সোমবার, জুলাই ১৩, ২০২৬

কুড়িগ্রামের সাবেক ডিসি নুসরাত সুলতানা এখন যুগ্মসচিব-অভিনন্দনে ভাসাচ্ছেন কুড়িগ্রামবাসী

  • আহম্মেদুল কবির, কুড়িগ্রাম:
  • ২০২৬-০৭-১২ ১৬:০৪:২৯

কুড়িগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক(ডিসি) নুসরাত সুলতানা পদোন্নতি পেয়ে যুগ্মসচিব হয়েছেন। এ খবর জেলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে অভিনন্দন, শুভেচ্ছা আর শুভকামনায় ভাসাচ্ছেন কুড়িগ্রামের সর্বস্তরের মানুষজন। কুড়িগ্রামের সাবেক ডিসি নুসরাত সুলতানা ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামে যোগদান করে প্রায় ১ বছর ১ মাস কুড়িগ্রামে অবস্থান করেন। তিনি ৩০ আগস্ট' ২০২৫ইং চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার হয়ে বদলি হয়ে চলে যান। সেখান অবস্থান কালে গত ৯ জুলাই সরকারি এক আদেশে পদোন্নতি পেয়ে যুগ্মসচিব হয়েছেন।
আজ ১২জুলাই রবিবার সকালে কুড়িগ্রাম উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, "কুড়িগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক নুসরাত সুলতানার মূল লক্ষ্যই ছিল কুড়িগ্রামকে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা। চরাঞ্চলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংকটের পাশাপাশি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে তিনি ব্যাপক কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন চরের উন্নয়ন ছাড়া কুড়িগ্রামের উন্নয়ন সম্ভব নয়।"
কুড়িগ্রাম ​জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বলেন," কুড়িগ্রামের সাবেক ডিসি নুসরাত সুলতানা কুড়িগ্রামের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে বেশ কিছু দূরদর্শী মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে:​ ডিসি পার্ক নির্মাণ, চরের মানুষের স্থায়ী দুঃখ দূর করতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আদলে একটি স্বাধীন ‘চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠনের জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে ঐতিহাসিক প্রস্তাব উত্থাপন। যা দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে এক দূরদর্শী ও অনন্য নজির। মূলতঃ তিনি কুড়িগ্রাম জেলার উন্নয়নে এক ঝাটিকা অভিযান শুরু করেছিলেন।"
কুড়িগ্রামের সিনিয়র সাংবাদিক আহম্মেদুল কবির বলেন," তপ্ত বালুচরে হঠাৎ বৃষ্টিতে ঝিমিয়ে পড়া তরুলতা যেমন প্রাণ পায়, তেমনি বালুচরের আশেপাশে বসবাসরত মানুষের জীবন ও জীবীকায় ফিরে আসে প্রাণচাঞ্চল্য। কৃষকের মুচকি হাসি দেখে হাড্ডিসার কৃষাণীর মনেও আনন্দ জাগে, স্বপ্নবুনে।  অতিবৃষ্টি, ভাড়ি বৃষ্টি, কখনও কখনও পাহাড়ি ঢলে সেই স্বপ্ন এক নিমিষেই কান্নার পাহাড় হয়ে ফিরে আসে দূর্যোগ নামের এক ভয়াবহ আর্তনাদে। কেউ হারায় ঘর, কেউ বাড়ি, কেউবা পৈতৃক ভিটে মাটি হারিয়ে চেয়ে থাকে আকাশপানে। কোন অভিযোগ নেই, নেই কোন অনুযোগ। আর এভাবেই কুড়িগ্রাম জেলার ১৬টি নদ-নদী পরিবেষ্টিত প্রায় সাড়ে ৪শত চরাঞ্চলের ৫ লক্ষ মানুষ যুগের পর যুগ খরা, বন্যা ও নদী ভাঙনের স্বীকার হয়ে যাযাবরের মতো জীবন যাপন করে আসছেন প্রতিনিয়ত। এরি মধ্যে ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জ্বলে- পুড়ে খা হয়ে যাওয়া কুড়িগ্রামের মানুষের জন্য হঠাৎ বৃষ্টির মতো আশির্বাদ হয়ে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে যোগদান করেন নুসরাত সুলতানা। খুব সাদাসিধা, হাস্যউজ্জ্বল এবং স্মার্ট একজন সরকারি কর্মকর্তা, কোন অহংকার নেই, নেই কোন জৌলুশ আচরণ। কে তাঁকে স্যার বললো- না ম্যাডাম বললো- সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপেই ছিলো না তাঁর। মাত্র ১ বছর কাজের মাধ্যমে দেখিয়ে দিলেন স্বদিচ্ছা থাকলে কীভাবে মানুষের কাছে আসা যায়, আপন হওয়া যায়, মানবিক হয়ে ওঠা যায়।"
কুড়িগ্রামের সাবেক ডিসি নুসরাত সুলতানা যুগ্মসচিব পদোন্নতি পেয়েছেন, এ খবর কুড়িগ্রামের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্টে উঠে এসেছে কুড়িগ্রামের মানুষের জন্য তাঁর ভালোবাসার গল্প, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নের গল্প। বিশেষ করে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষজন তাদের ডিসি নুসরাত সুলতানাকে আপন করে নিয়েছিলো এক নিমিষেই। এজন্য চরের মুরব্বিরা তাঁকে 'মা'- নামেই ডাকতে শুরু করে দিয়েছিলেন। 
