ঢাকায় ভূমি,পরিবেশ ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক ওরিয়েন্টেশন প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত

  • জায়েদ ইকবাল খান
  • ২০২৬-১১-০৫ ১৯:৪৪:১৫
image

ভূমি অধিকার প্রতিষ্ঠা, খাসজমির ন্যায়সংগত বণ্টন, পরিবেশ সংরক্ষণ, ভূমি ব্যবস্থাপনায় জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রথাগত, ঐতিহ্যগত ও সামষ্টিক ভূমি অধিকারের স্বীকৃতির লক্ষ্যে আজ ঢাকায় একটি ওরিয়েন্টেশন প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাগ্রোইকোলজি প্ল্যাটফর্মের (BAP) ভূমি, পরিবেশ ও আদিবাসীবিষয়ক উপদলের উদ্যোগে এবং CAFOD-এর সহযোগিতায় ৫ নভেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় ঢাকার তোপখানা রোডের শিশু কল্যাণ পরিষদ সম্মেলন কক্ষে এ প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি কৃষক নেতা বদরুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রশিক্ষণটি পরিচালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ ইকবাল খান।
প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষক হিসেবে বক্তব্য ও প্রশিক্ষণ প্রদান করেন উবিনীগের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম জনি, ইনসিডিন বাংলাদেশ-এর গবেষক ও ক্রিকেট আম্পায়ার মুশফিকুর রহমান সাব্বির, বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এএএম ফয়েজ হোসেন, রেডিমেড গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভানেত্রী লাভলী ইয়াসমিন, সাউথ এশিয়ান পিপলস ফোরামের নেতা ড. শরীফ মাসুম, বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সহসভাপতি রেহেনা বেগম, সংগঠনটির কোষাধ্যক্ষ ও বাংলাদেশ ভাসমান নারী শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাহানারা বেগম, পটুয়াখালী জেলার কৃষক নেতা কায়েস মাহমুদ, নারী নেত্রী কাজী রেনু, নেত্রকোনা জেলার নেত্রী ও বাংলাদেশ কিষাণী সভার কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক আশা মণি, মো. আবদুর সবুর খান এবং মুন্সীগঞ্জ জেলার যুবনেতা শেখ জুবায়ের আলম প্রমুখ।
প্রশিক্ষণে ভূমি অধিকার ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, খাসজমির নীতি, ভূমিহীন মানুষের মধ্যে খাসজমির ন্যায়সংগত বণ্টন, ভূমি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিবেশগত ন্যায়বিচার, কৃষিজমি রক্ষা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত, প্রথাগত ও সামষ্টিক ভূমি অধিকারের স্বীকৃতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করা হয়।
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি কৃষক নেতা বদরুল আলম বলেন, বাংলাদেশে ভূমি সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে ভূমির অসম মালিকানা, ভূমি কেন্দ্রীকরণ এবং রাষ্ট্রীয় ভূমি ব্যবস্থাপনায় ভূমিহীন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থ উপেক্ষা করা। দেশের বিপুলসংখ্যক কৃষক, কৃষিশ্রমিক ও গ্রামীণ মানুষ ভূমিহীন অবস্থায় জীবনযাপন করছেন, অথচ বিপুল পরিমাণ খাসজমি প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর দখলে রয়েছে। প্রকৃত ভূমিহীনদের মধ্যে খাসজমি বণ্টন, ভূমি দখলদারদের উচ্ছেদ এবং ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে ভূমির ন্যায়সংগত বণ্টন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকারকে শুধু ব্যক্তিগত মালিকানার প্রচলিত ধারণা দিয়ে বিচার করা যাবে না। তাদের ঐতিহাসিক বসতি, প্রথাগত ব্যবহার, সামষ্টিক মালিকানা ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অধিকারকে আইনগত স্বীকৃতি দিতে হবে। একই সঙ্গে পাহাড়, বন, নদী, জলাভূমি ও কৃষিজমি ধ্বংস করে মুনাফাভিত্তিক উন্নয়ন এবং ভূমি দখলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
বদরুল আলম বলেন, ভূমি অধিকার, পরিবেশ রক্ষা, খাদ্য সার্বভৌমত্ব ও অ্যাগ্রোইকোলজি একই সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া পরিবেশগত ন্যায়বিচার সম্ভব নয়। এ লক্ষ্যে কৃষক, শ্রমিক, নারী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মধ্যে বৃহত্তর ঐক্য ও সম্মিলিত আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
প্রশিক্ষণে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে ভূমি বৈষম্য, ভূমিহীনতা, ভূমি দখল এবং খাসজমি বণ্টনে অনিয়ম ও দুর্নীতি ভূমিহীন কৃষক, কৃষিশ্রমিক, নারী কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান বাধা। রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে খাসজমি প্রকৃত ভূমিহীন ও প্রান্তিক মানুষের মধ্যে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে বণ্টন করতে হবে। ভূমি সংস্কার ছাড়া গ্রামীণ দারিদ্র্য, কৃষকের বঞ্চনা ও ভূমির অসম মালিকানার অবসান সম্ভব নয়।
বক্তারা আরও বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি তাদের জীবন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, পরিচয় ও অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই তাদের প্রথাগত ও সামষ্টিক ভূমি অধিকারের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং সেই অধিকার রক্ষায় কার্যকর আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। উন্নয়ন ও ভূমি ব্যবস্থাপনার নামে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ও ঐতিহ্যগত ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা বন্ধ করতে হবে।
প্রশিক্ষণে বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, ভূমি অধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ ও অ্যাগ্রোইকোলজি পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। কৃষিজমি, জলাভূমি, বন ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার পাশাপাশি কৃষক, কৃষিশ্রমিক, নারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জনগণের গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং খাদ্য সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার জন্য সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপরও তাঁরা গুরুত্বারোপ করেন।
প্রশিক্ষণে ভূমি অধিকার আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করা, খাসজমি প্রকৃত ভূমিহীনদের মধ্যে বণ্টনের দাবিতে সংগঠিত উদ্যোগ গ্রহণ, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি আদায় এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ও অ্যাগ্রোইকোলজি বিস্তারে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রশিক্ষণে কৃষক, শ্রমিক, নারী অধিকারকর্মী, যুবনেতা, গবেষক এবং বিভিন্ন সামাজিক ও গণসংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।