স ন্তু সা হা

  • গুণধর
  • ২০২৪-১১-০৯ ০৯:৪৬:৩৭
image

রান্নাঘরে জল খেতে ঢুকেছিলাম। ডাইনিং থেকে বউয়ের বাজখাঁই গলায় অর্ডার এলো।
---বলি কথা কানে যাচ্ছে?
---যাচ্ছে।
---নুনের কৌটোটা এনে দাও তো।
---কোথায় আছে?
---যেখানে থাকে।
---কোথায় থাকে?
---আমার মাথার উপর।
মাথার উপর যখন রেখেছ তখন আমায় ডাকা কেন? হাত দিয়ে নামাতে অসুবিধা হলে মাথা ঝুঁকালেই তো টেবিলে ঠকাস করে পড়বে। কথাগুলো মনে মনে আউড়ালাম কিন্তু বলতে পারলাম না। 
 অনেক খোঁজাখুঁজি করে যখন পেলাম না...
--- পাচ্ছি না তো।
---চকার মত না খুঁজে ভালো করে দেখো, ঠিক পাবে। স্ল্যাবের উপরই রাখা আছে।
 কেউ আমাকে চকা বললে ফাটা গোড়ালি থেকে তেল চিকচিকে ব্রহ্মতালু অবধি চিড়বির করে জ্বলে ওঠে।  সটান বলে ফেললাম, জ্ঞান না দিয়ে নিজে দেখে যাও। স্ল্যাবের উপর কোন কৌটো নেই। নিজে কোথায় রাখবে মনে করতে পারবে না আবার আমাকে চকা বলা হবে। 
 এই শুনে বউ হ্যারিকেন বেগে ডাইনিং থেকে ময়দা-মাখা হাতে রান্নাঘরে ঢুকে, চিলের মত ছোঁ মেরে চোখের সামনে থেকে নুনের কৌটো নিয়ে চলে গেল। আমি সুচিত্রা সেনের মত ঈষৎ ঘাড় বেঁকিয়ে বৌয়ের তড়িৎ গতিবেগে রান্নাঘরে প্রবেশ, আর ততোধিক গতিবেগে প্রস্থান প্রত্যক্ষ করলাম। কিছুক্ষণ ভ্যাবলার মত রান্নাঘরের স্ল্যাবের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই বাইরে থেকে আওয়াজ এলো, ঢের ঢের চকা দেখেছি কিন্তু এমন নির্লজ্জ চকা বাপের জন্মে দেখিনি।
   যারা যারা এই 'চকা' শব্দের সাথে পরিচিত নন তাদেরকে বলছি এটা আসলে 'কানা' বিশেষণের আল্ট্রা প্রো ভার্সন। 'কানা' সম্বোধনের মধ্যে যদিওবা একটু সম্মান অবশিষ্ট থাকে কিন্তু 'চকা' কথাটা শুনলে কেমন একটা অবজ্ঞাসূচক ভদ্র গালি মনে হয়। 
 বিশদভাবে ব্যাখ্যা করলে চকা মানে হল, যদি আপনার প্রয়োজনীয় জিনিসটি আপনার সম্মুখে থাকে অথচ আপনি সেই জিনিসটি বাদ দিয়ে বাকি সব জিনিসই দেখতে পান তাহলে নির্দ্বিধায় বলা যায় আপনি একজন চকা পাবলিক। আর এই বিশেষ গুনটিকে বলা হয় চকামো। না, এটা কোন চোখের সমস্যা নয়। এখনো পর্যন্ত এর কোন ওষুধ বের হয়নি।  একবার এই রোগে আক্রান্ত হলে আপনি তো কারো সহানুভূতি পাবেনই না, উল্টে প্রতি পদে পদে কাছের মানুষগুলো আপনার ব্যক্তিত্ব নিয়ে ফুটবল খেলবে।
    গত লকডাউনে বাড়িতে বসে নিউটনের মত অনেক ভেবে চিন্তে চকামো দূর করার একটা ভৌত পদ্ধতি বের করেছি। এর নাম দিয়েছি, "ধরো আর ফ্যালো"। 
  বাথরুম থেকে বউ বলল, আলনা থেকে আমার সবুজ নাইটিটা নিয়ে এসো তো। আমি আলনা তন্ন  তন্ন করে খুঁজে সবুজ নাইটি পেলাম না। ব্যাপারটা জানাতে বউ রেগে বলল, চকামো না করে একটু ভালো করে দেখ, ঠিক পেয়ে যাবে। 
 ফিরে এসে "ধরো আর ফ্যালো" পদ্ধতি ট্রাই করতে লাগলাম।  আলনা থেকে একটা একটা জিনিস ধরলাম আর নীচে ফেললাম। অবশেষে পেলাম। চোখের সামনেই ছিল। 
 সময়সাপেক্ষ পদ্ধতি কিন্তু কাজে আসছে। 
  আমার দ্বিতীয় চারিত্রিক গুন হল কুঁড়েমি। ওটা নিয়ে খুব একটা ভাবি না। কারণ অনেকেই ওই গোত্রে বিলং করে। যদিও নাম পাল্টে কুঁড়েমি এখন হয়েছে ল্যাদামি। আর কুঁড়ে হয়ে গেছে ল্যাদখোর। তবে একটি কথা এখন ফাঁস করছি, এই ল্যাদামি কিন্তু করোনার থেকে বেশি ছোঁয়াচে। ল্যাদখোর পাবলিকদের একটি কমন বৈশিষ্ট হল লেট রাইজার। বেলা 9 টার আগে ঘুম ভাঙে না।  বিয়ের আগে আমি দশটার সময় আর আমার হুবু বউ সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠত। বিয়ের পর ছুটির দিন দুজনেই এখন দশটার সময় উঠি।
  সেবার কন্যাকুমারী বেড়াতে গিয়ে সূর্যোদয় দেখার জন্য আগের দিন সব বসে বসে প্ল্যান প্রোগ্রাম করলাম। ভোরে ওঠার জন্য পাঁচটা এলার্মও দিলাম। 
পরদিন যথারীতি তিননম্বর এলার্মটা বন্ধ করে বউকে বললাম, আর যাবে দেখতে?
