মহেশখালীতে মেয়াদোত্তীর্ণ তিন ইউপিতে প্রশাসক নিয়োগ,
- গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের
-
২০২৬-১১-০২ ২৩:৪১:৩৬
মহেশখালী (কক্সবাজার)
মেয়াদোত্তীর্ণ ইউনিয়ন পরিষদগুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সেবা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে মহেশখালী উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ইউনিয়ন তিনটি হলো হোয়ানক,মাতারবাড়ি ও কুতুবজোম। সোমবার (২ নভেম্বর) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের মেয়াদোত্তীর্ণ পরিষদগুলোর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ জনপদ, বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প এবং বিস্তৃত জনবসতিপূর্ণ এই তিন ইউনিয়নে প্রশাসনিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
তিন ইউনিয়নের মেয়াদ শেষ, প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগঃ- স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রজ্ঞাপন জারির আগে তিনটি ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়। প্রকাশিত প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, হোয়ানক ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হয় ১৩ অক্টোবর, মাতারবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের ১৬ অক্টোবর এবং কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের ২০ অক্টোবর ২০২৬।
মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরিষদগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশাসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়। উপজেলা প্রশাসনের সুপারিশের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর বিষয়টিও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
আইনের ভিত্তিতে প্রশাসক নিয়োগঃ- স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ১৮(১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে পরিষদের কার্যাবলি সম্পাদনের জন্য সরকার একজন উপযুক্ত কর্মকর্তা বা ব্যক্তিকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করতে পারবে।নির্বাচিত পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসক পরিষদের সার্বিক দায়িত্ব পালন করবেন। আইনের বিধান অনুযায়ী, প্রশাসকের নিয়োগের মেয়াদ এক মেয়াদে ১২০ দিন। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার যৌক্তিক সময়ের জন্য এ মেয়াদ বাড়াতে পারে। একই আইনের ১৮(২) ও ১৮(৩) ধারায় প্রশাসককে সহায়তার জন্য কমিটি গঠনের এবং প্রশাসক ও কমিটির সদস্যদের দায়িত্ব পালনের বিধান রয়েছে।
নাগরিক সেবা সচল রাখাই বড় চ্যালেঞ্জঃ- ইউনিয়ন পরিষদ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে কাছের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদ,ওয়ারিশ সনদ,ট্রেড লাইসেন্স, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ভিজিডি-ভিজিএফসহ বিভিন্ন সরকারি সহায়তা কার্যক্রম বাস্তবায়নে ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তিন ইউনিয়নে প্রশাসক নিয়োগের পর এসব সেবা কতটা দ্রুত, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্তভাবে দেওয়া যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।পাশাপাশি পরিষদের আয়-ব্যয়, সরকারি বরাদ্দ, উন্নয়ন প্রকল্প, উপকারভোগী নির্বাচন এবং সরকারি সম্পদের ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রত্যাশা রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
মাতারবাড়ির উন্নয়ন বাস্তবতায় প্রশাসনিক গুরুত্বঃ-
মহেশখালীর মাতারবাড়ি শুধু একটি ইউনিয়ন নয়; জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম কেন্দ্র। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কার্যক্রমকে ঘিরে এ অঞ্চলে ভূমি, যোগাযোগ, নাগরিক সুবিধা ও জনসেবার চাহিদা বেড়েছে।
এ অবস্থায় ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রমে সমন্বয়, সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে হোয়ানক, কুতুবজোম ইউনিয়নেও জনসেবা,গ্রামীণ অবকাঠামো, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রশাসকদের কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।
প্রশাসক নিয়োগ ঘিরে হাইকোর্টের রুল,আলোচনায় আইনগত দিক উল্লেখ্য, হোয়ানক, মাতারবাড়ি ও কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের প্রস্তাবের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন নম্বর ১৪৮৮৬/২০২৬ দায়ের করা হয়েছিল। ২৮ অক্টোবর বিচারপতি আহমদ সোহেল ও বিচারপতি ইফতেখার মাহমুদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ শুনানি শেষে রুল জারি করেন বলে সংশ্লিষ্ট মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আদালত জানতে চান, তিন ইউনিয়নে প্রশাসক নিয়োগের প্রস্তাব কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না। একই সঙ্গে আদেশের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের কাছে জরুরি ভিত্তিতে পৌঁছে দিতে স্পেশাল মেসেঞ্জারের মাধ্যমে জারির নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর ২ নভেম্বর মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়টি সামনে এসেছে। ফলে প্রশাসক নিয়োগের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং এ বিষয়ে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আইনগত সমন্বয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে রুল জারি মানেই নিয়োগ বাতিল বা স্থগিত নয়। আদালতের কোনো পরবর্তী স্থগিতাদেশ বা চূড়ান্ত রায় থাকলে তা পৃথকভাবে বিবেচ্য হবে।
কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসকের নাম ও ঠিকানা আবদুর রহিম, পিতা-লাল মিয়া, মাতা-বেগম জান, সাং-কুতুবজুম, ডাকঘর-কুতুবজুম, কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদ উপজেলা- মহেশখালী, জেলা-
কক্সবাজার।
হোয়ানক ইউনিয়ন পরিষদের অনুমোদিত প্রশাসকের নাম ও ঠিকানা মোহাম্মদ আবদুল করিম,পিতা-আবুল হোছাইন,মাতা-মাবিয়া খাতুন,সাং-ছনখোলা, ডাকঘর- হোয়ানক, উপজেলা-মহেশখালী, জেলা-কক্সবাজার।
মাতারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের অনুমোদিত প্রশাসকের নাম ও ঠিকানা মিজবাহ উদ্দিন
মজিদী, পিতা-মোজাফফর আহমদ,মাতা-
আজেদা বেগম, সাং-উত্তর সিকদার পাড়া, ডাকঘর-মাতারবাড়ী, উপজেলা-মহেশখালী,
জেলা-কক্সবাজার।
প্রত্যাশা জনগণের সেবা,স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি স্থানীয় সরকার দৃষ্টিতে, প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে সাময়িক প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব হলেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বের বিকল্প হিসেবে দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসক ব্যবস্থা বিবেচিত হওয়ার সুযোগ নেই। স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। মহেশখালীর হোয়ানক, মাতারবাড়ি ও কুতুবজোম ইউনিয়নের বাসিন্দাদের প্রত্যাশা,নবনিযুক্ত প্রশাসকেরা দায়িত্ব গ্রহণের পর নাগরিক সেবা সহজ করবেন, সরকারি বরাদ্দ ও উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম- দুর্নীতি প্রতিরোধ করবেন এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। প্রশাসক নিয়োগের এ সিদ্ধান্তের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং স্থানীয় সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ওপর। একই সঙ্গে দ্রুত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখার প্রত্যাশা স্থানীয় সচেতন মহলের।