ইসরাইলের নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ নেতানিয়াহুর, সমঝোতার আহ্বান হারজগের

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • ২০২৬-১১-০৫ ১২:০৪:৩৯
image

ইসরাইলের সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিদেশি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের অভিযোগ আরও জোরালো করেছেন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তবে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিতর্কের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতায় পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজগ। কোনো পক্ষই পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) জেরুজালেমে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা শুরু করেন প্রেসিডেন্ট হারজগ। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলে কোনো দল বা জোট স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার গঠনের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১২০ আসনের নেসেটে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। অন্যদিকে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো সম্মিলিতভাবে পেয়েছে ১৯টি আসন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন।
নেতানিয়াহু অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করতে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে বলে গুরুতর সন্দেহ রয়েছে। নির্বাচনের দিন নগদ অর্থভর্তি খামসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনাও তিনি তাঁর অভিযোগের পক্ষে তুলে ধরেছেন। তবে কর্তৃপক্ষ এসব ঘটনাকে স্থানীয় পর্যায়ের বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
নেতানিয়াহুর অভিযোগ, কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা কাতারের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করেছেন। তাঁর নিজের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ ওঠার বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও জটিল করেছে।
এদিকে নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ৯ হাজার ৬৯টি ভোটকেন্দ্রের ভোটের হিসাব পর্যালোচনা করেছে। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি জানিয়েছে, এ পর্যালোচনায় নির্বাচনের ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করতে পারে বা ফল পরিবর্তন করতে পারে—এমন কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিদায়ী পার্লামেন্টের প্রতিনিধিত্বকারী নির্বাচন কমিটি ১৫-২ ভোটে ফলাফল অনুমোদন করেছে। এ সময় ১৪ জন সদস্য ভোটদানে বিরত ছিলেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় প্রেসিডেন্ট হারজগ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষেরই স্পষ্ট বিজয় নেই। তাই সবাইকে বাস্তবতা মেনে নিয়ে সমঝোতার মানসিকতা দেখাতে হবে। সব প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার পূরণ করা সম্ভব হবে না-এ বিষয়টিও রাজনৈতিক নেতাদের উপলব্ধি করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
হারজগ বলেন, ‘বর্তমান বাস্তবতায় নির্বাচনের পর যখন কোনো স্পষ্ট বিজয়ী নেই, তখন আমি সৃজনশীল ও ব্যতিক্রমী চিন্তা, সাহস এবং সদিচ্ছার আহ্বান জানাচ্ছি, যাতে ইসরাইল রাষ্ট্রই বিজয়ী হয়।’ নতুন নির্বাচন এড়িয়ে রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার আগে প্রধান আরব-ইসরাইলি দল রা'আম আনুষ্ঠানিকভাবে আইজেনকটকে সরকার গঠনের জন্য সমর্থন জানিয়েছে। আরব দলগুলোর আসন বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার গঠনের সমীকরণে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার সময় যারা সেখানে থেকে গিয়েছিলেন, তাঁদের বংশধরদের বড় অংশ এই জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী সরকারের বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে আসছেন তাঁরা।
আলোচনার সময় আরব সংখ্যালঘুদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রেসিডেন্ট হারজগ। কোনো রাজনৈতিক নেতার নাম উল্লেখ না করে তিনি সম্প্রতি শোনা ‘অশালীন ও বর্ণবাদী’ বক্তব্যের নিন্দা জানান।
অন্যদিকে সাবেক সেনাপ্রধান ও বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, দুই দেশের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্ব নতুন করে গড়ে তোলা এবং দ্বিদলীয় সমর্থন জোরদার করা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় আইজেনকট বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও গঠনমূলকভাবে কাজ করার প্রত্যাশা করছেন তিনি। অভিন্ন নিরাপত্তা স্বার্থ এগিয়ে নেওয়া, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার এবং মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের সমৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরিতে একসঙ্গে কাজ করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ইরান ইস্যুতেও নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছেন আইজেনকট। তাঁর আশঙ্কা, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু হলে নেতানিয়াহু জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সুযোগ পেতে পারেন অথবা নতুন নির্বাচন পর্যন্ত সময়ক্ষেপণ করতে পারেন।
এদিকে অতি জাতীয়তাবাদী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেননি বলে জানিয়েছেন। আরব-ইসরাইলি দলগুলোর নেতাদের গ্রেপ্তারের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। বিদেশি অর্থ গ্রহণের অভিযোগে আরব আইনপ্রণেতা আয়মান ওদেহর বিরুদ্ধে তদন্তের খবর প্রকাশ করেছে দেশটির কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। তবে বৃহত্তম আরব রাজনৈতিক জোট জয়েন্ট লিস্ট এ ঘটনাকে রাজনৈতিক হয়রানি বলে নিন্দা জানিয়েছে।
আইজেনকট অভিযোগ করেছেন, নেতানিয়াহু ইসরাইলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন। ১৯৯৫ সালে নিহত প্রধানমন্ত্রী ইৎজাক রবিনের হত্যাকাণ্ডের বার্ষিকী স্মরণ করে তিনি বলেন, ইসরাইলকে গণতান্ত্রিক আচরণের সীমার বাইরে এক অন্ধকার পরিস্থিতির দিকে যেতে দেওয়া যাবে না।
প্রেসিডেন্ট হারজগ প্রাথমিকভাবে দুই দিন ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবেন। এরপর সরকার গঠনের জন্য একজন প্রার্থীকে ২৮ দিন সময় দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। প্রয়োজনে এ সময় আরও ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে। তবে কোনো পক্ষই প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে দেশটিতে নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তথ্যসূত্র: এএফপি, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, আল-জাজিরা ও ডন। 

ইসরাইল নির্বাচন ২০২৬, নেতানিয়াহু বিদেশি হস্তক্ষেপ, গাদি আইজেনকট