খা ন আ খ তা র হো সে ন

  • বাল্য বিবাহের পীড়িতে ছোটো বুবু
  • ২০২৪-০৯-১৫ ১৭:৫২:৪৩
image

চারদিকে মিটিং মিছিলে মুখরিত দেশের সর্বত্র। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট লেগেই আছে। তবুও গ্রামের মেয়েরা সেয়ানা হলেই পিতা মাতার চোখের ঘুম হারাম হয়ে যায়। ঘটক লাগিয়ে দেয় মেয়ের জন্য। এ বাতাস আমাদের সংসারে এসেও লাগে। বড় বুবুর বিবাহের পর সবাই নিশ্চিন্ত হয়ে গিয়েছিল। গায়ে বাতাস লাগিয়ে চলছিলো সবাই। কিন্তু দিনে দিনে এ ঘরে ছোটো বুবু শেরীনা খাতুন যে সেয়ানা হয়ে উঠছে সেদিকে কারও খেয়াল নেই। যখন খেয়াল হলো ততদিনে ছোটো বুবু ৮ম শ্রেণীতে। মা বাবাকে ডেকে বললেন 'পাত্র দেখো'। কথা ছোটো বুবুর কানে যেতেই কান্নাকাটি শুরু করে দিলো। উঠতে বসতে মায়ের কানেকানে আবদার ' মাগো, এখন আমি বিয়ে করবো না। আমি মেট্রিক পাশ করতে চাই। '
কিন্তু কেউ ছোটো বুবুর কথা শোনেনা। চারদিকে পাত্রের খোঁজে স্বজনদের বলা হয়। বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রস্তাব আসতে থাকে। যৌতুক ছাড়া পাত্র পাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে। নাজির হোসেন খান, নওয়াব আলী মোড়ল, মহাতাপ উদ্দিন মোড়ল, বাবর আলী ফকির, নজরুল ইসলাম গাজী সবাই বিনা যৌতুকে বিবাহযোগ্য পাত্র খুঁজতে থাকেন। এর ভেতর ঘটে এক মিরাক্কেল। বড় ভাই আলতাফ হোসেন জমিজমার কাজ করতেন। পোস্ট অফিসের চাকরির পাশাপাশি খুলনা রেজিষ্ট্রি অফিসে দলিল লেখক হিসেবে কাজ করেন। পরিচিতদের জমির জটিল কাজগুলো সমাধান করে দেন। এই জমির সমস্যা নিয়ে রূদাঘরা থেকে তোজাম সরদার হাসেম মোড়লকে নিয়ে আসে। 
বেশ কয়েকবার আসা-যাওয়ার মাঝে হাসেম সরদারের সাথে একটা হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আলতাপ হোসেন এলাকার বিভিন্ন জনকে পোস্ট অফিসে চাকরি দিয়েছেন একথা হাসেম সরদার জানতেন। তিনি তার কলেজ পড়ুয়া ছোট ভাই আবুল কাশেমের জন্য একটা চাকুরির আবদার করেন। প্রস্তাবের সাথে সাথে আলতাফ হোসেনের সামনে ছোটো বুবু শেরীনা খাতুনের মুখটা ভেসে ওঠে। হাসেম সরদারের কাছে বিবাহের প্রস্তাবও দিয়ে ফেলেন। সাতপাঁচ না ভেবে গ্রামের সহজ সরল মানুষটি রাজী হয়ে যান। 
বড় ভাই সময় নেননা। একসপ্তাহ পর বিবাহ রেজিষ্ট্রি হবে। পরে সময় বুঝে অনুষ্ঠান করে বধূকে পালকি করে নিয়ে যাবে। তখন জামাইকে সাইকেল ঘড়ি রেডিও দেয়া হবে। তারিখ ঠিক করে হাসেম সরদার রূদাঘরা চলে যান।
বিবাহের কথা শুনে হাসেম সরদার রেগে যান। এখনই বিবাহ কেনো? লেখা পড়া শেষ না করে তিনি বিবাহ করবেন না। কিন্তু বড় ভাইয়ের সিদ্ধান্তের উপর তিনি কথা বলতে পারলেননা। তবে বিবাহের আগে কণ্যাকে একনজর দেখার আগ্রহ দেখালে বাবা রাজি হন। হাসেম সরদারের আত্মীয় সবুর মোড়লের বাড়িতে এ ব্যবস্থা করেন আমার মা। ঐ বাড়ির পাশেই আমার ফুফুর বাড়ি। এক বিকেলে আমার সাথে ছোটো বুবু ফুফুর বাড়ি আসে। সবুর মোড়লের বাড়ি থেকে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি সাদা নাগরা পরে আসেন আবুল কাশেম সরদার। দূর থেকে দুজন দুজনকে দেখেন। 
নির্দিষ্ট দিনে বিবাহ হয়ে যায় আমার ছোটো বুবুর। তখন তার বয়স মাত্র ১৫ বছর। এ বাল্য বিবাহের বিরূদ্ধে কেউ কোনো কথা বলেনি। এ বিবাহের খারাপ দিক ছিলো শত চেষ্টা করেও বড়ো ভাই আলতাফ হোসেন আমার ছোটো ভগ্নিপতিকে পোস্ট অফিসে চাকরি দিতে পারেননি। এ-ই নিয়ে জীবনভর অশান্তি লেগেই ছিলো আমাদের সুখের সংসারে।