আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে লোকজ সংস্কৃতি-

  • মাসুদুর রহমান মাসুদ
  • ২০২৬-১১-০৬ ১৫:৩৮:৫১
image

প্রত্যেক জাতির একটি নিজস্ব সংস্কৃতি আছে  আর এই সংস্কৃতি হল তার মূল পরিচায়ক। জাতি তার সংস্কৃতিকে ধারণ করতে না পারলে সে জাতি তার মূল স্তম্ভ কে হারিয়ে  ফেলবে।সুতরাং সংস্কৃতি হইল জাতির ঐতিহ্য এবং ধারক। 
আমরা বাঙালি জাতি আমাদের আছে হাজার বছরের লালিত লোকজ সংস্কৃতি - মানুষের আচার আচরণে,আনন্দ- বেদনায়, সহজ সরল জীবন - যাপনে সামাজিক রীতিতে   যা অলিখিত ভাবে মানুষের মধ্যে  সামাজিকভাবে  সৃষ্ট, নদী - মাটি প্রকৃতির মধ্যে  যা প্রজন্মের প্রজন্ম ধরে মানুষের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে  তাই লোকজ - সংস্কৃতি। মানুষের মুখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে  এলাকা ভিত্তিক  শত  -শত  রকমের প্রবাদ  বাক্য যেমনঃ
বাসের চেয়ে কঞ্চি বড়- 
বাড়িত নাই চাউল ধাপত চুলা  বাড়ি -বাড়ি বেড়াছে ধুতি  ঝুলা। 
টাউ - টাউ গরম।
এই বাক্য তিনটি প্রথমটি দ্বারা বুঝানো হচ্ছে বড় কর্তার চেয়ে ছোট কর্মী বা অধীনস্থ ব্যক্তির দাপট প্রকাশ।
কিংবা গুরুজনের চেয়ে ছোটদের  ছোট দের আধিক্য বেশি। 
দ্বিতীয় বাক্যটি রূপক অর্থে সংসার বিরাগী  মানুষ বা অভাবী মানুষদের বুঝানো হয়,  বা সামর্থ্যের বাইরে বিলাসী জীবন। 
তৃতীয় বাক্যটি ঠাকুরগাঁও -দিনাজপুরে মানুষের মধ্যে ব্যাপক ব্যবহৃত যার অর্থ প্রচন্ড গরম।   
এরকম শত শত প্রবাদ বাক্য মানুষের মাঝে প্রচলিত। 
লোকজ উৎসবগুলির মধ্যে হাজার বছরের মানুষের আনন্দ- বেদনা, সামাজিক আচার- অনুষ্ঠান সংস্কৃতির দৃষ্টান্ত বহন করে। 
অগ্রহায়ণ মাসে নতুন ধান ঘরে  তোলার আনন্দ, শুরু হয় নবান্ন উৎসব - গুড় দিয়ে নতুন চালের পায়েস। জুম্মার দিনে নতুন চালের পায়েস দিয়ে দোয়া খায়ের। কৃষানির ব্যস্ততা -ঘর আঙিনা লেপন,পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার মধ্য দিয়ে বাড়ির পবিত্রতা অর্জন, বদলে যায় গ্রাম বাংলার চিত্রপট। মেহমানের আগমন,  ভাপাপুলি,পিঠার আয়োজন।
পৌষ সংক্রান্তিতে হাডু-ডু, লাঠি খেলা, নদী এলাকায় দীর্ঘ নৌকার উপর অনেকজন মিলে  প্রচুর  দর্শকের  উপস্থিতি  নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। মানুষের মধ্যে অন্যরকম অনুভূতি প্রবণ আনন্দ। 
বাংলা প্রথম বছরে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান - মঙ্গল শোভাযাত্রা, পান্তা ভাতের আয়োজন। বাজারে - বাজারে মেলা, চোরকি ঘুরন। পহেলা বৈশাখ বাঙালির নতুন উচ্ছ্বাস। 
সময়ের আবহে বদলে যাচ্ছে মানুষের ধ্যান ধারণা, পাল্টে যাচ্ছে আনন্দের ধরন। কৃত্রিম আনন্দ মানুষকে  চঞ্চল - অস্থির  ও স্থবির করে ফেলছে-
