একটা নির্জন এলাকায় ভুতুরে পুকুর।যেখানে খুব একটা মানুষের আনাগোনা নেই।চারপাশে শুধু ধান ক্ষেত আর পুকুরের চারদিকে নানান রকম গাছ - গাছালিতে ভরা।পুকুরের পানি সব সময় কচুরিপনা ও শ্যাওলায় ঢাকা থাকে বলে গাছের পাতা পড়ে পড়ে পুকুরটা ব্যবহারে অনুপযোগী হয়ে উঠেছে।।কাছাকাছি কোন ঘর-বাড়ি না থাকায় এদিকে মানুষের তেমন কোন আনাগোনা নেই।গাছপালা ভেদ করে সূর্য়ের আলো পুকুরে পড়ে'না বললেই চলে।তাই পুকুরের পানিগুলো কালো ও স্যাঁতস্যাঁতে।কিন্তু একদিন এই পুকুরে সত্যি সত্যি ঘটে গেল এক অস্বাভিক ভূতুরে ঘটনা।তখন ভর দুপুর বেলা,মাঝ বয়সি দুই যুবক আসল এই পুকুরে গোসল করতে।তাদের একজন এসে পুকুরের পাড়ে বসে পানিতে ঢিল ছুড়ছে আর অন্যজন ঘাটের শেষ সিঁড়িতে বসে কাপড়ে সাবান ঘষতে ঘষতে পাড়ে বসা বন্ধুর সাথে কথা বলছে(যে বন্ধু পাড়ে বসে আছে সে এনাম আর যে কাপড়ে সাবান ঘষছে সে অনিক।) এমন সময় পুকুরের মাঝ থেকে কেউ একজন উঠে এসে অনিকের পাশে বসে তর্ক করছে।কি অদ্ভুত ভয়ংকর চেহারা!এনাম দেখে তখনই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ।এদিকে পানি থেকে উঠে আসা সেই ভয়ংকর মানুষটা অনিকের সাথে কি একটা বিষয় নিয়ে বাক-বিতন্ডে জড়িয়ে গেল এবং অনিককে তার সাথে করে পানির নিচে নিয়ে গেল।অনিক সেই যে গেল আর ফিরে এলনা।এভাবে কত সময় পেরিয়ে গেল এনাম তার কিছুই জানেনা। তার যখন জ্ঞান ফিরে এলো তখন সে দেখে আসর গড়িয়ে সন্ধ্যা হয় হয় অবস্থা।অনিকের সব কিছু পুকুরের পাড়ে পড়ে আছে।সে ভয়ে ভয়ে চোখ বন্ধ করে বাড়ির পথে দৌড় দিল ।ঘটে যাওয়া এই অদ্ভুত ঘটনার সে এক বোবা স্বাক্ষী হয়ে রয়ে গেল।বাড়ি এসে দেখে তার জন্য সবাই চিন্তিত হয়ে বাড়ির উঠানে বসে আছে।(এনামের বাড়িতে মা ও ছোট বোন থাকে। এনাম মাত্র কলেজ পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হবে।বাবা ও সে শহরে থাকে।বাবা বেসরকারি চাকরি করে আর সে পড়াশোনা করে।পরীক্ষা শেষ করে কিছু দিন আগে বেড়াতে এসেছে।)। তাকে দেখে সবাই অবাক!মা ও বোন ছুটে গেল তাকে ধরতে। কিন্তু সে ভয়ে দৌড়ে তার রুমে ঢুকে গেল এবং বিছানায় শুয়ে পড়ল।তারা তাকে অনেক ডাকাডাকি করেও তার কোন সারা পেলনা। সকালে ঘুম ভাঙ্গতেই অনিক দেখে তার মা ও বোন বসে মাথায় জল পট্টি দিচ্ছে আর বিছানার পাশে থাকা টেবিলে রাতের খাবার।বোন বলল, কিরে ভাই হঠাৎ এমন জ্বর বাঁধালি কি করে?আমরা দুজন সারা রাত তোর জন্য ঘুমাতে পারিনি।মা বলল, হ্যা রে কোথায় গিয়েছিলি কাল?আর অনিককে ও নাকি পাওয়া যাচ্ছে না! তুই জানিস কিছু ও কোথায় গেছে?তুই আসলে তোর সাথেই তো থাকে ছেলেটা।