নির্বাচনি উন্মাদনায় রঙিন হওয়ার কথা ছিল সেই রাতের। কিন্তু মেক্সিকোর ভেরাক্রুজ রাজ্যের টেক্সিস্টেপেক শহরে রোববারের সন্ধ্যা পরিণত হলো রক্তাক্ত স্মৃতিতে। স্থানীয় সময় রাতের দিকে মেয়র পদপ্রার্থী ইয়েসেনিয়া লারা গুতিয়েরেজের নির্বাচনি শোভাযাত্রায় চালানো সন্ত্রাসী হামলায় তিনি এবং আরও দুইজন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত তিনজন।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পুরো হামলার দৃশ্যই সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছিল প্রার্থী ইয়েসেনিয়ার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে-যা দেখা যায় গোটা মেক্সিকো ও বিশ্বের দর্শকদের চোখের সামনে।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ইয়েসেনিয়া লারা জনসাধারণের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছিলেন,স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে ঘিরে রেখেছেন। হাস্যোজ্জ্বল মুহূর্তে হঠাৎ একের পর এক গুলির শব্দে ভেঙে পড়ে সেই উৎসবমুখর পরিবেশ। আতঙ্কে ছুটতে থাকেন লোকজন। প্রায় ২০টির মতো গুলির শব্দ শোনা যায় ক্যামেরায়।
স্থানীয় সময় রাত প্রায় সাড়ে ৯টার দিকে এই হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে পুলিশ। গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ইয়েসেনিয়া, তার সহযোগী এবং আরও একজন স্থানীয় বাসিন্দা। আহতদের হাসপাতালে নেওয়া হলেও তাদের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।
সোমবার সকালে প্রেস ব্রিফিংয়ে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাউম এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, “এখনও পর্যন্ত হামলার মোটিভ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্ত চলছে এবং কেন্দ্র সরকার ভেরাক্রুজ রাজ্য সরকারকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেবে।”
মেক্সিকোতে নির্বাচনের সময় সহিংসতা নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের দাপটে প্রায়ই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এবারের নির্বাচনি মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০ জন প্রার্থী কিংবা রাজনৈতিক কর্মী সহিংস হামলার শিকার হয়েছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের বিশেষ প্রতিনিধিরা এক বিবৃতিতে বলেন, “রাজনৈতিক মত প্রকাশ এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের মতো সাংবিধানিক অধিকারকে কেন্দ্র করে এভাবে মানুষকে হত্যা করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য এক ভয়ংকর হুমকি।”
এই ঘটনাটি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে কারণ এটি সরাসরি সম্প্রচার হয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরাপত্তার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, “এটি কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়-এটি একটি ভয়ংকর বার্তা, যা লাইভ দেখিয়ে আরও আতঙ্ক ছড়ানো হয়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দারা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদক চক্র ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ যেমন আতঙ্কিত, তেমনি রাজনীতিকরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এ ধরনের সহিংসতার ফলে বহু যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন।
স্থানীয় এক নাগরিক বলেন, “আমরা ভোট দিতে চাই, শান্তিপূর্ণভাবে নেতা বেছে নিতে চাই। কিন্তু এখন রাজনীতি মানেই ভয়।”
প্রসঙ্গত: আগামী মাসে মেক্সিকোতে স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর আগে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় অনেক শহরেই প্রার্থীরা সশস্ত্র নিরাপত্তা নিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। এই প্রেক্ষাপটে টেক্সিস্টেপেকের ঘটনার প্রভাব শুধু একটি শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়বে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।