মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে গেলে বিছানায় বিপাশাকে না দেখে প্রথমে আসিফ ভাবল ওয়াশরুমে গিয়েছে হয়ত কিন্তু কিছুক্ষণ পর কোন সারাশব্দ না পেয়ে বিছানা ছেড়ে রিডিং রুমে গিয়ে দেখে সেখানেও নেই। কোন কোন রাতে বিপাশা একাএকা বারান্দায় বসে থাকে আজ সেখানেও নেই একটু ভাবনায় পড়ে গেল আসিফ। বিপাশা বিপাশা বলে কয়েকবার ডেকে উঠলেও সারা নেই বিপাশার। মেয়ে বিদিতা অঘোরে ঘুমাচ্ছে। ঘড়িটার দিকে চোখ পড়তেই দেখে চারটে কুড়ি আর একটু পরেই ফজরের আজান হবে রাত প্রায় শেষ। আসিফ ভেবে পায়না কোথায় গেল। মেইন দরজাটা তালা বন্ধ দেখেই ও বুঝতে পারে বিপাশা বাড়ির বাইরে গিয়েছে। কিন্তু এই শেষ রাতে কোথায় গেল কিছুই তো বলেনি কোন বাজে অভ্যেসও তো ওর নেই।
বেডসাইড টেবিল থেকে ফোনটা নিয়ে বিপাশাকে ফোন দেয় আসিফ ওপাশে দু'তিনটা রিং হতেই বিপাশার কণ্ঠ ভেসে আসে--হ্যালো
--কোথায় তুমি বিপাশা এত রাতে! আসিফের কণ্ঠে উৎকণ্ঠা ঝরে পরে।
-- আমাকে তোমার কি কোন প্রয়োজন আসিফ? আমি যাচ্ছি চলে যাচ্ছি। প্রচণ্ড বাতাসে বিপাশার কথাগুলো কেটেকেটে ভেসে আসছিল যেন কোন সুদূর পথযাত্রীর।
আসিফ মুহূর্তেই বুঝে ফেলে বিপাশ গাড়ি নিয়ে কোথাও যাচ্ছে ওর উইণ্ডস্ক্রীন খোলা। অন্য মোবাইলটা হাতে নিয়ে গাড়ির ট্রাকিং এপস এ ঢুকে যা দেখল তাতে ওর বুক কেঁপে উঠল বিপাশা পাগলের মত গাড়ি চালাচ্ছে স্পীড ক্রমশই বাড়ছে সাভার ইপিজেড পার হয়ে গাড়ি ছুটছে। প্রায় চিৎকার দিয়ে ওঠে আসিফ - বিপাশা এ তুমি কী করছ এত জোরে গাড়ি চালাচ্ছ কেন? কোথায় যাচছ মায়ের বাড়ি যাও কিন্তু প্লিজ গাড়ির স্পীড কমাও।
--ওফ্ আমি জানতাম তুমি এ কাজটি করবে এজন্যই তোমার গাড়িতে একা কোথাও যেতে ইচ্ছে হয়না। জানো তো আসিফ এসব নজরদারি আমার ভাল লাগেনা। প্লিজ ফোন রাখো এত জোরে কথা বলনা বিদিতার ঘুম ভেঙে যাবে।
--- তুমি মায়ের বাড়ি যাবে আমাকে বলতে আমি আর বিদিতাও তোমার সাথে যেতাম।
রাতের শেষ প্রহরের এক উদ্ভ্রান্ত দুরন্ত গাড়ির চালক এবং দুঃসাহসী আরোহী বিপাশা মৃদু হাসল ওর ঠোঁটের কোণের সেই হাসিটুকু যদি আজ বারবছরের বিবাহিত
জীবনের স্বামী আসিফ দেখতে পেত তবে নিশ্চিত সে এক অচেনা বিপাশাকেই দেখত।
বিপাশা শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে-- এই বারো বছরে তুমি কতবার আমার সাথে মায়ের বাড়ি গিয়েছো মনে করতে পার আসিফ?
