বাংলাদেশ ইউনাইটেড ইসলামী পার্টির সংবাদ সম্মেলন

  • মাওলানা মোঃ ইসমাইল হোসাইন
  • ২০২৩-১২-১৭ ১৬:৪৭:১৬
image

প্রিয় সাংবাদিকবন্ধুগণ,
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ
সর্বপ্রথম আপনাদেরকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আপনারা এত ব্যস্ততার মধ্যেও আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন।
আমরা সবাই জানি যে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। আবহমানকাল থেকেই এ দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিদ্যমান। এ দেশের প্রাকৃতিক দৃশ্য যেমন সৌন্দর্যময় তেমনি এর অধিবাসীদের ধর্মীয় বিশ্বাসও বৈচিত্রময়। আমাদের দেশের জনগণ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-মুসলমানসহ বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী। এ দেশের অধিবাসীরা বাঙালি, মণিপুরি, চাকমা, মারমা প্রভৃতি নৃগোষ্ঠীতে বিভক্ত হলেও একক পরিচয়ে বাংলাদেশী।
প্রিয় বন্ধুগণ, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় হয়েছে। কিন্তু অনেক সময় স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি-গোষ্ঠী বা দল ভিন্ন ধর্মের বিশ্বাস ও লোকদের ওপর আক্রমণ করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করেছে। স্বার্থান্বেষী মহল দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে। তারা ধর্মীয় উন্মাদনা ও সংখ্যালঘুদেরকে শিখণ্ডি হিসেবে ব্যবহার করে।
আমরা অত্যন্ত দুঃখের সাথে লক্ষ্য করে আসছি যে- হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নামে কিছু আলেম ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নাম ব্যবহার করে চরমোনাই পীররা রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য পবিত্র ধর্ম ইসলামের অপব্যবহার করছেন।তারা সবসময় নিজেদের মন মতো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ উদ্বারে ইসলামকে ব্যবহার করেন। এ জন্য নিজেদের মতো করে একটি ‘সিন্ডিকেট ইসলাম’ বানিয়েছেন।অর্থাৎ সিন্ডিকেটর মতে হলে এটা ইসলাম আর না হলে ইসলাম নয়। সাধারণ মুসলমানদের আবেগ-অনুভুতিকে ব্যবহার করে ধর্মের নামে এমন অধর্ম চর্চার প্রতিবাদ করা এবং দেশবাসীকে এ বিষয়ে সতর্ক করা আমরা আমাদের নৈতিক ও ইমানী দায়িত্ব মনে করি।

 
হেফাজত প্রসঙ্গ
সাংবাদিক ভাইয়েরা, আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন: হেফাজতে ইসলামের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা যিনি বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার সবসময় পর্দা নীতি-নৈতিকতার বক্তব্য দিয়ে গরম করে রাখতেন, তিনি দুই বছর আগে নারায়ণগঞ্জে একজন নারীকে নিয়ে রিসোর্টে সময় কাটাতে গেলে স্থানীয় জনরোষের মুখে পড়েন। পরবর্তীতে দেখা যায় তিনি তার প্রকৃত স্ত্রীর নাম দিয়ে হোটেল বুকিং করে এ নারীর সাথে সেখানে যান। সেখানে উত্তেজিত জনগণের কাছে এ নারীকে নিজের স্ত্রী দাবি করলেও পরবর্তীতে সোশ্যাল-মিডিয়ায়-ভাইরাল হওয়া তার প্রকৃত স্ত্রীর সাথে ফোনালাপে নারীকে অন্য ব্যক্তির স্ত্রী দাবি করেন। হেফাজতের নেতারা এ ধরনের ভন্ড, নারী লোভী, দুশ্চরিত্র ব্যক্তির মুক্তি চেয়ে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন- যা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও নিন্দনীয়।
যে মামুনুল হককে অবৈধভাবে একজন নারীর সঙ্গে রিসোর্টে রঙ্গলীলার করার অপরাধে হেফাজত থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল সেই মামুনুল হকের যারা মুক্তি দাবি করে তারা কি আলেম না ভন্ড এটা আপনাদের মাধ্যমে জাতির কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই।
হেফাজত নেতাদের কাছে আমাদের প্রশ্ন: যদি মামুনুল হক এতই ভালো মানুষ হয় তাহলে আপনাদের নেতারাই তাকে হেফাজতের কমিটি থেকে বাদ দিয়েছিল কেন? কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার অর্থ হলো আপনারা তার অপরাধ বিবেচনায় নিয়েছিলেন- তাহলে এখন তার বিচার হওয়ার আগেই কেন আবার মিথ্যা দাবি করে মুক্তি দাবি করছেন- এটি কি আপনাদের দ্বিচারিতা নয়?  
সাংবাদিক বন্ধুগণ- মূলত হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নামে সংগঠনটি গঠিতই হয়েছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের ষড়যন্ত্র হিসেবে। তখন থেকে এটি ভাড়াতে সংগঠন হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। বিভিন্ন কুমতলবে এ ব্যানারটি ব্যবহার করা হয়। হেফাজতের এ নেতৃত্ব কিংবা যারা এ ভন্ড নেতৃত্ব অনুসরণ করছে, দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তারা শুধুমাত্র ইসলামের শত্রু  নয়, তারা দেশ ও দশের শত্রু।
যখন তাদের সকল ভন্ডামি দেশবাসীর কাছে উন্মোচিত হয়েছে তখন তারা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে দেশবাসীকে ইসলামের দোহাই দিয়ে তাদের ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে নিজেদের অপকর্ম আড়াল করার জন্য মিথ্যা বিবৃতির আশ্রয় নিয়েছে। তাই আমরা এ সকল ভন্ড ও ফেতনা সৃষ্টিকারী ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দেশের প্রতিটি মুসলমান ভাই-বোনদের সচেতন থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।

