ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের আঘাতে দেশে ৬ জনের প্রাণহানি
- নিউজ ডেস্ক:
-
২০২১-০৫-২৬ ১২:৪৩:৩৯
- Print
অত্যন্ত প্রবল ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে ভারতের ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গের উপকূল। বুধবার সকালে ১৫৫ কিলোমিটার গতিতে ওড়িশার উপকূলে এটি আছড়ে পড়ে।
ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের তাণ্ডবে ভারতে দু’জন এবং বাংলাদেশে ৬ জন মারা গেছেন। বাংলাদেশের উপকূলীয় ১৪ জেলার বাঁধ ভেঙে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে ফসলের। ভারতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বিশাল আকারের এই ঘূর্ণিঝড় সরাসরি আঘাত না করলেও এর প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের পাশাপাশি পূর্ণিমা ও পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ ছিল। ফলে ভরাকটালের সঙ্গে বায়ুতাড়িত জোয়ার জলোচ্ছ্বাস তৈরি করে। এই জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কায় খুলনা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত উপকূলীয় বিভিন্ন জেলার নিম্নাঞ্চল ভেসে যায়। এতে বেড়িবাঁধগুলো ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে। শত শত গ্রাম তলিয়ে যায়। ভেসে গেছে কয়েক হাজার ঘেরের মাছ। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। নষ্ট হয়েছে উঠতি ফসল। জোয়ারের পানিতে ডুবে ও বিভিন্ন স্থানে গাছ উপড়ে পড়ে ৬ জনের প্রাণহানি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খুলনার কয়রা ও বাগেরহাটের মোংলা। মোট কত ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে বিভিন্ন অঞ্চল সেই তথ্য এখন পর্যন্ত জানা যায়নি।
তবে প্রত্যক্ষদশীরা জানিয়েছেন, সুন্দরবনে গত বছরের ঘূর্ণিঝড় আম্পানের চেয়েও এক ফুট বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস ছিল। আর আবহাওয়া দফতর থেকে পূর্বাভাস ছিল ৩-৬ ফুট উঁচু জোয়ারে ভাসতে পারে উপকূলীয় ১৪ জেলার নিম্নাঞ্চল। বিভিন্ন স্থানে আম-লিচুসহ মৌসুমি ফল ঝরে পড়েছে। ঝড়ের তাণ্ডবে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের জেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের অন্তত ২৪টি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে। রাতে এ রিপোর্ট লেখাকালে দেশের চারটি সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ঘূর্ণিঝড় ইয়াস বাংলাদেশে আঘাত করেনি। এটি ভারতের ওড়িশা উপকূল অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশ এখন সম্পূর্ণরূপে এর প্রভাবমুক্ত। তবে পূর্ণিমার কারণে জোয়ারের পানি বেশি ছিল। এ কারণে অতি জোয়ার বা জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় ৯ জেলার ২৭ উপজেলার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভোলার লালমোহনে গাছচাপায় একজন মারা গেছেন। উপকূলীয় ২৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে।
বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, দুর্ভাগ্য হচ্ছে সকাল সাড়ে ৮টার পরে ইয়াসের অগ্রভাগ উপকূল স্পর্শ করলেও ভূ-ভাগে উঠতে এটি আরও ৩-৪ ঘণ্টা লেগে যায়। সমস্যাটা হয়েছে সেখানেই। মূল আঘাতের সময়ে পূর্ণিমার ভরাকটালও ঘটে। আবার সন্ধ্যায় চন্দ্রগ্রহণের সময়ে সাগর থেকে রাতের ফিরতি জোয়ারের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এসব কারণে দুর্ভোগ বেড়ে যায় উপকূলের বাসিন্দাদের। উপকূলে ৪০-৪৫ স্থানে বাঁধ নানানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কালকে (বৃহস্পতিবার) ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও বের হবে।
তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি হতে পারে তা আগে থেকে জানার পরও যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বালুর বস্তা থাকলেও ফেলা হয়নি বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। এছাড়া বাসিন্দাদের আশ্রয় কেন্দ্রে পাঠানো হয়নি। তবে এবারের এই অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ করে পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ, বাতাসের গতি, বাঁধের অবস্থা ইত্যাদি আমলে নিয়ে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কম হবে। আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির বাস্তবতা আমলে নিয়ে উপকূলের বাঁধ অবশ্যই ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার মতো উপযোগী করতে হবে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) জানিয়েছে, দুপুর ১২টা নাগাদ ইয়াস ভারতের ডামরার (ধরমা) উত্তর এবং বালাসোরের দক্ষিণ দিক দিয়ে ভারতের উত্তর ওড়িশা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূল অতিক্রম শুরু করে। বিকাল ৩টা নাগাদ একই এলাকা অতিক্রম শেষ হয়। পরে আরও দুর্বল হয়ে ‘অতি প্রবল’ ঘূর্ণিঝড়টি ‘প্রবল’ ঘূর্ণিঝড় আকারে উত্তর ওড়িশা ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছিল। উপকূল অতিক্রমকালে অতিপ্রবল এই ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৮৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৩০ কিলোমিটার দমকা বা ঝড়ো হাওয়া আকারে ১৫৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আর প্রবল ঘূর্ণিঝড়টির ৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা গতিবেগ ছিল ৮৯ কিলোমিটার, যা ১১৭ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
বিএমডির আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ইয়াস অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় হিসাবে ভারতের উত্তর ওড়িশায় আঘাত হানে। সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড় আকারে অবস্থান করছিল একই এলাকায়। এটি পরবর্তীতে গভীর নিুচাপে পরিণত হওয়ার কথা। এরপর তা স্থল নিুচাপ, লঘুচাপের পর্যায় পেরিয়ে গুরুত্বহীন হয়ে যাবে। গোটা প্রক্রিয়ায় প্রচুর বৃষ্টি ঝরাবে।
এই আবহাওয়াবিজ্ঞানী বলেন, ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের প্রধান আক্রমণ থাকে অগ্রভাগ পৌঁছার আগে ও স্থলভাগে উঠে যাওয়ার পরে। ইয়াসের কারণে বাংলাদেশে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ রেকর্ড করা হয় মঙ্গলবার মোংলায় ৫৯ কিলোমিটার।
বিশেষজ্ঞরা জানান, পূর্ণিমার প্রভাবে বুধবার সকাল বাংলাদেশ সময় পৌনে ১০টায় শুরু হয় জোয়ার। আর ১২টার পর এটি সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায়। সাধারণত ভরাকটালে জোয়ার চলাকালীন ২-৪ ফুট উচ্চতায় পানি থাকে। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে তা ৩-৬ ফুট উঁচু ছিল। অন্য দিকে বুধবার বিকাল ৫টা ৭ মিনিটে বাংলাদেশ থেকে পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ হওয়ার কথা, যা চলে রাত প্রায় ৮টা পর্যন্ত। ২০২১ সালে এটিই প্রথম ও শেষ ‘ব্লাড মুন’ ছিল।