ইরানের সঙ্গে চুক্তির আশাবাদ ট্রাম্পের,হরমুজ খুলতে তেহরানের দুই দিনের প্রস্তাব

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • ২০২৬-১১-০৩ ১১:০৫:৪০
image

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসানে কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা দেখছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আট মাস ধরে চলা যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি এড়াতে আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, তেহরানও কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে নিজেদের শর্ত পূরণ করা হলে দুই দিনের মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর আগের দিন সোমবার ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে পারে। তিনি দাবি করেন, তেহরান যত দ্রুত সম্ভব সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়। তবে আলোচনায় অগ্রগতির এমন ইঙ্গিতের মধ্যেই ইরানের কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার খবর সামনে আসে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো সীমিত ও গোপন হামলার সর্বশেষ ঘটনা এটি। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমও হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে অল্প সময়ের ব্যবধানে পাঁচটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনার খবর প্রকাশ করে।
পরবর্তী সময়ে রয়টার্সকে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র কেশম দ্বীপে হামলা চালিয়েছে। আরেক কর্মকর্তা হামলাকে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন সম্পদের বিরুদ্ধে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহারের প্রেক্ষাপটে এ হামলা চালানো হয়। তবে হামলাটি বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর ইঙ্গিত নয় বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
সংঘাত অবসানের সম্ভাবনায় সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৭ শতাংশের বেশি কমে যায়। তবে কেশম দ্বীপে হামলার খবর প্রকাশের পর পরিস্থিতি আবারও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থার মধ্যে থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সোমবার জানান, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা চলছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় পরামর্শ ও আলোচনা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে এগোচ্ছে। কাতার ও পাকিস্তান এ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে বলেও জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে তিনি ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আশাবাদী। আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে এবং সামনে আরও অগ্রগতি সম্ভব কি না, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা।
এর আগে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্ভাব্য আলোচনা পুনরায় শুরুর বিষয়ে ভ্যান্স ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়িকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। রেজায়ি চিঠিটি পাওয়ার কথা স্বীকার করে এর ভাষাকে আগের যোগাযোগের তুলনায় পরিবর্তিত বলে উল্লেখ করেছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিঠিতে আলোচনার সম্ভাবনা যাচাই এবং নতুন করে সামরিক উত্তেজনা এড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এদিকে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে নিজেদের প্রস্তাবের কথা বিস্তারিত জানিয়েছেন আরাকচি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় ইরান সাত দিনের একটি পরিকল্পনা দিয়েছিল। কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনার পর সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়নকাল কমিয়ে দুই দিন করা হয়েছে।
ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম দিনে যুক্তরাষ্ট্রকে তেহরানের শর্ত পূরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এরপর দ্বিতীয় দিনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার কথা রয়েছে। ইরানের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে সাম্প্রতিক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে ছাড় পুনর্বহাল, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানো এবং ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচিত নৌপথের স্বীকৃতি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, দুই দিনের মধ্যে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব তেহরানের সদিচ্ছার প্রমাণ। তবে চূড়ান্ত সমঝোতা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ও শর্ত পূরণের ওপর।
চীনও কূটনৈতিক উদ্যোগে সমর্থন জানিয়েছে। সোমবার বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিকের বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে ওমানের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তি, যুদ্ধবিরতি এবং সংঘাত এড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। একই দিনে বেইজিংয়ে ইরান ও সৌদি আরবের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করে চীন।
তবে কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি দুই পক্ষের বক্তব্যে সামরিক প্রস্তুতি ও পাল্টা হুঁশিয়ারিও অব্যাহত রয়েছে। ট্রাম্প রোববার ইঙ্গিত দেন, কোনো এক পর্যায়ে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। এর আগে তিনি মধ্য ইরানের পিকঅ্যাক্স পর্বতসহ এক বা দুটি লক্ষ্যবস্তু নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিলেন। স্থানটিকে সন্দেহভাজন পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সেখানে এমন কোনো স্থাপনা থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে তেহরান।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘাই সতর্ক করে বলেছেন, দেশটির বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দেওয়া হবে শক্তিশালী, তাৎক্ষণিক ও সর্বাত্মকভাবে। আরাকচিও জানিয়েছেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ইরান কোনো আপস করবে না।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একদিকে পরোক্ষ আলোচনা এবং অন্যদিকে সামরিক পাল্টাপাল্টি অবস্থান-দুই ধারাই পাশাপাশি চলছে। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে তেহরানের প্রস্তাবে ওয়াশিংটন কী প্রতিক্রিয়া জানায়, তার ওপরই নির্ভর করছে সংঘাত প্রশমনের পরবর্তী পথ।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা, হরমুজ প্রণালি, ট্রাম্প ইরান চুক্তি

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, ডন, আল জাজিরা।