তারা জানান, "ডিসি নুসরাত সুলতানা পায়ে হেঁটে, কখনো নৌকায়, কখনো ঘোড়ার গাড়িতে, কখনো মোটর বাইকে মাইলের পর মাইল জেলার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন মানুষের দুঃখ- দূর্দশা দেখার জন্য। দারিদ্র্যের কষাঘাতে নিষ্পেষিত কুড়িগ্রাম জেলাকে আর যাতে কেউ মঙ্গার জেলা বলতে না পারে এজন্য তিনি একের পর এক উন্নয়ন পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন। আজ তাঁর পদোন্নতির কথা শুনে আমরা আবেগ আপ্লুত। আমরা মনে করি যোগ্য মানুষের মূল্যায়ন হয়েছে। তিনি যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন।"- এমন প্রত্যাশা করেন তারা।
জানা যায়, কুড়িগ্রামের সাবেক ডিসি নুসরাত সুলতানা কুড়িগ্রামের উন্নয়নের জন্য প্রথমে তিনি গ্রামীণ জনপদে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আর্থিক স্বচ্ছতার এক মহাপরিকল্পনা গ্রহন করে বিভিন্ন সভা সেমিনারে তা প্রকাশ করতে শুরু করেন এবং সেই মোতাবেক সরকারের নীতি নির্ধারক মন্ত্রণালয়ে করনীয় নিজস্ব প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। ফলশ্রুতিতে কুড়িগ্রামে তাঁর সময়কালে গ্রামীণ পর্যায়ে বেশকিছু ব্রিজ, কালভার্ট এবং বিশেষ করে আর্থিক স্বাবলম্বী করতে নারীদের বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, যুবদের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, প্রতিবন্ধীদের সামাজিক সুযোগ সুবিধায় অন্তর্ভুক্তি করণ,
উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ এবং বন্যার সময় চরের শিশু ও প্রবীণদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য নানামুখী টেকসই পরিকল্পনা ও তা দ্রুততার সাথে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। তাঁর উন্নয়ন পরিকল্পনায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ ছিলো- তিনি যখন দেখলেন, কুড়িগ্রামে মানুষের বিনোদনের জন্য কিছুই নেই। বিষয়টি তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। এজন্য তিনি কুড়িগ্রাম ধরলা ব্রিজ সংলগ্ন প্রস্তাবিত 'ডিসি পার্ক' নির্মাণে সমর্থন জানান এবং পার্কটি যাতে দ্রুতগতিতে নির্মান হয় এজন্য পরিকল্পনা গ্রহন ও বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেন। এছাড়া সোনাহাট স্থলবন্দর থেকে ভূরুঙ্গামারী- নাগেশ্বরী- কুড়িগ্রাম- চিলমারী - গাইবান্ধা- ঢাকা পর্যন্ত রেললাইনের এক মহাপরিকল্পনা গ্রহন করেন। যার সুফল কুড়িগ্রামবাসী ইতোমধ্যে পেতে শুরু করেছে।
আজ ধরলা ব্রিজ পাড়ে ডিসি পার্ক নিরমাণে ৩০ কোটি টাকার বালু ভরাট কাজ আর প্রায় দেড় কোটি টাকা সরকারের কাছ থেকে নিয়ে আসায় স্বপ্নের প্রস্তাবিত 'ডিসি পার্ক' নির্মাণ কাজ দৃশ্যত হচ্ছে। এছাড়া কুড়িগ্রাম সদরের ধরলা ব্রিজ সংলগ্ন ভুটানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ দ্রুত চালুকরণ এবং সোনাহাট স্থলবন্দর আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেন তিনি। এই উন্নয়ন কাজ দুটিও অগ্রগামী হচ্ছে।
অপরদিকে নৌপথ সচল রাখতে ধরলা নদী ড্রেজিংয়ের কাজ তার সময়েই শুরু হয়। ব্রহ্মপুত্র নদকে শাসন করে জেলার রৌমারী ও রাজীবপুর দুই উপজেলাকে জেলা শহরের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার মহাপরিকল্পনা তাঁর সময়কালেই মানুষ শুনেছে। এছাড়া তিনি চরাঞ্চলের মানুষের কথা চিন্তা করে সরকারের কাছে "চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়" গঠনের যে ঐতিহাসিক দাবি তুলেছিলেন, সেটি দেশের ইতিহাসে এক অনন্য নজির! এ দাবি বাস্তবায়ন হলে শুধু কুড়িগ্রাম জেলাই নয় বদলে যাবে সমগ্র উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য।
একজন জেলা প্রশাসকের এমন কর্মযজ্ঞ কুড়িগ্রামের মানুষ কখনো দেখেনি। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তিনি কুড়িগ্রাম জেলার মানুষের প্রিয় হয়ে ওঠেন। অনেককে বলতে শোনা যায়, কুড়িগ্রামের সাবেক ডিসি নুসরাত সুলতান এসেছিলেন কুড়িগ্রামের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের আলোক বর্তিকা স্বরুপ।
শোনা যায় কুড়িগ্রামের অভাবগ্রস্থ মানুষকে বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধাভোগী বানিয়ে বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠানের ভাউচার বানিজ্যের খোঁজ খবর করতে গিয়ে কোন এক অজানা শক্তির ইশারায় তাঁকে পদোন্নতি দিয়ে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়েছে।
কুড়িগ্রামবাসী তাদের ডিসি নুসরাত সুলতানাকে  আটকাতে পারেনি। নিয়মের শৃঙ্খলে আজ তিনি বহুদূরে। তিনি এখন যুগ্মসচিব হয়েছেন। তাই কুড়িগ্রামবাসীর ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় এখন তিনি খবরের শিরোনামে, ফেসবুকের পাতায় - পাতায় অভিনন্দন, শুভেচ্ছা ও শুভকামনায় ভাসছেন।

 


এ জাতীয় আরো খবর