বউ ঘুম ঘুম গলায় বলল, কেন বলতো?
---না মানে এত সকালে উঠলে সারাদিন শরীর ম্যাজম্যাজ করে যাবে। দিনের বেলায় সাইট সিনের মজাটাই মাটি হয়ে যাবে।
---কিন্তু আমি শুনেছি এখানকার সানরাইজ ভীষণ সুন্দর!
---ধুর বাদ দাও তো। সেই তো একই ঘটনা। আকাশ একটু লালচে হবে তারপর কোথা থেকে সূর্য্য মামা ফস করে উদয় হবে। আর মেঘলা ওয়েদার হলে সবকিছুর বারোটা বেজে যাবে।
---তার মানে একটি রিস্ক থেকেই যায় বলো।
---অবশ্যই। তার থেকে ঘুমিয়ে পড়া বেটার। 
  সব এলার্মগুলো অফ করে দুজনে ঘুমিয়ে পড়লাম। আমার যুক্তিগুলো বউ বিনা তর্কে মেনে নিল তার কারণ আমার সাথে থেকে থেকে সেও ল্যাদামির শিকার হয়ে গেছে। 
 এই গুনটা খুব একটা চাপের নয়। ফলাও করে লোককে শোনালেও প্রেস্টিজ ফেটফুটে তরমুজ হয়ে যাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। 
তবে চকামি আর ল্যাদামি যখন কারো ঘাড়ের উপর একসাথে ভর করে তখন কীরকম জন্ডিস কেস হয় তার একটা ছোট্ট উদাহরণ দিচ্ছি।
 সকাল বেলায় ঝোলা হাতে বাজারে যেতে আমার খুব বিরক্ত লাগে। রাতের ট্র্যাক প্যান্ট ছাড়ো, জিন্স পরো, জামা পাল্টাও, থলে নাও; এখন আবার নতুন হ্যাপা হয়েছে। মাস্ক। মুখে দিলেই নিজেকে কেমন বানর বানর দেখতে লাগে। তারপর ফিরে এসে আবার সব খুলে বাড়ির পোশাক পরো।
 একদিন ভাবলাম, ধুর ট্র্যাক প্যান্ট আর খুলব না, ওর উপরেই একটা ঢোলাঢালা জিন্স পরে নিলাম। পরতে বেশ কষ্টই হল। না, গরম আমার অতটা লাগে না, আর পায়ে তো একেবারেই না। 
 বাজার থেকে ফিরে এসে বাড়িতে পরার সেই প্যান্টখানি আর খুঁজে পাচ্ছি না। কোমরের মধ্যে টাইট হয়ে বাবাজি উঁকি মারছেন। কিন্তু চকামির আশীর্বাদে তাকে ধরতে পারছি না। জামা খুলে ফেলেছি, নীচের দিকে তাকালেই একটার উপর আরেকটি প্যান্ট স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে; আর আমি ঘর, ডাইনিং, বাথরুম, রান্নাঘর তোলপাড় করে গরু-খোঁজা, ছাগল-খোঁজার মত খুঁজে যাচ্ছি।
 বউকে বেশ কাঁচুমাচু করে বললাম, আমার বাড়িতে পরার প্যান্টটা তুমি কোথাও দেখেছ? মনে হয় ফেসবুক করছিল। মোবাইলটা খাটের উপর রেখে আমার কাছে এসে ওপরে পরে থাকা প্যান্টটা ধরে টান মারে। আমি তৎক্ষণাৎ চেঁচিয়ে ওঠে বলি, সকাল সকাল এসব কী করছ? বলেই নীচে তাকিয়ে দেখি যাকে হন্যে হয়ে খুঁজে যাচ্ছি সে আমার সাথে সাথেই ঘুরছে। এই পরিস্থিতিতে আমি একপাটি দাঁত দেখিয়ে ব্যাপারটা হালকা করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু আমার দন্ত প্রদর্শন পর্ব বেশিক্ষণ স্থানী হল না। কারণটা আর নাই বা বললাম। সবকিছু বলতে হয় নাকি! কিছু জিনিস বুঝে নিতে হয়।