চরমোনাইর পীর প্রসঙ্গ
বন্ধুগণ- চরমোনাইর পীর সাহেবদের ব্যাপারে আমরা আগেও জাতিকে সতর্ক করেছি। এরপর দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে তাদের জমিদখলসহ বিভিন্ন তথ্য জনগণ আমাদের জানিয়েছে। আমরা আগেই বলেছি- চরমোনাই পীর সাহেব হয় পীরগিরি করবেন না হয় রাজনীতি করবেন। কিন্তু মানুষের ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করে পীরালির নামে রাজনীতি চলবে না। 
চরমোনাইর পীর সাহেবের সম্মান আমি নষ্ট করতে চাই না । কিন্তু আপনাদের মাধ্যমে জাতিকে জানাতে চাই- চরমোনাইর পীর সাহেব কিভাবে বিএমডব্লিউ গাড়িতে চড়ে এবং পুলিশ প্রোডাকশন দিয়ে চলেন- হুজুর কি বলবেন এত টাকা কোথা থেকে পাচ্ছেন আপনি।  সরকারের কাছ থেকে জানতে চাই চরমোনাইয়ের পীর সাব হুজুর কিভাবে পুলিশ প্রোডাকশন পান জাতি জানতে চায়। 
এছাড়া চরমোনাই পীর সাহেব হুন্ডির মাধ্যমে বহু টাকা বিদেশ থেকে সংগ্রহ করেন বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে- এ বিষয়ে সরকারের তদন্ত করতে হবে। চরমোনাই পীর সাব হুজুরের সব ব্যাংক-ব্যালেন্স, জায়গা-জমিন নামে বেনামে আর কিছু আছে দুদকের মাধ্যমে আমরা তদন্তের জোর দাবি জানাচ্ছি।

আল্লামা আহমদ শফী হত্যার বিচার কেন হলো না?
সাংবাদিক ভাইয়েরা, হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা আহমদ শফী হত্যার বিচার আজ পর্যন্ত হয়নি। এখনকার সিন্ডিকেট হেফাজতের নেতারা আল্লামা আহমদ শফীকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত- যেটি তার পরিবারের পক্ষ থেকে মামলায়ও অভিযোগ করা হয়েছে। আল্লামা আহমদ শফীকে যেভাবে হাটহাজারী মাদ্রাসার কক্ষে নির্যাতন করা হয়েছে এবং তার রুমের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে তছনছ করা হয়েছিল সেটি দেশের সবাই দেখেছে। অক্সিজেন মাস্ক খুলে নেওয়াসহ আল্লামা শফীর সঙ্গে অমানবিক আচরণের করুণ দৃশ্য বিভিন্ন মিডিয়ায় এসেছে। এ বিষয়ে তার ভক্তবৃন্দ প্রতিবাদও জানিয়েছিলেন। আমরাও সঠিক তদন্ত করে এই হত্যার সঙ্গে যারা জড়িতদের অনতিবিলম্বে আইনের আওতায় আনার জন্য সরকারের আমরা জোর দাবি জানিয়েছিলাম।
আমাদের দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক ও স্পষ্ট। আমরা শুরু থেকেই বলেছি এশিয়া মহাদেশের শ্রেষ্ঠ আলেম আল্লামা আহমদ শফী ছিলেন বড় মাপের আলেম ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব। তাকে যে কিছু দৃষ্কৃতকারী রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে হত্যা করেছে সেটি পিবিআইয়ের তদন্তেও উঠে এসেছে। আমরা অনতিবিলম্বে এই হত্যাকারীদের বিচার দেখতে চাই।
আল্লামা আহমদ শফী হত্যা মামলা কি থেমে গেল কিনা, বাংলার মানুষ জানতে চায়।যারা আগে আহমদ শফী হত্যার বিচার চেয়েছিল তারা এখন নিশ্চুপ কেন? এটিও বাংলার মানুষ জানতে চায়

বিভিন্ন মাদ্রাসায় এ সিন্ডিকেটের অবৈধ হস্তক্ষেপ
বন্ধুগণ- আল্লামা আহমদ শফীকে হত্যার পর থেকে হেফাজতের বর্তমান নেতারা চরদখলের মতো মাদ্রাসা দখলের এক নতুন সংস্কৃতি চালু করেছে। সম্প্রতি পটিয়া মাদ্রাসায় যে অবরুদ্ধ অবস্থা চলছে এটিতে হেফাজতের কিছু নেতার অবৈধ হস্তক্ষেপের বিষয়টি জেনে জাতি তাদের ঘৃণা জানাচ্ছে। পটিয়া মাদ্রাসা বা কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হেফাজতের অফিসিয়ালি কোনো সম্পর্ক নেই। পটিয়ার সংকট কাটিয়ে উঠতে পটিয়া মাদরাসার বৈধ শূরা আছে। এতে সমাধান না হলে পটিয়ার নেতৃত্বাধীন শিক্ষা বোর্ড ইত্তেহাদ- আছে। তাতেও না হলে পর্যায়ক্রমে হাইয়া বোর্ড আছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংকট নিরসনে শিক্ষা বোর্ড থাকার পরেও হেফাজতের নামে সিন্ডিকেটের চিহ্নিত অপরাধীদের তৎপরতা আসলেই রহস্যময়। বারবার সবকিছু ডিঙিয়ে শুরু থেকেই তারা নির্লজ্জ পক্ষপাতমূলক হস্তক্ষেপ করে আসছে। ২৮ শে অক্টোবরের পরপরই  হেফাজতের গন্ধ না লাগলে পটিয়ার সংকট আরো আগেই কেটে যেতো। সবশেষ ১০ ডিসেম্বর এরা অবৈধ শুরা করতে এসে জনতার তোপের মুখে প্রবেশ করতে পারেনি। তারপরও তাদের কোনো লজ্জা হয় না। হেফাজত নেতারা নির্দিষ্ট একটি সিন্ডিকেটের পুতুল হয়ে ব্যবহৃত হয়ে আসছেন।
অবিলম্বে মাদ্রাসার শুরা কমিটির তত্বাবধানে পটিয়া মাদ্রাসা খালি করে ভেতর থেকে এসব বহিরাগতদের বের করে দেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনুরোধ জানাচ্ছি।
নির্বাচনের আগে দেশের শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বিনষ্ট করতে করতে চায় তারা
সাংবাদিক বন্ধুগণ: দেশবাসী মনে করে নির্বাচনের আগে দেশের শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বিনষ্ট করতে দেশবিরোধী চক্রের ইন্ধনে হেফাজত ও চরমোনাই পীর দেশে অস্থিতিশীল করতে চায়। যার কারণে বিতর্কিত রিসোর্ট হুজুর মামুনুল হককে নিয়ে এতদিন তারা চুপ থাকলেও হঠাৎ করে তার মুক্তির দাবিতে ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে। আমরা আশঙ্কা করছি- বিএনপি-জামায়াতের রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য অরাজনৈতিক দাবিদার হেফাজত নির্বাচনের আগে এ ঘোষণা দিয়েছে। হেফাজতের কোন কোন নেতা এ ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত তা খুঁজে বের করতে হবে।
কিছুদিন আগেও ঢাকা জজ কোর্টসহ দেশের বিভিন্ন আদালতে বোমা মারা হয়েছে। এটি ২০০৫ সালে ৬৩ জেলায় যে সিরিজ বোমা হামলা হয়েছিল তারইিএকটি নমুনা। জাতীয় নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য হেফাজত, চরমোনাই পীর ও মামুনুল হক গংরা বিচার বিভাগ ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে আবারো এমন বোমা হামলা করার পরিকল্পনা করছে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। তাই অনতিবিলম্বে এসব বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। 
এছাড়া চরমোনাই পীরদের সব ভাইদের জমিজমা ও সম্পদের হিসাব জাতির কাছে উপস্থাপন করতে হবে। বিতর্কিত হেফাজত নেতা মামুনুল হকের মুক্তির যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে- এমন কিছু হয়ে থাকলে তা বাতিল করে সে সহ হেফাজতের যেসব নেতার নামে মামলা রয়েছে- সেগুলোর দ্রুত রায় ঘোষণা করতে হবে।  উপস্থিত ছিলেন মাওলানা শাহ মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মাওলানা মহিউদ্দিন ফারুকি, ড. মোশাররফ হোসেন, ক্বারী মোঃ আব্দুল মান্নান, মুফতি শাহাবুদ্দিন ভূইয়া, ক্বারী মোঃ আলী হায়দার, হারুন অর রশিদ মিরুন, আবুল খায়ের মোঃ ওহিদী পীর সাহেব, টাঙ্গাইলসহ প্রমূক।