আসিফ আমতাআমতা করে বিনয়ের সাথে বলে-- সে তো তুমি জানো বিপাশা আমার কেন যাওয়া হয়ে ওঠেনা কতটা ব্যস্ত থাকি আমি।
--- হ্যাঁ হ্যাঁ আমি জানি, জানি বলেই তোমাকে আর কিছু বলিনি। বিপাশার কণ্ঠে একরাশ বিদ্রুপ ঝরে পরে।একটু সময় নিয়ে আবার বলতে শুরু করে
--- শোন আসিফ আগামীকাল নিউজহেডে যে খবরটা তুমি পাবে তাতে সামান্য বিচলিত হবেনা আমি জানি তবুও বলছি বিদিতাকে একটু দেখেশুনে রেখ। আর তোমার সেই সেক্রেটারী মেয়েটাকেই বিয়ে কর।
এপ্রান্ত থেকে আসিফ প্রায় চিৎকার দিয়ে বলতে থাকে
-- প্লিজ বিপাশা তুমি ফিরে এস। ঘরে বসেই তোমার সবকথা শুনব পাগলামো করনা।
কিন্তু না ও প্রান্ত থেকে আর কোন উত্তর আসে না। বিপাশা ফোনলাইন কেটে দিয়েছে। আসিফ হাতে ধরা অন্য মোবাইলটাতে চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকে বিপাশার গাড়ির স্পীড বাড়ছে, বেড়েই চলছে---
বিপাশা মোবাইল কেটে দিয়ে মিটার বোর্ডের দিকে তাকিয়ে নিজেই বিস্মিত হয়। কথা বলতে বলতে এত স্পীডে সে কীভাবে গাড়ি চালাচ্ছিল! এক্সিলেটরের উপরে একটু চাপ কমিয়ে চলতে চলতে ভাবতে থাকে ফেলে আসা জীবনের কথা। সেই ইন্টারমিডিয়েট থেকে আসিফের সাথে পরিচয় অতঃপর ঢাকা ভার্সিটিতে একই সাবজেক্টে পড়াশোনা ধীরে ধীরে প্রেম ভালোবাসা দিনেদিনে একের উপরে অপরের নির্ভরতা। আর সেই নির্ভরতার স্বপ্ন সারাট জীবনের জন্য অঙ্গিকার। ঘর বাঁধার স্বপ্ন। দু'জনে মিলেই চাকরির চেষ্টা দুইবারের চেষ্টায় বিপাশা বিসিএস এ এডমিনিস্ট্রেশন এ যোগদান আর আসিফের স্বনামধন্য এক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে যোগদান এমনই অনেক চড়াই উতড়াই পার হয়ে একদিন তাদের স্বপ্নের নীড়ের ভিত্তি স্থাপন। প্রথমে বিপাশার পরিবার ওদের বিয়েটা মেনে না নিলেও বাবার মৃত্যুর পরে মা মেনে নিয়েছেন কিন্তু সারাজীবনে শ্বশুর বাড়িতে আন্তরিক হতে পারেনি আসিফ। তবুও ওদের জীবন চলছিল ভালোই।
বিয়ের সাত বছর পরে বিদিতা ওদের জীবনে এলে যেন নতুন এক স্বর্গ দুয়ার খোলে। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই পাল্টে যেতে থাকে আসিফ প্রতিনিয়ত উচ্চাকাঙ্খা নামের সোনার হরিণের পিছনে ছুটতে ছুটতে সংসার থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে পুরোনো আসিফের সাথে নতুন আসিফকে মেলাতেই পারতনা বিপাশা। এক সময় চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে নিজেই ব্যাবসা শুরু করে আর এই ব্যাবসার অজুহাতেই আজ দিল্লি কাল সিঙ্গাপুর। প্রথম প্রথম অনেক আপত্তি তুলেছিল বিপাশা আপ্রাণ বোঝাতে চেষ্টা করেছে তারা ভাল আছে বেশ ভালো। জীবনে সুখী হতে এর বেশি কিছু লাগেনা কিন্তু আসিফ শুনেনি কোনদিনই সে কথা। কেবল বিদিতার দোহাই দিয়েছে। মেয়ের জন্যই তাকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
ভিতরে ভিতরে বিস্তর পরিবর্তন হলেও বাইরেটা বিপাশার জন্য বিদিতার জন্য বরাবরই বেশ ঝকঝকে রেখেছে আসিফ।
নিপুণ অভিনয় দক্ষ ধূর্ততার এক মোহজাল দিয়ে ভালোবাসা ভালোবাসা খেলাটা খেলে গেছে।কিন্তু আসিফটা এখানে একেবারেই বোকা! ভাবতেই হাসি পায় বিপাশার কি করে ভাবছে আসিফ ওর এই অভিনয় ধোঁকাবাজি বিপাশা একেবারেই বুঝবেনা!
