উপমহাদেশে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত দুই প্রতিবেশী-ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পুরোনো বৈরিতা ফের রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নিয়েছে। সীমান্তে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সংঘর্ষে পাকিস্তানের ১১ সেনা সদস্য ও ৪০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ৭ নারী ও ১৫ শিশু।
মঙ্গলবার (১৩ মে) পাকিস্তানের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য ডন এবং সেনাবাহিনীর মিডিয়া শাখা আইএসপিআরের বরাতে এই হতাহতের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়।
আইএসপিআর জানায়, ভারতের “উসকানিমূলক ও নিন্দনীয় হামলা” ঠেকাতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১১ জন সদস্য। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৭৮ জন। একইসঙ্গে ভারতীয় গোলাবর্ষণে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে প্রাণ হারিয়েছেন ৪০ জন বেসামরিক নাগরিক। হামলার ভয়াবহতায় আহত হয়েছেন আরও ১২১ জন।
নিহত বেসামরিকদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। পাকিস্তান দাবি করছে, ভারত ইচ্ছাকৃতভাবে আবাসিক এলাকা লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ করেছে।
আইএসপিআর জানায়, নিহত সেনাদের মধ্যে রয়েছেন:
নায়েক আবদুর রহমান
ল্যান্স নায়েক দিলাওয়ার খান
ল্যান্স নায়েক ইকরামুল্লাহ
নায়েক ওয়াকার খালিদ
সিপাহি মোহাম্মদ আদিল আকবর
সিপাহি নিসার
এছাড়াও পাকিস্তান বিমান বাহিনীর পাঁচ সদস্য এই হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন:
স্কোয়াড্রন লিডার উসমান ইউসুফ
চিফ টেকনিশিয়ান আওরঙ্গজেব
সিনিয়র টেকনিশিয়ান নাজিব
কর্পোরাল টেকনিশিয়ান ফারুক
সিনিয়র টেকনিশিয়ান মুবারক
এক বিবৃতিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী জানিয়েছে, “এই শহীদদের আত্মত্যাগ আমাদের জন্য চিরন্তন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তাদের সাহস, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেম পাকিস্তানের সামরিক ইতিহাসে অমলিন হয়ে থাকবে।”
আইএসপিআর আরও হুঁশিয়ার করে বলেছে, “পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব বা ভৌগোলিক অখণ্ডতা যদি কেউ চ্যালেঞ্জ করে, তাহলে তার জবাব দেওয়া হবে দ্রুত, সর্বাত্মক ও চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া দিয়ে।”
এ ঘটনায় ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে ভারতের সেনাবাহিনী সম্প্রতি পাকিস্তান-সংলগ্ন অঞ্চলে “সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের” নামে ব্যাপক সেনা মোতায়েন করে রেখেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
কাশ্মীর ইস্যু ঘিরে ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক বহুদিন ধরেই উত্তপ্ত। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তে তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, তবে সম্প্রতি রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সামরিক তৎপরতায় আবারও যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের সংঘর্ষ শুধু সীমান্ত নয়-গোটা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস উভয় দেশকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এই ধরনের সংঘর্ষ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। সংলাপ ও কূটনৈতিক চ্যানেলই একমাত্র পথ।”
সীমান্তবর্তী পাকিস্তানি গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, “আমরা কৃষক মানুষ। রাজনীতি বুঝি না, যুদ্ধ চাই না। কিন্তু গোলা এসে আমাদের ঘরেই পড়ে। আমাদের শিশুদের দাফন করতে হচ্ছে।”
ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত যেন হয়ে উঠেছে রাজনীতির ব্যর্থতার রণক্ষেত্র। উভয় দেশের নেতৃত্ব যখন জাতীয়তাবাদের ঢেউয়ে জনপ্রিয়তা পোক্ত করতে ব্যস্ত, তখন সীমান্তে প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ, সেনা সদস্য ও নিষ্পাপ শিশু।
আন্তর্জাতিক সমাজের জোরালো হস্তক্ষেপ ছাড়া এই রক্তাক্ত চক্র ভাঙবে না-এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকেরা।