এলডিসি উত্তরণে বাংলাদেশকে আরও তিন বছর সময় দিল জাতিসংঘ

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • ২০২৬-১০-৩০ ১৭:৫১:৪৬
image

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত তিন বছর সময় দিয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ)। একই সুযোগ পেয়েছে নেপালও। ফলে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে আনুষ্ঠানিক উত্তরণের নির্ধারিত সময় ২৪ নভেম্বর ২০২৬ থেকে পিছিয়ে ২৪ নভেম্বর ২০২৯ করা হয়েছে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্লেনারি বৈঠকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জি-৭৭ ও চীনের পক্ষে উত্থাপিত খসড়া প্রস্তাবের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও নেপালের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। বৈঠকে কোনো দেশ বাংলাদেশের আবেদনের বিরোধিতা করেনি। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ কয়েকটি দেশও বাংলাদেশের অনুরোধের প্রতি সমর্থন জানায়।
এলডিসি উত্তরণের আগে অর্থনীতি, বাণিজ্য, উৎপাদন সক্ষমতা, আর্থিক খাত ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ অতিরিক্ত সময় চেয়েছিল। জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) বাংলাদেশের আবেদন পর্যালোচনা করে প্রস্তুতিকাল বাড়ানো উপযুক্ত বলে মত দেয়। তবে একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য অভ্যন্তরীণ সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার শর্তও দেওয়া হয়।
জাতিসংঘের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংঘাত, জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা এবং দেশের বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতা বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করেছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই ব্যতিক্রমীভাবে আরও তিন বছর প্রস্তুতির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশকে বর্ধিত সময়ের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সংস্কার অব্যাহত রাখা, মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়ন এবং উন্নয়ন ও বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রস্তুতির অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিতভাবে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটিকে জানানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
এলডিসি থেকে উত্তরণের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি হলো রপ্তানিতে বিশেষ সুবিধা কমে যাওয়া। বর্তমানে এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ ও বাণিজ্য জোটে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজারসুবিধা ভোগ করছে। উত্তরণের পর এসব সুবিধার একটি বড় অংশ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ আরও সময় পাচ্ছে রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়ানো, নতুন বাজার খোঁজা, বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য। ব্যবসায়ী মহল দীর্ঘদিন ধরে এমন সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিল। বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য এ সিদ্ধান্তকে স্বস্তিদায়ক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানির বড় একটি অংশ এলডিসিভিত্তিক বিশেষ বাণিজ্য সুবিধার ওপর নির্ভরশীল। ফলে উত্তরণের পর সম্ভাব্য শুল্ক ও বাজারসুবিধা হারানোর ধাক্কা সামলাতে অতিরিক্ত তিন বছরকে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতিকাল হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য জাতিসংঘ মূলত মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই), মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচক (ইভিআই)-এই তিনটি মানদণ্ড বিবেচনা করে।
বাংলাদেশ ২০১৮ সালের ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় প্রথমবার তিনটি মানদণ্ডই পূরণ করে। ২০২১ সালের পরবর্তী পর্যালোচনাতেও দেশটি তিনটি মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হয়। এর ভিত্তিতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০২১ সালে বাংলাদেশকে ২৪ নভেম্বর ২০২৬ এলডিসি থেকে উত্তরণের সিদ্ধান্ত দেয়। তবে কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব বিবেচনায় বাংলাদেশকে সাধারণ প্রস্তুতিকালের তুলনায় বাড়তি সময় দেওয়া হয়েছিল।
জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ পেতে সাধারণত তিনটি মানদণ্ডের অন্তত দুটি পূরণ করতে হয় এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নে সেই সক্ষমতা ধরে রাখতে হয়। বাংলাদেশ তিনটি মানদণ্ডেই যোগ্যতা অর্জন করেছিল।
নতুন সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে স্বস্তির। কিন্তু এই সময়কে কেবল উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে। বরং ২০২৯ সালের মধ্যে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা কমানো, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা তৈরি করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারের সামনে একই সঙ্গে বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি এগিয়ে নেওয়া, বন্দর ও লজিস্টিক ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো এবং ব্যবসার ব্যয় কমানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারাও অতিরিক্ত সময়কে দ্রুত সংস্কার ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগানোর ওপর জোর দিয়েছেন।
অতএব, জাতিসংঘের দেওয়া তিন বছর বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি সময়সীমা বাড়ানো নয়; এটি অর্থনীতিকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর একটি বড় সুযোগ। এখন এই সুযোগ কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে ২০২৯ সালের উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য কতটা টেকসই ও নির্বিঘ্ন হবে।
  
এলডিসি উত্তরণ, বাংলাদেশ ২০২৯, জাতিসংঘ