৩১ মে ২০২৫,ঢাকা।
তামাক-কেবল একটি নেশা নয়, এটি আজ এক মারাত্মক নীরব ঘাতক। নিঃশব্দে ধ্বংস করছে আমাদের শরীর, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। একসময় যেটি অভ্যাস বলে চালানো হতো, আজ সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি ও আর্থিক বিপর্যয়ের অন্যতম উৎস।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহুদিন ধরে হৃদরোগ, ফুসফুস ক্যানসার ও শ্বাসযন্ত্রের জটিলতার জন্য তামাককে দায়ী করে এলেও, সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নতুন এক ভয়ংকর দিক উঠে এসেছে-তামাক ধোঁয়া কিডনির পক্ষেও বিষসম।
যুক্তরাজ্যের ‘কিডনি রিসার্চ ইউকে’ জানাচ্ছে, ধূমপান কিডনির রক্তনালীগুলোর কার্যক্ষমতা নষ্ট করে, রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ন্যাচার-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ধূমপানকারীদের কিডনি ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা হারায়। ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ যাদের আছে, তাদের কিডনি দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেশি।
তবে আশার আলো একটাই-ধূমপান ছাড়লে কিডনি নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘ডা. ভিটার’ হেলথ সার্ভিস জানায়, ধূমপান বন্ধের এক বছরের মধ্যেই কিডনির রক্তপ্রবাহ বাড়তে শুরু করে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসে।
এ বছর বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসের প্রতিপাদ্য-‘তামাক কোম্পানির কূটকৌশল উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনমুক্ত বাংলাদেশ গড়ি’-এক যুগোপযোগী ও জাগরণমূলক বার্তা।
জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল (এনটিসিসি) সূত্রে জানা গেছে, দিবসটি উপলক্ষে দেশের ৬৪টি জেলায় র্যালি, পোস্টার ক্যাম্পেইন, গণমাধ্যম প্রচারণা ও সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ডা. শাহ নেওয়াজ, এনটিসিসির প্রোগ্রাম ম্যানেজার, বলেন, “বাচ্চাদের স্কুলের পাশেই ফ্লেভার্ড ই-সিগারেট বিক্রি করছে তামাক কোম্পানিগুলো। এটি আইনের চরম লঙ্ঘন।” তাঁর মতে, এসব কোম্পানি অত্যাধুনিক বিজ্ঞাপন, রঙিন প্যাকেট, কর ফাঁকি ও নিত্য নতুন ধোঁয়া নির্গত পণ্যের মাধ্যমে তরুণদের নিশানায় নিচ্ছে।
গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোবাকো সার্ভে (GATS) ২০১৭ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ৩৫.৩% প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি তামাকজাত পণ্য ব্যবহার করেন।
এর মধ্যে ধূমপায়ী প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ এবং বাকিরা ব্যবহার করেন জর্দা, গুল বা খয়েরের মতো ধোঁয়াবিহীন তামাক।
প্রতি বছর তামাকজনিত রোগে মৃত্যুবরণ করেন ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ।
এ ছাড়া সরাসরি ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়, যার বেশিরভাগই পড়ে স্বাস্থ্যখাতের ওপর।
জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের প্রধান সমন্বয়কারী ডা. সৈয়দ মাহফুজুল হক জানান, “তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ, পণ্যের প্রদর্শন নিষিদ্ধ ও কর কাঠামো আরও কঠোর করার বিধান থাকছে।”
তবে বাস্তবে আইন প্রয়োগে চরম দুর্বলতা। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, স্থানীয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা এবং তামাক কোম্পানিগুলোর প্রভাব বলয় এই উদ্যোগকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে।
স্বাস্থ্য আন্দোলনের নেত্রী ডা. রাশেদা বেগম স্পষ্ট করে বলেন, “আজকের যে শিশুটি রঙিন মোড়কের ই-সিগারেট হাতে নিচ্ছে, কালকেই সে ক্যানসারের রোগী হয়ে উঠতে পারে। এটা শুধু স্বাস্থ্য নয়, বরং সামাজিক ও নৈতিক সংকটও বটে।”
তামাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আজ আর কেবল চিকিৎসা পেশার একক যুদ্ধ নয়-এটি প্রতিটি সচেতন নাগরিকের সামাজিক দায়িত্ব।
তামাক শুধু জীবন কেড়ে নেয় না, সমাজের প্রাণশক্তিকেই নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
সেই দায়েই এবার সময় এসেছে-কথায় নয়, কর্মে দেখানোর।