কেন এখনই প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকর নতুন আইন

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-১০-২৬ ২১:৪২:১৭
image

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী জননিরাপত্তা, স্বাস্থ্য,অর্থনীতি ও সামাজিক সংকট। প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো সড়কে মানুষের প্রাণ যাচ্ছে, পরিবার হারাচ্ছে উপার্জনক্ষম সদস্য,কেউ আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করছেন,আবার কোনো শিশুর জীবন থমকে যাচ্ছে একটি দুর্ঘটনায়। সড়ক নিরাপত্তার প্রশ্ন তাই কেবল চালকের ভুল বা পথচারীর অসচেতনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রের নীতি,সড়ক অবকাঠামো,যানবাহনের মান, চালকের প্রশিক্ষণ,আইন প্রয়োগ,জরুরি চিকিৎসা এবং তথ্যব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য একটি 'সমন্বিত ও আধুনিক সড়ক নিরাপত্তা আইন' এখন সময়ের দাবি। সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ সেই প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন,সরকার '২০২৭ সালের মধ্যে একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ'। একই সঙ্গে গতিসীমা কার্যকর করা,হেলমেটের মান হালনাগাদ,দুর্ঘটনার পর চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করা,আন্ডারপাস নির্মাণ,মহাসড়কে নিরাপদ লেনব্যবস্থা,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পারাপার এবং দুর্ঘটনার তথ্যব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মতো উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ 'সড়ক নিরাপত্তা আইন,২০২৬-এর একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে'। প্রস্তাবিত আইনে রয়েছে ১৫টি অধ্যায় ও ১১১টি ধারা। খসড়াটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

কেন বিদ্যমান ব্যবস্থার বাইরে আলাদা আইন?
বাংলাদেশে বর্তমানে 'সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮' কার্যকর রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী আইনটি ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়। পাশাপাশি সড়ক পরিবহন বিধিমালা ২০২২ এবং মহাসড়ক আইন ২০২১সহ বিভিন্ন আইন ও বিধিমালা রয়েছে।

প্রশ্ন হলো-তাহলে নতুন করে সড়ক নিরাপত্তা আইন কেন?
কারণ সড়ক নিরাপত্তা কেবল যানবাহন চালানো বা ট্রাফিক আইন ভঙ্গের বিষয় নয়। একটি দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে হলে সড়কের নকশা থেকে শুরু করে যানবাহনের নিরাপত্তা,গতি নিয়ন্ত্রণ,চালকের যোগ্যতা,পথচারীর নিরাপত্তা,গণপরিবহনের পরিচালনব্যবস্থা,জরুরি চিকিৎসা এবং দুর্ঘটনার পর তদন্ত-সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হয়।
প্রস্তাবিত নতুন আইনের খসড়াতেও বলা হয়েছে, শুধু সড়ক পরিবহন আইন সংশোধন করে সড়ক প্রকৌশল,যানবাহনের নিরাপত্তা মান,গতিসীমা ব্যবস্থাপনা,পথচারী সুরক্ষা,জরুরি চিকিৎসা,গবেষণা এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ের মতো বিষয়গুলো যথাযথভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই আলাদা একটি সমন্বিত আইন প্রয়োজন।

দুর্ঘটনার সংখ্যা নিয়েও কেন এত পার্থক্য?
বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা আলোচনায় একটি বড় দুর্বলতা হলো দুর্ঘটনার তথ্যের অসামঞ্জস্য।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করে। বিআরটিএ নিজেই স্বীকার করে যে পুলিশের কাছে রিপোর্ট হওয়া দুর্ঘটনার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এর ডাটাবেসে কিছু দুর্ঘটনা বাদ পড়তে পারে,বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের যেসব দুর্ঘটনা পুলিশকে জানানো হয় না।
এই সীমাবদ্ধতার কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়।
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, '২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৪৯০ জন নিহত' হয়েছেন। অন্যদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে একই বছরে নিহতের সংখ্যা '৭ হাজার ৩৫৯' এবং বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে '৯ হাজার ১১১'। বিভিন্ন সংস্থার তথ্য সংগ্রহ ও সংজ্ঞাগত পার্থক্যের কারণে এই ব্যবধান তৈরি হয়।
অর্থাৎ, নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে হবে 'একটি সমন্বিত জাতীয় দুর্ঘটনা ডাটাবেস'। প্রস্তাবিত আইনে এ ধরনের একটি Integrated Central Database System-এর কথা রাখা হয়েছে।