ধীরে ধীরে বাসায় আসতে রাত বাড়তে লাগল। মদ্যপ মাতাল অবস্থায় মাঝে মাঝে টলতে টলতে বাসায় ফিরত। প্রথম প্রথম বিপাশা কিছু বলার আগে মাফ চেয়ে নিত- সরি ডিয়ার আজ ফরেণ ডেলিগেটদের সাথে মাত্রাটা বেশি হয়ে গেছে আর হবেনা।
বিপাশা শুধু কঠিন চোখে চেয়ে দেখেছে আর মেয়েকে নিয়ে অন্য ঘরে অবস্থান নিয়েছে। কিছুতেই শোধরায়নি আসিফ ক্রমান্বয়ে লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে বেসামাল অবস্থায় বাড়িতে এসে উচ্চস্বরে বিপাশাকে শাসিয়েছে।
বিদিতার কথা ভেবে ভেবে এতসব সহ্য করেও শেষ রক্ষা হয়নি।
গতমাসে যখন আসিফ ইউকে তে গেল ব্যাবসার কাজে
বিদিতার হঠাৎই তখন পাগল পাগল জ্বর। জ্বর একটু কমে গেলে বায়না ধরে বাবার সাথে কথা বলবে। ভিতরে ভিতরে সংসারের ভিতগুলো ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেলেও বিদিতার শিশুমন তার কিছুই টের পাচ্ছিল না। বাবার নেউটে মেয়েটা অসুখ-বিসুখে বাবাকে কাছে পেতে চাইত।
সেদিন রাত সকাল বেলা যখন ঘামদিয়ে মেয়েটার জ্বর নেমে গেল মায়ের কাছে বায়না ধরল বাবার সাথে কথা বলার। সময়ের ব্যবধানে ইউকেতে এখন অনেক রাত ,এতরাতে বাবা ঘুমাচ্ছে শত বলেও বোঝাতে পারেনি।সেই সকালে আসিফকে ফোন দিলে ফোন রিসিভ করে আসিফের অফিস সেক্রেটারি তানিয়া। ঘুমঘুম চোখে জড়ানো কণ্ঠে জবাব দিয়েছিল--আসিফ ওয়াস রুমে একটু পরে করুন।
আর তখনই বিপাশার সারা শরীরের রক্ত হীম হয়ে গিয়েছিল। যা বোঝার বিপাশা বুঝে নিয়েছে। সেদিন থেকে আসিফের সাথে ভিতরে ভিতরে সকল বন্ধন ছিন্ন করে ফেলেছে কিন্তু বুঝতে দেয়নি একটুও। এতটাদিন নিজের সাথে নিজের অবিরত যুদ্ধ চালিয়েও কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। আসিফকে ডিভোর্স দিলে প্রথমেই যে তার চরিত্র হরণ হবে সে কথা বিপাশ জানে। আর সে সব অতিক্রম করার শক্তিও তার আছে কিন্তু যতবার ডিভোর্সের কথা ভেবেছে ততবারই বিদিতার সরল মুখটা ভেসে উঠেছে। ও যে ওর বাবাকে খুব ভালোবাসে কীভাবে মেয়েটাকে বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করবে! আর ওকে রেখে গেলে সেই বা কি নিয়ে বাঁঁচবে! এমনই দোটানায় জীবন যখন দোদুল্যমান তখন নিজেকে শেষ করে দেবার সহজ সমাধান খুঁজে পেল বিপাশা। কিন্তু তাতেও কি বিদিতার জীবনটা স্বভাবিক থাকবে? নিশ্চয়ই না সাংবাদিকদের অযাচিত প্রশ্ন স্কুলে ম্যামদের মুখরোচক গল্প সহপাঠীদের টিপ্পনী ও যতই বড় হবে ততই এগুলো ওর জীবন অতিষ্ঠ করে তুলবে। অবশেষে ভাবনার প্রান্তে এসেই যেন এই সহজ সমাধানটি পেয়ে গেল
