জাতির প্রাণশক্তি ও ভবিষ্যতের নেতৃত্ব এই তরুণ প্রজন্ম আজ নানা কারণে দিকভ্রান্ত ও বিপথগামী হচ্ছে। বর্তমান তরুণ সমাজের অধঃপতন ও নৈতিক অবক্ষয় আজ একটি গভীর সামাজিক ও জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। যুব ও তরুণ সমাজের অবক্ষয় বা নৈতিক স্খলনের পেছনে মূলত সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কিছু কারণ দায়ী। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার তাদের বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করছে। এছাড়া অনলাইন গেম, জুয়া এবং পর্নোগ্রাফির প্রতি আসক্তি তাদের মানসিকতা নষ্ট করছে। স্মার্টফোনকে এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়, তবে এর গঠনমূলক ও পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং তরুণদের প্রযুক্তির অপব্যবহার থেকে দূরে রাখতে পরিবার ও সমাজকে সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে।
গত ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে লকডাউনে ঘরে বসে অনলাইন ক্লাস, বিভিন্ন শিক্ষণমূলক অ্যাপ পড়াশুনার জন্য তাদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া হয়েছিল। যাতে তারা বিশ্বমানের শিক্ষা ও নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারে। কিন্তু তার ইতিবাচক কোনো ফল পাওয়া যায়নি, বরং উদ্বেগের বিষয় হলো- বর্তমান জরিপ অনুযায়ী, অধিকাংশ তরুণ তাদের দিনের একটি বড় সময় (৫ ঘণ্টার বেশি) মোবাইল স্ক্রিনে ব্যয় করে, যা তাদের পড়াশোনা ও কাজে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কিছুটা রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকতে পারেনি এবং পড়াশোনায় মনোযোগের ঘাটতি তৈরি হয়। তাই গত বছরগুলোতে পাসের হারে ওঠানামা ছিল। কিন্তু এবারের ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আর ২০২৬ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সারা দেশে গড় পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। পাসের হারের এই বিপর্যয়ের কারণ কি? এখন আমাদের গভীরভাবে ভাববার সময় এসেছে।
তরুণ প্রজন্মের অবক্ষয় ও অধঃপতন রোধে পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। দেশীয় সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা কমে যাওয়া এবং ভিনদেশি বা অপসংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ তরুণ প্রজন্মকে বিপথগামী করছে। তরুণদের এই বিপথগামিতার জন্য কেবল তারাই দায়ী নয়, এর পেছনে আমাদের সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থাও দায়ী। বাবা-মাকে সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তারা কার সাথে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে এবং অনলাইনে কী দেখছে সেদিকে নজর রাখা। বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের দূরত্ব তৈরি হলে তারা ভুল পথে যায়। তাই তাদের সময় দিতে হবে এবং বন্ধুর মতো তাদের সমস্যা শুনতে হবে। ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে সত্যবাদিতা, সততা, বিনয়, বড়দের সম্মান, শ্রদ্ধা ও নৈতিকতার শিক্ষা পরিবার থেকে দিতে হয়। পরিবার হলো সন্তানের প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বীজ রোপিত হয়। পরিবারের পরেই শিক্ষক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা। শিক্ষকরা বন্ধুর মতো আচরণ করে শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যা ও ভুল ধারণা দূর করতে সাহায্য করতে পারেন। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সঠিক নৈতিক, মানবিক ও ধর্মীয় শিক্ষার ঘাটতি তরুণদের সঠিক মূল্যবোধ গঠনে বাধা সৃষ্টি করে। নৈতিক অবক্ষয় রোধে ধর্মীয় ও মানবিক অনুশাসনের চর্চা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। তাই শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, স্কুল, মাদরাসা ও কলেজগুলোতে নিয়মিত নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার চর্চা বাড়াতে হবে। তরুণদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান, কারিগরি শিক্ষা, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করা, যেন তারা হতাশায় না ভোগে। কারণ কর্মসংস্থানের অভাব এবং হতাশা থেকে তরুণদের বড় একটি অংশ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। তরুণদের প্রতিভা বিকাশের জন্য ক্লাব, পাঠাগার ও সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করা একান্ত প্রয়োজন। স্কুল-কলেজ ও পাড়া-মহল্লায় খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও সামাজিক সেবামূলক কাজে তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হবে, যাতে তারা গঠনমূলক কাজে যুক্ত থাকে।
প্রতিবছর লক্ষাধিক বেকারত্ব তৈরি হওয়া, কর্মসংস্থানের অভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা হতাশায় পড়ছে। মাদকের বিস্তার এবং অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রভাবে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নৈতিক শিক্ষার অভাব ও হতাশা থেকে তরুণরা নানা অপরাধ এবং নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। তারুণ্যের অবক্ষয় মোকাবেলা করতে হলে সমাজ ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সমাজে মাদক, জুয়া, কিশোর গ্যাং এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া, ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফি, সাইবার বুলিং ও ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করা। মাদকের বিস্তার রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের ব্যবস্থা করার বিকল্প নেই। এই অনলাইন জুয়ার গডফাদার কারা? কোথায় এর শেকড়? এদের নির্মূল করতে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তারুণ্যের অবক্ষয় মোকাবেলা করতে হলে সমাজ ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তাদের এই সংকটের কারণ বিশ্লেষণ ও কার্যকর সমাধানের পথ খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি। তরুণদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারলেই তাদের উদ্যম, তারুণ্য, সাহস, নতুন চিন্তা ও পরিবর্তনের শক্তিই আগামী দিনের একটি সুস্থ সুন্দর সমাজ ও দেশ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখবে।
লেখক- কবি,সাংবাদিক,সংগঠক ও সমাজকর্মী।