‘দুর্ঘটনা’ নয়,প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু
সড়ক নিরাপত্তার আধুনিক দর্শন হলো-সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহত হওয়া অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য।
এ কারণেই আন্তর্জাতিকভাবে 'Safe System Approach' গুরুত্ব পাচ্ছে। এই পদ্ধতির মূল কথা হলো, সড়কে মানুষের ভুল হতে পারে-কিন্তু সেই ভুল যেন মানুষের মৃত্যু ডেকে না আনে,রাষ্ট্র ও সড়কব্যবস্থাকে সে অনুযায়ী তৈরি করতে হবে।
অর্থাৎ নিরাপত্তার পুরো দায় শুধু চালকের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না।
চালক ভুল করতে পারেন,পথচারী অসতর্ক হতে পারেন,যানবাহনে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিতে পারে-কিন্তু নিরাপদ সড়কব্যবস্থায় এসব ভুলের পরিণতি যাতে মৃত্যু না হয়,সেটিই মূল লক্ষ্য।
এখানে সড়ক কর্তৃপক্ষ,গাড়ি নির্মাতা ও আমদানিকারক,পরিবহন মালিক,চালক,আইনশৃঙ্খলা বাহিনী,স্বাস্থ্য বিভাগ,স্থানীয় সরকার,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারকদের প্রত্যেকের দায়িত্ব রয়েছে।

নতুন আইনে যে বিষয়গুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
প্রস্তাবিত সড়ক নিরাপত্তা আইন,২০২৬-এর কয়েকটি দিক বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত-গতিসীমা  
অতিরিক্ত গতি বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম বড় ঝুঁকি। শুধু গতিসীমা নির্ধারণ করলেই হবে না; রাস্তার ধরন,যানবাহনের ধরন ও জনবসতির ওপর ভিত্তি করে বৈজ্ঞানিকভাবে গতিসীমা নির্ধারণ এবং ক্যামেরা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে তা কার্যকর করতে হবে।
খসড়ায় স্পিড ক্যামেরা,স্পিড হামপ,রাম্বল স্ট্রিপ এবং Intelligent Transport System ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে।
দ্বিতীয়ত-নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো।  
শুধু প্রশস্ত রাস্তা নির্মাণ নিরাপদ সড়ক তৈরি করে না। প্রয়োজন ফুটপাত,নিরাপদ পারাপার,মিডিয়ান, রিফিউজ আইল্যান্ড,পর্যাপ্ত আলো,সঠিক সাইন-সিগন্যাল এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান শনাক্ত করে দ্রুত সংশোধন।
প্রস্তাবিত আইনে পথচারী ও প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো,ফুটপাত,ফুটওভারব্রিজে র‍্যাম্প বা লিফট এবং নিরাপদ রিফিউজ আইল্যান্ডের মতো ব্যবস্থার কথা রয়েছে।
তৃতীয়ত-নিরাপদ যানবাহন।  
ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়কে চলবে না-এটি কাগজে-কলমে নয়,বাস্তবে নিশ্চিত করতে হবে। গাড়ির ব্রেক,টায়ার,আলো,স্টিয়ারিংসহ গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা উপাদান পরীক্ষা কার্যকর করতে হবে।
চতুর্থত-চালকের প্রশিক্ষণ ও কর্মপরিবেশ।  
শুধু লাইসেন্স দেওয়ার আগে পরীক্ষা নিলেই দায়িত্ব শেষ নয়। চালকের প্রশিক্ষণ,স্বাস্থ্য পরীক্ষা,কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম এবং বেতন-ভাতার বিষয়ও নিরাপত্তার অংশ। দীর্ঘ সময় বিশ্রামহীন অবস্থায় গাড়ি চালানো একজন দক্ষ চালককেও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।
পঞ্চমত-মোটরসাইকেল নিরাপত্তা।  
২০২৫ সালের রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে মোটরসাইকেল-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭১ জন নিহত হয়েছেন,যা ওই সংস্থার হিসাবের মোট সড়ক দুর্ঘটনা মৃত্যুর প্রায় ৩৬ শতাংশ।
তাই মানসম্মত হেলমেট,চালক ও আরোহী উভয়ের হেলমেট ব্যবহার,প্রশিক্ষণ এবং গতি নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। প্রস্তাবিত আইনে BSTI অনুমোদিত মানসম্মত হেলমেট বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি মোটরসাইকেলের যাত্রীদের ক্ষেত্রেও হেলমেটের বিধান রাখা হয়েছে।

