো খবর