মহেশখালীতে উপকূলীয় এলাকায় প্যারাবনের অস্তিত্ব সংকটে!

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের
  • ২০২৪-০২-১৪ ২০:৪৬:১২
image

মহেশখালী কক্সবাজার প্রতিনিধি ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ 
বাংলাদেশর একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর অন্তর্গত শাপলাপুর ইউনিয়নে উপকূল রক্ষার প্যারাবন (ম্যানগ্রোভ) উজাড় করে চিংড়িঘের
ও লবণের মাঠ তৈরির হিড়িক পড়েছে। 
শাপলাপুর ইউনিয়নের মুকবেকী সুইস গেট সংলগ্ন এলাকায় প্যারাবনের প্রায় ১২০ একর জায়গা দখল করেছে ভূমিখেকোরা তার মধ্যে প্রায় ২৫ একর প্যারাবন উজাড় করে ৪-৫টি চিংড়িঘের তৈরি করা হয়েছে।
প্যারাবন ধ্বংস করে একের পর এক নতুন করে তৈরি করছে চিংড়িঘের। এতে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।
বনকর্মকর্তা যোগসাজশে স্থানীয় প্রভাবশালী ভূমিখেকোরা এই দখলে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের।
মহেশখালীতে উপকূলীয় বন বিভাগের গোরকঘাটা রেঞ্জের আওতায় শাপলাপুর বিটের অধীন বিশাল প্যারাবন (বনভূমি) রয়েছে। 
বর্তমান সরকার নাম ব্যবহার করে জনপ্রতিনিধি,
সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা স্থানীয় একাধিক এভাবশালী সিন্ডিকেট প্যারাবনের জায়গা দখলে নিতে প্রতিযোগীতায় নেমেছে। দিনদুপুরে কাটা হচ্ছে হাজার হাজার বাইন ও কেওড়াগাছ।
সরেজমিনে শাপলাপুর ইউনিয়নের মুকবেকী সুইস গেট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্যারাবন ধ্বংস করে সেখানে চার থেকে পাঁচটি চিংড়িঘের নির্মাণ করা হয়েছে।
ঘেরের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে কেটে ফেলা বাইন ও কেওড়াগাছের মোথা (গোড়ালি)। সমুদ্রের লোনাপানি ঢুকিয়ে সেখানে মাছ চাষ হবে। এই ঘেরে কারণে কুহেলীয় নদীর প্রশস্ততাও কমে আসছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
সুইস গেটের দক্ষিণ পাশে প্যারাবন দখল করে চিংড়িঘের করেন শাপলাপুর ইউনিয়নের মুকবেকী খুশিয়ার পাড়ার বাসিন্দা মৃত আবু জাফরের ছেলে আব্দুল করিম (৪২) ও বুধার পাড়ার মৃত গোলাম সুলতানের ছেলে বজল আহমদ(৪০)। স্থানীয় কয়েক বাসিন্দা জানান, ১০ একরের প্যারাবন ধ্বংস করে চিংড়িঘেরটি করা হয়।
স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়-
এই ঘেরের দক্ষিণ পাশে প্যারাবন নিধন করে চিংড়িঘের করেন মুকবেকী বুধার পাড়া এলাকার বাসিন্দা মৃত সদর আমিনের ছেলে মোহাম্মদ ফকির। সুইস গেটের উত্তর পাশে প্যারাবন দখল করে আরেকটি চিংড়িঘের করেছে আক্কাসের নেতৃত্বে ভূমিখেকোরা, দক্ষিণ পাশের আরও ৯০ থেকে ১০০ একর প্যারাবন দখল করেন ফিরোজ, মঞ্জুর, আমান উল্লাহ, রশিদ ও রফিক সহ কয়েকজন ব্যক্তি। শ্রমিক নিয়োগ করে প্রকাশ্যে খননযন্ত্র দিয়ে প্যারাবন নিধন ও চিংড়িঘরের বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হলেও কেউ বাধা দেয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দখলদার আব্দুল করিম বলেন-তারা কয়েককজন মিলে প্যারাবন কেটে প্রায় ১০ একর জায়গা দখল করে চিংড়িঘের নির্মাণ করেছে। তিনি আরো বলেন, ডিসি, ইউএনও, এসিল্যান্ড ও তহসিলদার থেকে অনুমতি নিয়েছি। 
তার কাছে এই অনুমতির কিছু ডকুমেন্টপত্র রয়েছে বলেও জানায়। তার সাথে স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামীলীগ নেতা মঞ্জুরও জড়িত রয়েছে বলে এই প্রতিবেদককে জানান। 
দখলদার মোঃ ফকির বলেন-আমি অনুমতি নিয়ে প্যারাবনের ৭ একর জায়গা দখল করে চিংড়িঘের নির্মাণ করেছি। অনুমতির প্রকৃত ডকুমেন্টপত্র আমার কাছে নাই। তবে নকল কিছু ডকুমেন্টপত্র রয়েছে। তার সাথে প্রভাবশালী ব্যাক্তি জড়িত রয়েছে বলেও স্বীকার করেন। তাছাড়া সে বনবিভাগকে বিভিন্ন সময় টাকা দিয়ে ম্যানেজ সহ স্থানীয় তহসিলদার অফিসে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে অনুমতিপত্র নেওয়ার কথা বলেছে। তবে তার পাশে প্যারাবন কেটে নতুন করে আরেকটি চিংড়িঘের নিমার্ণ করছে বলেও জানায়। 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় মুকবেকী সুইস গেট এলাকায় বিশাল প্যারাবনের সবুজ বেষ্টনী দেখতে অত্যন্ত সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর ছিল। প্যারাবনের এই জয়গায় বিভিন্ন প্রাণীর অবাধ বিচরণও ছিল। 