শিশু ও পথচারীকে আইনের কেন্দ্রে আনতে হবে
বাংলাদেশের সড়কে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদের অন্যতম পথচারী,শিশু,বয়স্ক মানুষ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি।
প্রস্তাবিত আইনে ১৪ বছরের কম বয়সী বা ১৩৫ সেন্টিমিটারের কম উচ্চতার শিশুদের সামনের আসনে বসার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং উপযুক্ত restraint system ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। পথচারী ও সাইকেল ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার বিষয়ও খসড়ায় গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে আইন করার পাশাপাশি এর বাস্তব প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। স্কুলের সামনে গাড়ির গতি কমানো, নির্দিষ্ট পারাপার ব্যবস্থা,স্কুল জোন,ফুটপাত এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ-এসব ব্যবস্থা ছাড়া শুধু আইন করে শিশুদের নিরাপদ রাখা যাবে না।

দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টাই হতে পারে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান
সড়ক নিরাপত্তার আলোচনায় আমরা সাধারণত দুর্ঘটনার আগে কী করা যায়,সেটি নিয়ে বেশি কথা বলি। কিন্তু দুর্ঘটনার পর প্রথম কয়েক মিনিটও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রস্তাবিত আইনে দুর্ঘটনার পর জরুরি 'বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা' দেওয়ার বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে। ‘Golden Hour’-এ দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ অনেক আহত মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনাস্থলে সাধারণ মানুষ যাতে আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি হয়রানির ভয় না পান,সে জন্য ‘Good Samaritan’ বা স্বেচ্ছায় উদ্ধারকারী ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষার প্রস্তাবও রয়েছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হতে পারে।

শাস্তি নয়,জবাবদিহি ও প্রতিরোধ
সড়ক নিরাপত্তা আইনকে শুধু জরিমানা ও শাস্তির আইন বানালে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। প্রয়োজন 'জবাবদিহির একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো'।
প্রস্তাবিত আইনে ট্রাফিক অপরাধের জন্য demerit point বা পয়েন্ট কর্তনের ব্যবস্থা এবং একই অপরাধ পুনরায় করলে সর্বোচ্চ শাস্তি দ্বিগুণ করার প্রস্তাব রয়েছে। নির্দিষ্ট মাত্রায় পয়েন্ট জমলে লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
এটি কার্যকর হলে সড়ক আইন ভঙ্গকে শুধু ‘জরিমানা দিয়ে শেষ’ করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হতে পারে।
তবে একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে-আইন যেন ধনী-গরিব,মালিক-শ্রমিক,প্রভাবশালী-সাধারণ-সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়।