হ্যাঁ আত্মহত্যা, আর নিজেকে হত্যা করতে হবে পেশাদার খুনিদের চেয়েও কৌশলে। বিপাশার মৃত্যু যেন কিছুতেই বিদিতার স্বভাবিক জীবনের অন্তরায় হতে না পারে। তাইতো সন্ধ্যায় মাকে ফোন দিয়ে বলে রেখেছিল খুব সকালে মায়ের হাতের চা খাবে একসাথে। হ্যাঁ মা মা- ই স্বাক্ষী দিবে আজ উইকেণ্ডেতে মায়ের সাথে দেখা করতেই যাচ্ছিল বিপাশা।
সংবাদ শিরোনামটা যদি এমন হয় " মায়ের সাথে সকালের চায়ের টেবিলে চা খাবার কথাছিল কিন্তু দুর্ভাগ্য তাকে পরপারে নিয়ে গেল।" কিংবা " মায়ের সাথে শেষ দেখা হলনা সহকারী সচিব লুবানা বিন্তে বিপাশার "
ফোনটা বেজে উঠতেই সম্বিত ফিরে পায় বিপাশা। আসিফ ফোন করেছে। ফোনটা কেটে দিয়ে গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে দেয় বিপাশা। চারিদিকে হাল্কা আলোআঁধারের খেলা প্রভাত হয়ে এসেছে। একটু পরেই আলো ফুটবে। বিপাশার ডান পা এক্সিলারেটের উপরে ক্রমশ চাপ বাড়তে থাকে সীট বেল্ট খুলে দিয়ে স্টিয়ারিংটা বামে ঘুরিয়ে দেয়। মাত্র কয়েক মিটার দূরে প্রকাণ্ড শিরিস গাছ, ঝড়ের গতিতে ছুটছে গাড়ি। কয়েক সেকেণ্ডের ভিতরেই নিষ্পত্তি হয়ে যাবে বিপাশার জীবনের লেনদেন হিসাব নিকাশ।
সহসাই বিদিতার নিষ্পাপ মুখটা ভেসে ওঠে বিপাশার চোখে মাকে মনে পড়ে মা খুব সকালে আজ নিজ হাতে চা-নাস্তা বানিয়ে বসে থাকবেন টেবিলে। প্রায়ই এমন করে উইকেণ্ডে মায়ের সাথে সারাটাদিন কাটিয়ে শেষ বিকেলে ঢাকায় ফিরে। আজও মা বসে থাকবে কান পেতে থাকবে গাটির হর্ণ শোনার জন্য দেরী দেখে হয়তবা বারবার ডালিম গাছটার ছায়ায় এসে দাঁড়াবেন বেলা যতই হোক আজ যে তাকে ছাড়া মা সকালের নাস্তাই খাবেনা। মা; মা যেন ডাকছে তাকে।
সামনে শিরিস গাছটা খুব সামনে মৃত্যুদূতের মত ঠায় দাঁড়িয়ে বিপাশা দ্রুত এক্সিলারেটর থেকে পা সরিয়ে নিয়ে ব্রেক চেপে ধরে দ্রুত খুব দ্রুততার সাথে স্টিয়ারিংটা ডানে ঘুরিয়ে দেয়।
শিরিস গাছটা যেন অবাক হয়ে দেখে ক্ষীপ্রগতির গাড়িটা তার গা ঘেষে কিছুটা ছাল খসিয়ে একটু দূরে গিয়ে কয়েকটা ঝাকুনি দিয়ে দাঁড়ায়। তখন পূব আকাশে সূর্যটা কেবল লাল আভা ছড়িয়েছে মানিকগঞ্জের গ্রামের রাখাল গরু নিয়ে মাঠে যাচ্ছে। ভ্যান ভর্তি সব্জী নিয়ে কিষাণ ছুটছে পাইকারি বাজারে, আর বিপাশা পাখির কিচিরমিচির গানের সাথে ধীর লয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে,সিডি প্লেয়ারে লো ভ্যোলুয়েমে গান বেজে চলছে" জীবনও মরনের সীমানা পেরিয়ে ---" সত্যিই মা যে হাত বাড়িয়ে আছে। মা হয়ত এতক্ষণে টেবিলে বসে ঘড়ির কাঁটা দেখছে।
নয়ত ডালিম গাছের নীচে দাঁড়িয়ে পথের দিকে চেয়ে আছে আজ সারাটাদিন যে তার অন্যরকম এক ভালোলাগার দিন।