মা একথা বলে দুপুরের রান্নার ব্যবস্থা করতে গেল।(মা রেনুকা বেগম তেমন পড়াশোনা করেন নি।স্কুলের গন্ডি পেরুতে না পেরুতে বিয়ে হয়ে যায়।আর বোন রুবাইয়া মাত্র দশম শ্রেণীতে পড়ে।)রুবাইয়া একটা গামছা ভিজিয়ে এনামকে দিয়ে বলে, "নে শরীরটা এই গামছা দিয়ে মুছে নে।ভালো লাগবে আর জ্বর ও কমে যাবে।"এনাম গামছা নিয়ে জামা খুলে যেই শরীর মুছতে যাবে তখন দেখে তার শরীরে বড় বড় অসংখ্য আঁচরের দাগ।রুবাইয়া ও বিষয়টা লক্ষ্য করে তাকে বলে,ভাই তোর শরীরে এত কাঁটা দাগ হলো কি করে?তুই কি কারও সাথে মারামারি করেছিলি?এনাম তাকে ধমক দিয়ে বলে, আরে না কার সাথে মারামারি করবো।তুই যাতো এখান থেকে। আমি একটু একা থাকবো।যাই, "তুই শরীর মুছে আমার গামছাটা দে। আর তোর খাবার খেয়ে এই থালা বাটিগুলো আমাকে দিয়ে উদ্বার কর।" কথা শেষ হতে না হতেই সে, শরীর মুছে জামা পড়ে তারাতাড়ি খাবার খেয়ে বোনকে রুম থেকে বের করে রুমের দরজা বন্ধ করে দেয়।রুমে নিজেকে দেখার জন্য একটা আয়না ছিল।এনাম আবার তার গায়ের জামা খুলে নিজেকে দেখে নিজেই অবাক হয়ে গেল।আর মনে মনে ভাবে শরীরে এত কাঁটা দাগ হলো কিভাবে?সে জল থেকে উঠে আসা এই অদ্ভূত মানুষটাকে দেখার পর থেকে কিছুই আর মনে করতে পারছেনা।এনাম জামা কাপড় পড়ে দরজা খুলে বাহিরে এসে দেখে মা ও বোন রান্না করছে।মা তাকে বের হতে দেখে বলে, কোথায় যাস? কাল সারা রাত জ্বরের জন্য একটুও ঘুমাতে পারিসনি।রুবাইয়া আবার বলে, তোর সারা শরীরে কিসের কাঁটা দাগ।এনাম তাদের কথার কোন জবাব না দিয়ে শুধু বলে, সামনে থেকে একটু ঘুরে আসি।ভালো লাগছেনা।সে কালকে ঘটে যাওয়া কষ্টের কথা কাউকে বলতে পাড়ছেনা।কারণ, এক হচ্ছে পুলিশের ভয় আর দুই হচ্ছে কথাগুলো সবাই জানবে এবং জানলে যদি তার সাথেও এমন কিছু ঘটে।যাক সে কাউকে কিছু না বলে একা একা আবার সেই ভূতুরে পুকুরের কাছে গিয়ে পুকুর পাড়ে বসে।দেখে এখনও সেখানে অনিকের জামা কাপড়, সাবান পড়ে আছে।শুধু অনিক নেই।একথা ভাবতে ভাবতে তার দুচোখে জল চলে আসে।অনিকের জন্য তার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে।কিন্তু পারছেনা ভয় ও সংঙ্কা সব এক সাথে এসে জমা হয়ে আছে।অবচেতন মনে অনিকের পোশাকগুলো বুকে জড়িয়ে কাঁদতে শুরু করলো।কিন্তু মুখ থেকে কোন শব্দ বের হচ্ছে না।হঠাৎ চোখ পড়লো পুকুরের ঘাটলার অন্যপাড়ে শ্যাওলার ভেতরে একটা হাত ভাসছে! ভয়ে আবার এনাম ছুটতে ছুটতে বাড়ি চলে আসে।ধান ক্ষেতের ভেতর দিয়ে ছুটে আসাতে তার শরীরে কাঁদায় মাখামাখি অবস্থা।এবার আর কারও চোখ এড়াতে পারলো না।গায়ে এমন কাঁদা মাখামাখি দেখে রুবাইয়া বলল, কিরে তোর এই অবস্থা কেনো?