শীত মৌসুমে যাত্রাপালা, পুতুল নাচ, সার্কাস, কবির গান, পালা গানের আসর। রাত জেগে কুপি কিংবা হারিকেন জ্বালিয়ে গোল হয়ে বসে  শোনা হত পুথি পাঠের আসর,জাতি বর্ণ নির্বিভেদে  গাওয়া হয় লালন সংগীত যেখানে মানুষ খুঁজে পায় জীবনের জয়গান।  @ মানুষের মুখোমুখে লোকসাহিত্য বিশেষ করে শীতের দিনে দেশের উত্তরাঞ্চল বিশেষ করে বৃহত্তর রংপুর বিভাগ হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত, এই কারণে শীত মৌসুমে এই এলাকায় প্রচন্ড ঠান্ডা ও কুয়াশার সৃষ্টি হয় ফলে মানুষ শীত নিবারনের জন্য কাঠ,  খড়কুটো আগুন জ্বালিয়ে একত্রে অনেক লোক বসে আগুন পোহাতো আর সেখানে জমে উঠতো রূপকথার গল্প,কল্প কাহিনী, লাইলি মজনুর প্রেম,  খনার বচন, বিভিন্ন ধাঁধা। আলাপচারিতায় উঠে আসতো ঘটে যাওয়া  বিভিন্ন ঘটনাবলী ।   সামাজিক সম্প্রীতির এই মেলবন্ধন যা এক সুতোয় গাথা -মানুষের সম্পর্ককে  নিবিড় করে তুলে।  সময়ের পরিক্রমায় আমরা হারাতে বসেছি যাত্রাপালা, সার্কাস। 
লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম  একটি দিক মৃৎশিল্প, মাটির খেলনা। ঘরে -ঘরে  ব্যবহার করতো মাটির তৌজসপত্র। 
আধুনিক প্রযুক্তিগত কারণে লোকজ সংস্কৃতি মৃৎ -শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে, মাটির তৌজসপত্রের বদলে ব্যবহার হচ্ছে প্লাস্টিকের তৈরি জিনিস। পালা গান, যাত্রাপালা, সার্কাস, পুথি পাঠের আসর কবির গান আজ বিলুপ্তির পথে।  ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি গান-গ্রামে ছেলে মেয়েদের মধ্যে হুল্লো হুল্লোড়,  দারিবান্দা, গোল্লাছুট খেলা এসব বিনোদন থেকে মানুষ ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছে  আমরা পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ থেকে ছিটকে যাচ্ছি।  ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া, মোবাইলে খুঁজে নিচ্ছি বাক্স বন্দী কৃত্রিম আনন্দ। মানুষ হয়ে উঠছে ঘরমুখো -আমরা হারিয়ে ফেলছি আমাদের আত্মিক সম্প্রীতির বন্ধন।  এভাবেই হারিয়ে ফেলছি লোকজ সংস্কৃতি -আমাদের অস্তিত্ব। 
আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব- এই লোকজ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাঠ্যপুস্তকে লোকজ  সংস্কৃতি, লোককাহিনী, নাট্যকলা লোক শিল্প  অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষা একটি ব্যাপক মাধ্যম -ব্যবহারিক হিসেবে নাটক, যাত্রাপালা, লোকসংগীতের আয়োজন করতে হবে,   মৃৎশিল্পীদের সহজশর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে মৃৎশিল্প বাজারিকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে হয়ত শিক্ষার উপকরণের মাধ্যমে আমরা  প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমাদের এই  লোকজ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে  রাখতে পারব। টিকে থাকবে আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব।

লেখকঃ কবি ও শিক্ষক,