কিন্তু বর্তমানে প্যারাবনের ১২০ একর জায়গা দখল করেছে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। তার মধ্যে প্রায় ২৫ একর জায়গার প্যারাবন উজাড় করে ৪-৫টি চিংড়িঘের তৈরি করা হয়েছে। এটি পরিবেশের জন্য খবুই উদ্বেগজনক ও হুমকি স্বরুপ বলেও জানান তারা।
প্যারাবন উজাড়ের ফলে একদিকে উপকূল বিলীন হচ্ছে, অন্যদিকে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। গাছপালা উজাড় হওয়ায় পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল, পশুপাখির বিচরণক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে।
শাপলাপুর জেএমঘাট বনবিটের (ভারপ্রাপ্ত)কর্মকর্তা আজহার দখলের কথা স্বীকার করে বলেন-
দখলদারদের বিরুদ্ধে বনবিভাগের মামলা রয়েছে। এসব মামলার আসামী হলেন, করিম,বজল, ফিরোজ, আমান উল্লাহ, রশিদ, মঞ্জুর, ফুতাইয়া ও আক্কাস। প্যারাবন আগে থাকলেও এখন নাই। তাই নতুন করে মাছের ঘের দিলেও তাতে বাধাঁ দেওয়ার সাহস তাদের নেই বলে জানান তিনি। কারণ দখলদারেরা এতই প্রভাবশালী যে তাদের দখলে বাধাঁ দেওয়ার সাহস বনবিভাগের নাই। তবে আর্থিক লেনদেনের ব্যাপারে সে অবগত নয় বলেও জানায়।
উপকূলীয় বন বিভাগের গোরকঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা আয়ুব আলী বলেন-
এই ব্যাপারে আমি অবগত নই তবে কেউ প্যারাবন ধ্বংস করে চিংড়িঘের করলে খবর পাওয়ার সাথে সাথে তাদের বিরুদ্ধে আমরা অভিযান পরিচালনা করি।
আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। আমরা জোরালো অভিযান পরিচালনা করি। তবে এসব অভিযান পরিচালনা করতে বনবিভাগের টাকা খরচ হওয়ার কথা বলেন তিনি। 
দখলদারেরা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন আমরা তাদের বিরুদ্ধে আমরা অভিযান পরিচালনা করবো। তাদের এই জায়গা ভূমি মন্ত্রণালয়কে হস্তান্তর করা হয় নাই। সুতরাং ভূমি অফিস অনুমতি দিতে পারবে না বলেও জানান তিনি।  
মহেশখালী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ তাছবীর হোসেন বলেন, এখানে অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার ভূমি অফিসের নাই। 
আর কাউকে অনুমতিও দেওয়া হয় নাই। যদি কেউ ভূমি অফিস থেকে অনুমতি নেওয়ার কথা বলে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। এরকম অভিযোগ পেলে দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান এই কর্মকর্তা। 
সচেতন মহলের দাবী, উপকূলীয় এলাকা রক্ষার প্যারাবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্যারাবন এভাবে ধ্বংস হয়ে গেলে প্রাকৃতিক দূর্যোগের হাত থেকে এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের রক্ষা করা যাবে না। বন্যার পানিতে প্লাবিত হবে নিম্নাঞ্চল। তাই শিগ্রই এসব দখলদারদেরকে উচ্ছেদ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জোরালো অভিযান পরিচালনা করার অনুরোধ জানান তারা।  
সাগরের নোনা পানি সহ্য করে উপকূলীয় ভূমিতে যে বনের সৃষ্টি হয়, কক্সবাজার অঞ্চলে তা প্যারাবন হিসেবে পরিচিত। সেই প্যারাবন ধ্বংসের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। 
১৯৯৭ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর বিরানভূমিতে পরিণত হওয়া মহেশখালী উপকূলে সবুজ বেষ্টনী তৈরির জন্য শাপলাপুর কুহেলীয় নদীর জেগে ওঠা চরে প্যারাবন সৃজন করা হয়।
সেসব প্যারাবন ধ্বংস করে চিংড়ি চাষ, লবণ চাষসহ আরো অনেক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছে। এখন উপকূলীয় এলাকায় প্যারাবনের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
মহেশখালীতে কর্মকর্তা ভূমিখেকোদের যোগসাজশে উপকূলীয় এলাকায় প্যারাবন কাটা বন্ধ না হলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস সহ প্যারাবনের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে বলে মনে করেন এলাকার সচেতন মহল।