বলল, ধান ক্ষেতের ভেতর দিয়ে দৌড়াতে গিয়ে পড়ে এই অবস্থা।মা শুনে বলল, কাল সারারাত জ্বরের জন্য ঘুমাতে পারিসনি এখন আবার দৌড়া দৌড়ি করতে গেলি কেন?শুনে রুবাইয়া বলে, ‘‘ও তোমার ছেলে ঘুমাতে পারেনি, আমরা খুব ঘুমিয়ে ছিলাম! সারারাত সে চিৎকার, চেঁচামেচি করলো, মাথায় জলপট্টি দিলাম তার কিছু না!"মা ওরে থামিয়ে দিয়ে বলে, হ্যা রে অনিকের কোন খোঁজ জানিস?ওর সাথে তোর কোথাও দেখা হয়েছে?তুই এলেতো ও তোর সাথেই থাকে?কোথায় যে গেলো ছেলেটা!অনেক ভালো ছিলো'রে।এনাম মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে বলে, দূরে কোথাও গিয়ে হারিয়ে যায় নিতো?ওতো সব সময় বড় রাস্তায় যেতো।সে কি কথা !আমায় তো কখনও বলিসনি এ কথা।আল্লাহই জানেন কই আছে ছেলেটা।রুবাইয়া তখন একটু দূরে ছিল।সে শুনতে না পেয়ে বলল,কে কই গেছে মা?মা বলল, আরে কে আবার আমাদের উত্তর বাড়ির অনিক।(এনামদের বাড়ির উত্তরের দিকে একটা বাগান আছে।সে বাগানের পরেই অনিকের বাড়ি।ওরা সকলেই ঐ বাগানকে উত্তরের বাগান বলে।আর অনিকরা দুই ভাই এক বোন।দুই ভাইয়ের মধ্যে অনিক ছোট আর বোন মেজো।অনিকের বড় ভাই আসিক ব্যবসা করে।আর বোন কলেজে পড়ে।সামনের বার এইচ এস সি পরীক্ষা দেবে আর অনিক এবার এস এস সি পরীক্ষা দেবে।তাদের বাবা নেই।)এনাম ওদের কথা না শুনে তার রুমের দিকে চলে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয় আর পোশাক পরিবর্তন করে বিছানায় শুয়ে শুয়ে অঝোরে কাঁদতে লাগলো।এমন সময় তার মা দরজায় টোকা দিয়ে ডাকলো।অনিকের সব কিছু জানা সত্বেও এনাম পুলিশের ভয়ে কাউকে কিছু বলেনা।শুনে সবাই যদি ওকে দোষ দেয়।এদিকে মা অনবরত দরজায় শব্দ করে চলেছে।দরজা খুলতেই মা কাছে এসে বলে, কিরে দরজা খুলতে এত সময় লাগলো কেনো,কি করছিলি?সে বলল, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মা তার দিকে তাকিয়ে বলল, তোর চোখ ভেজা কেনো?কি হয়েছে বলতো? দুদিন ধরে তোর কোন কিছু স্বাভাবিক মনে হচ্ছেনা।তুই কি কোন কিছু নিয়ে চিন্তিত বা ভীত?তোকে বলতেই হবে তোর কি হয়েছে? বল আমাকে।না বললে দেখা যাবে আরও সমস্যা হবে।মার কথা শেষ হতে না হতেই এনাম কেদেঁ দেয় এবং সব কথা মাকে খুলে বলে।মা ওর কথা শুনে কি বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না।সে রুম থেকে বের হয়ে অনিকের মাকে ফোন করে দ্রুত বাসায় আসতে বলে।তার ফোন পাওয়ার দশ মিনিটের মধ্যেই অনিকের মা ও ভাই দৌড়ে চলে আসে।এসে এনামের মায়ের সাথে কথা বলে, এনামকে ডেকে তাদের কাছে আনে।