শুধু আইন নয়,প্রয়োগই আসল
বাংলাদেশে আইন প্রণয়নের ঘাটতি যেমন আছে,তেমনি বড় সমস্যা রয়েছে 'আইনের প্রয়োগে'।
নতুন আইন যত আধুনিকই হোক,যদি লাইসেন্স প্রক্রিয়ায় অনিয়ম থাকে,ফিটনেসে দুর্বলতা থাকে, অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ না হয়,সড়ক নকশায় নিরাপত্তা উপেক্ষিত হয়,দুর্ঘটনার তদন্ত নিরপেক্ষ না হয় এবং অপরাধী রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের কারণে ছাড় পেয়ে যায়-তাহলে নতুন আইনও প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারবে না।
সুতরাং নতুন আইনের সঙ্গে প্রয়োজন স্বাধীন ও কার্যকর প্রয়োগব্যবস্থা,পর্যাপ্ত জনবল,প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বয়।

সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সময় এখন
বাংলাদেশ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মরক্কোর মারাকেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সড়ক নিরাপত্তা সম্মেলনে ২০২৭ সালের মধ্যে একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের অঙ্গীকার করে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের সড়ক নিরাপত্তা বৈঠকেও সরকারের পক্ষ থেকে এই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
অন্যদিকে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুহার অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যেও কাজ করার কথা জানিয়েছে।
এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য ২০২৬-২৭ সালকে কেবল আইন তৈরির সময় হিসেবে নয়, 'সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের সময়' হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

নতুন আইনে যে পাঁচটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি
প্রথমত
, 'একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় দুর্ঘটনা ডাটাবেস' তৈরি করতে হবে,যেখানে পুলিশ,হাসপাতাল,সড়ক কর্তৃপক্ষ ও পরিবহন সংস্থার তথ্য সমন্বিত থাকবে।
দ্বিতীয়ত, 'Safe System Approach-কে আইনের মূল দর্শন' করতে হবে। অর্থাৎ মানুষের ভুলকে কেন্দ্র করে নয়,ভুলের পরিণতি যেন মৃত্যু না হয়-এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, 'সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের প্রতিটি পর্যায়ে Road Safety Audit বাধ্যতামূলক' করা দরকার।
চতুর্থত, 'দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসা ও উদ্ধারব্যবস্থাকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে'।

পঞ্চমত,'আইনের প্রয়োগে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে'। ট্রাফিক পুলিশ থেকে শুরু করে সড়ক কর্তৃপক্ষ, পরিবহন মালিক,চালক,ফিটনেস প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান-যে যার দায়িত্বে ব্যর্থ হলে তারও জবাবদিহি থাকতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, সড়ক নিরাপত্তা কোনো মন্ত্রণালয়ের একক দায়িত্ব নয়। এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের বিষয়।
একটি শিশু যেন স্কুলে যাওয়ার পথে প্রাণ না হারায়,একজন শ্রমজীবী মানুষ যেন কর্মস্থলে যাওয়ার পথে পরিবারের কাছে আর ফিরে না আসে-এটি কোনো পরিসংখ্যানের বিষয় হতে পারে না। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে একটি পরিবার,একটি অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং একটি অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হয়।
বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন এমন একটি সড়ক নিরাপত্তা আইন,যা শুধু দুর্ঘটনার পর অপরাধী শনাক্ত করবে না; 'দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করবে।'
আইনটি হতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক,তথ্যনির্ভর,মানবিক ও বাস্তবায়নযোগ্য। পথচারী থেকে চালক,শিশু থেকে বয়স্ক,মোটরসাইকেল আরোহী থেকে গণপরিবহনের যাত্রী-সবার নিরাপত্তাকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
কারণ নিরাপদ সড়ক কোনো বিলাসিতা নয়।  
'নিরাপদে ঘরে ফিরে আসার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার।'
আর সেই অধিকার নিশ্চিত করার পরীক্ষাই হবে-নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন কতটা ভালো লেখা হয়েছে, তা নয়; 'আইনটি বাস্তবে কতটি প্রাণ বাঁচাতে পারছে।'

লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট,সাবেক মাহাসচিব-নিরাপদ সড়ক চাই।