এনাম তাদের কাছে বসে "মনে মনে ভাবে অনিকের মা ও ভাই কি আমাকে সন্দেহ করছে।আমাকে যাই ভাবুক আমার সত্যটাই বলা উচিত।" তারা কাঁদতে কাঁদতে সত্যি কথাটা এনামের কাছে জানতে চায়।এনাম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা।সেও তো অনিককে অনেক ভালোবাসে।সে তাদের সব সত্য কথা বলে দেয়।শুনে সবাই ছুটতে ছুটতে সেই ভূতুরে পুকুরের দিকে চলে যায়।তাদের এভাবে ছুটতে দেখে বাড়ির এবং গ্রামের লোকজন এসে তাদের সাথে যোগ দেয়।তারা সকলে পুকুরের কাছে গিয়ে দেখে সত্যি সত্যি অনিকের নিথর দেহ অর্ধেকটা পুকুরের জলে ভাসছে।এরই মধ্যে এনামের বাবাকেও ফোনে সব কথা জানানো হয়েছে।গ্রামের কেউ একজন থানতেও খবর দেয়।থানা থেকে পুলিশ এসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত দশটা বেজে গেছে।সবাই অনিকের নিথর দেহটা পুলিশ ভ্যানে তুলে দিলো।পুরো গ্রাম শুদ্ধ সবাই কাদঁছে।এনাম, অনিকের ভাই ও মা সহ সবাই পুলিশ ভ্যানে উঠে বসে।সাথে অনিকের যা যা সেখানে ছিল সবকিছুই নিয়ে গেল থানায়। তারা পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত দুইটা বেজে গেছে।এরই মধ্যে এনামের বাবাও ঢাকা থেকে থানায় চলে এসেছে ।রাতে তারা সবাই বড় বাবুর পিরাপিড়িতে রুটি -কলা খেল।সবাই খুব কান্নাকাটি করছে।তাই থানার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে।।অনিককে লাশ কাটা ঘরে নেওয়া হয়েছে।অনিকের নামে থানায় একটি অপমৃত্যুর ডায়েরি করা হয়েছে।থানার সকল কাজ সম্পূন্ন করতে সকাল এগারোটা বেজে গেছে।থানার বড়বাবু এসে বললেন, আপনারা এখন যেতে পারেন।আমরা আপনাদেরকে আবার প্রয়োজন হলে ডেকে পাঠাবো।লাশ ও নিয়ে যেতে পারেন।আমরা কারও বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ দায়ের করিনি।তাই এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হয়েছে।সবাই একসাথে অনিকের লাশ নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলো।তারা বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেল।রাত দশটায় অনিকের জানাজা শেষ করে কবর দেওয়া হলো।পুরো গ্রামে একটা শোকের ছায়া নেমে এসেছে।গ্রামের সকলের চোখ ভেঁজা অশ্রু সিক্ত, কারও মুখে কোনও ভাষা নেই।অনিকের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুতে পুরো গ্রাম যেন স্তদ্ধ। গ্রামের অনেকের মন্তব্য "এই ভূতুরে পুকুরটা ভরাট করে ফেলা উচিত।"আবার অনেকে বলে, "ভরাট না করে পুকুর ব্যবহার উপযোগী করে তুললে সব থেকে ভালো হয়।"এভাবে যে যার মত মন্তব্য করে যাচ্ছে।অনিককে কবর দেওয়ার পরের দিন এনাম একা একা আবার সেই ভূতুরে পুকুরের কাছে গেল....